রাহেলার দ্বিতীয় বিয়ে

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ

সুরভী আমার বন্ধু। সুরভীরা যেই বাড়িতে ভাড়া থাকেন,সেই বাড়িওয়ালার বড় মেয়ে রাহেলা ৪০ বছর বয়সে ডিভোর্সী হয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন।পেছনে ফেলে আসেন নিদারুণ কিছু স্মৃতি।  সংসার করার ইচ্ছা সবার থাকলেও সংসার ভাগ্য সবার সুখকর নয়।

নিঃসন্তান রাহেলা নিজেই ছেড়ে আসেন সংসার। আগের স্বামী তাকে ডিভোর্স দিতে না চাইলেও নিঃসন্তান হবার কারণ যখন তার মধ্যেই আছে,তাই সে একজন পুরুষকে বাবা হবার অনুভূতি থেকে বঞ্চিত করাকে অন্যের অধিকার লঙ্ঘণই ভাবেন।দেশে বিদেশে অনেক চিকিৎসার পর ক্লান্ত রাহেলা তার স্বামীর দিকে যখন তাকাতো,তখন বিষাদের আভা দেখতো।

রাহেলার স্বামী খুব ভালো হলেও বাচ্চা না হবার দরুণ আশেপাশের দুই চারজন যে কটু কথা শুনায়নি তার স্বামীকে তা কিন্ত নয়।কিন্ত আপাদমস্তক ভদ্রলোক সেসব কথায় তীব্র প্রতিবাদ করতেন। কাউকে প্রশ্রয় দেয়নি স্ত্রীকে বাঁকা চোখে দেখতে।

একদিন গভীর রাতে ঘুমন্ত রাহেলা কান্নার আওয়াজ টের পেয়ে জেগে উঠে।অন্ধকার ঘরে কে যেন হু হু করে কাঁদছে।বিছানায় পাশে স্বামীকে না দেখে বিছানা ছেড়ে উঠে ড্রয়িং রুমে গিয়ে লাইট জ্বালিয়ে দেখে নামাজের জায়নামাজে বসে হাউমাউ করে কাঁদছেন তার স্বামী।

মোনাজাতের কিছু কথা তাকে প্রচন্ড আলোড়িত করে।”হে আল্লাহ আপনার কাছে কোন কিছুর অভাব নেই।আমাদেরকে মাতাপিতা হবার সুখ থেকে বঞ্চিত করবেন না।আমাদের কোলজুড়ে একটা সন্তান দান করুন।” মোনাজাত শেষ করে রাহেলার স্বামী মুচকি হেসে রাহেলার দিকে তাকিয়ে বললো,তুমি উঠে গেছো? কিন্ততখনও তার চোখে মুখে অশ্রুর ফোঁটা।সকালের পর থেকে রাহেলা আনমনা হয়ে যায়।নিজের সাথে নিজের চলা যুদ্ধটার ছাপ তার চেহারায় স্পষ্ট হয়ে উঠে।

রাহেলার স্বামী জিজ্ঞেস করেন, “কি হয়েছে তোমার? কি নিয়ে ভাবছো তুমি?”

রাহেলা নিশ্চুপ থাকে।এক সপ্তাহ পর রাহেলা বাবার বাসায় চলে যায়।বাবা মা চলে গেছেন অনেক বছর। বড় ভাইয়ের ফ্লাটে উঠে রাহেলা।যদিও তাদের পারিবারিক বিত্তভৈববের অভাব নেই।ব্যক্তিগত ভাবে রাহেলাও অনেক সম্পদের মালিক। বাবা তার সম্পত্তিতে ইনসাফপূর্ণ বন্টন করে গেছেন।রাহেলার স্বামী বারবার বাসায় কবে ফিরবে জিজ্ঞেস করলেও রাহেলা আর না ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।

সে স্বামীকে জানায়, “দেখো আমাদের সন্তান না হবার কারণ আমি।ডাক্তাররা তোমার কোন প্রব্লেম পায়নি।তুমি কেন বাবা ডাক শুনা থেকে বঞ্চিত হবে?তুমি যখন অন্যের বাচ্চাদের আদর করো,তখন তোমার চেহারায় বিষাদের ছায়া দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত। আমার নিজেকে স্বার্থপর মনে হয়।আমি তোমাকে মুক্ত করে দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।মানুষ হিসেবে,সঙ্গী হিসেবে তুমি চমৎকার একজন মানুষ।তুমি কখনো আমাকে অপমান করোনি,কটুকথা শুনাওনি।কিন্ত তোমার ভেতরের হাহাকার আমি আর ইগ্নোর করতে পারছিনা।”

রাহেলার স্বামী কান্নাজড়িত কন্ঠে বললো,”না তুমি তা করবে না।আমার সন্তান লাগবে না কিন্ত তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না।”

রাহেলা তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে।সবাই বুঝালেও রাহেলা অনড় থাকে।রাহেলার ভাবী বেশি বুঝায় ডিভোর্স না দিতে।রাহেলার স্বামী আবার বিয়ে করেন।তাদের কোলজুড়ে মেয়ে আসে।রাহেলাকে অনেক গুলো ছবি পাঠিয়েছে তার প্রাক্তন স্বামী।বাবা মেয়ের হাসিমুখ দেখে রাহেলা মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠেন।

রাহেলার আজ খুব হালকা লাগছে।নিজেকে আর স্বার্থপর মনে হচ্ছে না।বাবার কোলে মেয়েকে দেখে রাহেলা এই প্রথম ডিভোর্সের দেড় বছর পর অঝোরে কাঁদলো।একদিন যেই বাসার সব কিছু তার হাতের ছোঁয়া উজ্জ্বল আলোকিত হয়ে উঠেছিলো,আজ সেখানে সে অপাংক্তেয়।বারান্দার ফুলের গাছগুলো কি তাকে ভুলে গেছে?টিয়াপাখিটা কি আর রাহেলা রাহেলা বলে ডাকে?ব্যাংকক থেকে আনা জন্মদিনের উপহার পাওয়া কফিমগে এখন কে কফি খায়?কান্না করে ভারী বুকটা হালকা করে নিলো রাহেলা।

চোখে মুছে নিয়ে বললো,”হে আল্লাহ আমার ধৈর্য্য বাড়িয়ে দাও।।তার সন্তানকে তুমি নিরাপদে রাখো।”

সে ভালো থাকুক।রাহেলার বড়ভাই শাহেদ সাহেব রাহেলার জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব এনেছেন।ছেলে তার ব্যবসায়িক বন্ধু।ডিভোর্সি। তবে তার দুইটা বাচ্চা আছে।স্ত্রীর সাথে বিদেশে থাকে তারা।সে অন্য গল্প।ভদ্রলোকের একজন সঙ্গী দরকার।টাকাপয়সার অভাব নাই। কিন্ত অবসরের বিকাল গুলো যেন ফুরাতে চায় না।রাতগুলো আজকাল ঘুমহীনই কাটে।শাহেদ নিজ থেকে তার বোনের কথা বললে সে রাজি হয়ে যায়।

কিন্ত রাহেলার বিয়ে হউক তা চায়না তার ভাবী।নানা বাজে যুক্তি দিয়ে যে বিয়েটাকে কঠিন করে দিলো।রাহেলার ভাই শাহেদ দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়লেন।রাহেলা বুঝে ভাবীর যুক্তির পিছনে আছে লোভ।রাহেলার বাবার থেকে পাওয়া সম্পত্তির দিকে লোভাতুর চোখ পড়ছে ভাবীর।এখন যদি রাহেলার বিয়ে হয়,তবে সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাবে এই ভয়।রাহেলা সব বুঝে।সে ভাবীর মুখোমুখি হয়।বলে,” একজন নারী হয়ে তুমি স্বামী নিয়ে সংসার করছো কিন্ত আরেকজন নারীকে একাকীত্বের দহনে পুড়তে বলছো তার লজিক কি? তাছাড়া ডিভোর্সি মেয়েদের বিয়ে হতে পারবেনা কেন? কেউ যদি এই বন্ধ্যা নারীকে বিয়ে করতে চায় তবে তুমি খুশি না হয়ে আমার ভাইয়ের মাথা খাচ্ছো কেন ভাবী?”

ভাবী বলে,”আমাদের বংশে ডিভোর্স ও নেই।দ্বিতীয় বিয়েও নেই।”

রাহেলা বলে,”তুমি তো বেশ নামাজ পড়ো।”

আমাদের নবী তো ডিভোর্সিদের বিয়ে করতে উৎসাহ দিয়েছেন।তিনি নিজেও ডিভোর্সিদের বিয়ে করেছেন।রাহেলার ভাবী রাগীচেহারায় বললো,”আরেকটা বিয়ের খায়েশ মিটাতে হাদিস মারাইও না।” রাহেলা আর কথা বাড়ায় না।

পরদিন ভাইয়ের কাছ থেকে তার বন্ধুর নাম্বার নিয়ে ফোন দেয়। এক নিঃশ্বাসে রাহেলা বলে, আপনি যদি আপনার একাকীত্বের জন্য আমাকে বিয়ে করতে চান, তবে আমি রাজি। কিন্ত আমার থেকে সন্তান আশা করলে আপনার থেমে যাওয়া উচিত। অন্যপ্রান্ত থেকে কি উত্তর আসলো শুনা না গেলেও রাহেলার চেহারায় খুশির ঝিলিক দেখা গেলো। দুই সপ্তাহ পর রাহেলা আবার বউয়ের সাজে লাল বেনারসিতে। রাহেলার বিয়েতে সবাই খুশি হলেও তার ভাবীকে চারদিকে কেউ দেখেনি সেদিন।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও ডাক্তার

আরও পড়ুন