সত্যের গায়ে মিথ্যার পোশাক

অধ্যাপিকা মৌলুদা খাতুন মলি

আজ দুপুরে হঠাৎ…
“বড় আম্মু, তাড়াতাড়ি আসেন, মা’র জিউ যাচ্ছে..”।
আমি তখন চুলায় দুপুরের রান্না চাপিয়েছি মাত্র। যোহরের নামাযও পড়া হয়নি। শিপলু’র কান্না দেখে আর কালবিলম্ব না করে দৌড় দিলাম।
গিয়ে দেখি ছালেহা ভাবীর অবস্থা ভয়ানক খারাপ। ঘরভর্তি লোকজন। তুমুল হৈচৈ, কান্নাকাটি দেখে মনে হলো-
“হায়রে, আর শেষ দেখা হলো না আমার সাথে”।

দেখলাম, ছালেহা ভাবীর শিয়রে বসে তার একমাত্র মেয়ে ডুকরে কাঁদছে আর মায়ের মাথা নাড়ছে। পায়ের কাছে বেকার নাবালেগ ছোটছেলে মায়ের পায়ের তালু ডলে দিচ্ছে। তার চোখেও পানি। চৌকির মাঝখানে দেবরের মেয়ে বসে। সেও ফিকরে ফিকরে কাঁদছে আর ছালেহা ভাবীর হাতের কনুই পর্যন্ত টিপে দিচ্ছে। পাড়া-পড়শি একেকজন একেক রকম পরামর্শ দিচ্ছে। হৈচৈ টা মূলত সেই কারণে।
কেউ বলছে-
— তাড়াতাড়ি মুখে চিনি দে, ডায়াবেটিস নিল হয়ে গ্যাছে।
কেউ বলছে-
— আরে না না, চিনি না। আমি প্রথমেই একমুঠ চিনি খাওয়াইছি। এখন এক গ্লাস ডালিমের রস খাওয়া।
আরেকজন বিজ্ঞের মত বললো-
— আরে মুর্খের দল, ডায়াবেটিস রুগীর চিনি, ডালিমের রস খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম, বিষ! তোরা তো মস্ত অকাম করেছিস! এখন বাঁচাতে চাইলে- শিগগির ডাব, মালটার রস খাওয়া।
হন্তদন্ত হয়ে মাঝবয়সী একজন ঘরে ঢুকে প্রথমে চারদিকে চোখ বুলালো। তারপর গাম্ভীর্যপূর্ণভাবে বললো-
— তিনদিনের খালি পেটে ডাব, মালটার রস কিছুই দেয়া যাবে না । গ্যাস বাড়বে। রুগী কালেমা পড়তে পারছে কিনা সেটা দ্যাখ আগে।
কথাটা বলেই সে কাছে এসে ছালেহা ভাবীকে বারবার জেরা করতে লাগলো –
— দ্যাখতো, আমাকে চিনতে পারিস কিনা?
বলত দেখি, আমি কে? কালেমা মনে আছে, না কি ভুলে গেছিস? পড়তো দেখি আমার সাথে?
নানান প্রশ্নে রুগীকে সে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ছে।

ছালেহা ভাবী চোখ বন্ধ করে- কোনো কথার উত্তর না দিয়ে- নিস্তেজ হয়ে ভারি দেহটা এলিয়ে দিয়েছে। পায়ের অপারেশনের ব্যান্ডেজটা ভিজে গ্যাছে। প্রায় দু’মাস হতে চলেছে- স্ট্রং ডায়াবেটিসের জন্য ঘা-টা শুকাচ্ছেই না। যদিও দোবেলা ইনসুলিন চলছে। তারপরও…. কাজ হচ্ছেনা।
হতদরিদ্র ছালেহা ভাবী মনের কষ্টে দু/তিন ধরে শুধু পানি ছাড়া আর কিচ্ছু খায়নি। জীবনের উপর তার বিতৃষ্ণা এসে গ্যাছে। সে আর বাঁচতে চায়না, মরতে চায়। এখন তার উঠে বসার ক্ষমতা পর্যন্ত নেই।

অগত্যে আবার ইনডিপেন্ডেন্ট জেনারেল হসপিটালে- এমডি আনিস ভাই এবং ম্যানেজার কালাম ভাইকে ফোন দিয়ে- ভর্তির ব্যবস্থা করলাম।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ইনডিপেন্ডেন্ট জেনারেল হসপিটালের ম্যানেজিং ডিরেক্টরসহ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। তাঁদের এভাবে অসহায়, সাধারণ মানুষের পাশে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেবার জন্য। সেইসাথে দোয়া করি, আল্লাহ পাক এই হাসপাতালকে খাস করে কবুল করুন, আমিন।
আজ মনে পড়লো অনেকদিন আগের এক ঘটনা…।
শুক্রবার দিন।
বাসায়-ই ছিলাম। দুপুরবেলা দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে- দরজা খুলতেই মীনা’র কান্নাজড়িত কন্ঠ-
— দোয়া করো তো ফুপু, যানি তিনদিনের মধ্যেই আমার জনম দুখিনী ‘মা’ মরে। এত দুঃখকষ্ট-আর তো সহ্য হয়না ফুপু। মেয়ে হয়ে মায়ের অত কষ্ট চোখে দ্যাখা যায়, বল? তারচেয়ে মায়ের মরাই ভাল।
ভরদুপুরে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে মীনা’র এমন আবেগময় কথায় আমি প্রথমে হা হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম ওর দিকে। আরে বলে কি মেয়েটা! নিজের মা’কে কেউ এভাবে মরতে বলে নাকি?
পরক্ষণেই ভাবলাম-
নিশ্চয়ই বড়সড় কোনো ঝামেলা আছে! না- হলে নিজের মাকে কেউ এভাবে মরতে বলতে পারে?
সম্ভবত বছর সাতেক আগের ঘটনা হবে এটি।

আমার পুরনো কাজের মেয়ে- ‘সুইটি’ তখন আমার পাশেই ছিল।
সুইটি চব্বিশ বছর যাবত খাপছাড়াভাবে আমার বাসায় কাজ করছে। ‘ও’ আরেক কিছিমের আধপাগলী। মন চাইলে কাজে বহাল থাকে, না চাইলে নোটিশ ছাড়াই গ্রামে চলে যায়। আবার মর্জি হলে সব ফেলে ছুটে চলে আসে আমার কাছে। এই আসা-যাওয়ার মধ্যে ওর সাথে আমার আত্মিক ভালবাসা বেড়েছে বৈ কমেনি। সুইটির বড় গুণ হলো- বিশ্বস্ততা।
আর খারাপ গুণ হলো-
রোজ এপাড়া ওপাড়া বেড়ানো। আর সত্য-মিথ্যা জোড়াতালি দিয়ে-এর কথা ওকে বলা, ওর কথা একে বলে ঝামেলা পাকানো। অবশ্য যারা সুইটিকে চেনে-জানে, তারা কেউই ওর এইসব আজগুবি কথাকে পাত্তা দেয়না।

‘মীনা’ আমার খুব পরিচিত।
একই গ্রামের এপাড়া ওপাড়া। ছোটকাল থেকেই ওদের পুরো পরিবারকেই আমি ভালমতো চিনি-জানি। ওর মাকে ‘ভাবী’ ডাকতাম। কৈশোরে কত কাঁচা-পাকা আম, বরই, জলপাই একসাথে খেয়েছি। প্রাইমারী পাশ করার পরপরই মীনার বিয়ে হয় গ্রামেরই এক কৃষক পরিবারে। স্বামী গাঁজাখোর হলেও- ‘জাতে মাতাল তালে ঠিক’। মীনাকে সে খুব ভালবাসে। ভুলেও বউয়ের গায়ে হাত তোলেনি কখনো। গ্রামের মোটাভাত, মোটাকাপড়ে মীনাকে সে সুখেই রেখেছে। কষ্ট দেয়নি সে একদিনের জন্যও। মীনা বেশ সুখেই আছে।
মাঝেমধ্যেই মীনা আমার বাসায় আসে। মনের ভেতরে জমে থাকা কিছু কষ্ট জানাতে, আর একমাত্র ভাই ‘ মানিক’ এর নামে নালিশ করতে। সেদিনও তাই-ই এসেছিল।
দুই ছেলেমেয়ের মা- মীনার রূপ-যৌবনে খানিকটা ভাটা পড়লেও মেজাজ আছে ঠিক আগের মতই। ছোট ভাই ‘মানিক’কে সে কড়া শাসনে রেখেছিল এতদিন। কিন্তু আর পারছে না। হাতের নাগাল থেকে ছুটে গ্যাছে সে। বছর খানেক হলো-মানিকের ঘরে বউ এসেছে। বউ এসেই নাকি বাড়ির কিছু সংস্কার করেছে। প্রথমেই যা করেছে-
★ বিধবা শাশুড়িকে তার ঘর থেকে বের করে- থাকতে দিয়েছে এক্কেবারে পাশের গোয়ালঘরে। অবিশ্বাস্য হলেও এটিই সত্যি। একপাশে দুধেল গাভী থাকে আরেক পাশে চৌকিতে শাশুড়ি। আর শাশুড়ির আদি ঘরে থাকতে দিয়েছে- মানিকের হাইস্কুল পড়ুয়া- ‘বড়কুটুম’ একমাত্র শ্যালকবাবু ‘রতন’কে।
দ্বিতীয় কাজ করেছে-
★ মীনাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে- তার বাপের ভিটেয় ঘনঘন আসা পাকাপোক্ত ভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। তার সাফ কথা যে- বিয়ের পর মেয়েদের স্বামীর বাড়িতেই থাকা উচিত, বাপ-ভাইয়ের বাড়িতে নয়। এতে ভাবী- ননদের সম্পর্ক নষ্ট হয়।
মীনা তাই বাধ্য হয়ে- দূর থেকেই যতটুকু পারে- মানিককে গালমন্দ করে আর ওর বউকে ‘জোড়া মোরগ’ মানত করে অভিশাপ দেয়।
— আস্ত ‘ভ্যাড়া মার্কা মানিক’ বউয়ের কথাতেই উঠে-বসে-শোয় গো ফুপু।
এসেই আমার কাছে মীনার প্রথম অভিযোগ ছিল এটি।
— নইলে- প্যারালাইজড মায়ের প্রতি এতবড় অন্যায় দেখেও ক্যানো সে বউকে কিচ্ছু বলে না? মায়ের ঘরেই বা শ্যালককে তুললো কোন আক্কেলে? বল ফুপু? মানিক ‘সোনা ফেলে, আঁচলে গেরো’ দিছে। নিশ্চয়ই বউ তাবিজ করেছে ফুপু! বিয়ের আগে আমার অমন ভোলা-ভালা মানিক– আমাকে ছাড়া কিচ্ছুই বোঝেনি। আর এখন সে আমাকে দেখতেই পারেনা। কথা পর্যন্ত কয়না। বউ ছাড়া কিচ্ছু বোঝেনা সে। নির্ঘাত বউ তাবিজ করেছে ফুপু!!
এটি ছিল তার দ্বিতীয় অভিযোগ ।

রাতভর মীনা কখনো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছে, কখনো বা মিনমিনে গলায় মানিক আর ওর বউয়ের বিরুদ্ধে নালিশ করেছে। আর ঘুম ঢুলুঢুলু চোখে আমাকে তা শুনতে হয়েছে গভীর মনোযোগ দিয়ে। সাথে- হু, হ্যা-ও করতে হয়েছে।
মীনার মুখে বিস্তারিত শুনলাম।
স্ট্রোক করে এক সাইড প্যারালাইজড হয়ে গ্যাছে মীনার মায়ের। কথাও অস্পষ্ট। প্রস্রাব-পায়খানার অনুভূতি নেই, বিছানাতেই হয়ে যাচ্ছে। অল্পবয়সী মানিকের বউ এতসব দুর্গন্ধ সইতে পারে না। তাই, সমাধানের উপায় হিসেবে- শাশুড়ির স্থান হয়েছে- গোয়াল ঘরের স্যাঁতস্যাঁতে মেঝেতে।
এর পেছনে তাদের অকাট্য যুক্তিও আছে। তা হলো-
গাভীর প্রস্রাব-পায়খানার গন্ধের সাথে মায়েরটা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। ফলে-বাইরের লোক কেউ বুঝবে না যে, গাভী না মায়ের গন্ধ।
যারজন্য মায়ের মৃত্যুই মীনার একান্ত কাম্য। শুধুমাত্র মায়ের মৃত্যুই পারে সবকিছুর সমাধান দিতে।
তাছাড়া-
দিনের পর দিন কে দেখে অসুস্থ মা’কে? ‘মা’ হয়েছে আজ সবার কাছে মস্ত ভারী বোঝা!!
একসময় মীনার কান্না, অভিযোগ থেমে যায়। ক্লান্তিতে নাক ডেকে ঘুমাতে থাকে সে।
সকালে নাস্তা শেষে মীনাকে বুঝাতে বসলাম। সুইটিও পাশেই ছিল। বললাম-
— হ্যা রে, তোর শ্বশুর-শাশুড়ির খবর কি মীনা? উনারা বেঁচে আছে তো তাইনা? ক্যামন আছে উনারা?
হঠাৎ জোকের মুখে লবণ দিলে যেমন হয়।
মীনা মুখ কাচুমাচু করে বললো-
— ওদের মরণ আছে নাকি ফুপু? যক্ষের ধন। থাকে ছোট ননদের বাড়িতে।
মীনা আমার মেহমান। বেশিকিছু বললাম না। শুধু হাসলাম।

মীনাকে বাবা-মায়ের হক সম্পর্কে বুঝালাম। জানি লাভ হবে না। তাও বললাম।
আল্লাহ্‌ পাকের ইবাদতের পরই বাবা-মা’র স্থান। পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় বাবা-মা’র হকের কথা বলা হয়েছে।
আমার আধপাগলি, মুর্খ সুইটি একটা কথা প্রায়ই বলত-
“বউ মরলে আপন বউ পাওয়া যাবে,
কিন্তু বাবা-মা মরলে- সারা দুনিয়া খুঁজে আপন বাবা-মা পাওয়া যাবে না”।
আহবান করি–
বউকে অবশ্যই ভালবাসুন। তার দায়িত্বও পালন করুন। কিন্তু বাবা-মাকে বাদ দিয়ে নয়। অথবা, বাবা-মাকে অবজ্ঞা-অবহেলা করে নয়। বরং বাবা-মা’র হক- মর্যাদা অনেকগুণ বেশি। তাঁদের হকই আগে….। তাঁদের সন্তুষ্টিতেই আল্লাহ্‌র ‘জান্নাত’।
বাবা-মা’র কদর আগে, বউ এর টা পরে।
নইলে আফসোস হবে- সারাজীবন ধরে।।
বাবা-মাকে দূরে রেখে- বউ নিয়ে নাচলে-
আখেরাতে নির্ঘাত বিপদ আছে, বুঝলে?
সময় থাকতে করো বাবা-মার ভক্তি,
জান্নাত নিশ্চয়ই পাবে- রাসুলের উক্তি।
নারীরাই নারীর শত্রু, পুরুষরা নয়,
বউ-শাশুড়ি মিললেই হবে ‘জান্নাত’ জয়।।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও শিক্ষক 

আরও পড়ুন