সেরা সম্মাননা

বিনতে কাজী 

১.

আমি আমাদের এলাকার সেই সরু গলিটা দিয়ে হাঁটছি, যে জায়গাটা দিয়ে চলাচল করা মেয়েদের জন্য খুব একটা সুখকর না। তবে আজ আমি বিস্ময়ে থ’। জটলা পাকিয়ে ছেলেরা ধূমপানের ধোঁয়া  ছড়াতে ছড়াতে  হাসিতে লুটোপুটি। 

এমন সময় আমি প্রায় ওদের পাশ ঘেঁষে ই যাওয়ার মূহুর্তে খেয়াল করলাম ওরা একে অপরকে সিগারেট ফেলে দেওয়ার ইশারা করছে। শুধু তাই নয় যথাসম্ভব সরে দাঁড়ালো।ওদের এমন অদ্ভুত কান্ড আমাকে কিছুটা বিমোহিত করলো, ভালোও লাগলো বটে।ইতোমধ্যে একজন মধ্য বয়সী খালাম্মার চলার ধাক্কায় ঘুরে দেখলাম পিছনে ছোট পিক আপ, আমার পাশ ঘেঁষে আছে।আমি লজ্জিত হয়ে দ্রুত পা বাড়াতে ই  পিকআপ চালক মাথা বের করে বললো-

“আফা আপনার নিরাপত্তার কথা তো আপনাগোই ভাবা দরকার, রাস্তায় এমনে বেখেয়াল হইলে তো বিফদে পরবেন, আবার হর্ন দিলেই কইবেন কানে লাগছে। সাবাধানে যান। “

আমি মাথা নেড়ে তার কথার সম্মতি দিলাম।

একটা কণ্ঠের তীব্রতা আর ঝাঁকুনি,  এই বেলা ৯ টা বাজে আর কত ঘুমাবি? চোখ মেলে সেকেন্ড খানিক বোঝার চেষ্টা করলাম এবং বুঝলাম কি ঘটল।

বুঝার পর্ব শেষ,  বাস্তবে ফিরে এসেই ভোঁদৌড় দিলাম তৈরি হতে। যাকে বলে নাকেমুখে ওঠা অবস্থা। হাতে পানির বোতল, পায়ের মোজা, ব্যাগ আর অন্য হাতে স্কুটির চাবি, এসব কোন রকম সামলে কেবল  বের হচ্ছি….. 

মা রান্না ঘর থেকে চিৎকার, তুই ঠিক হলি না, সবদিনই ঘুমাতে হবে হোক পরীক্ষা আর বন্ধের দিন। কিছু তো মুখে দিয়ে যা…

কে শোনে এসব কথা আমি ততক্ষণে সিঁড়ি বেয়ে নামছি আর ঘড়ির প্রতি মেজাজ নিয়ে তাকিয়ে আছি। নিচে নামতে নামতে মনটা বিষাদে ছেয়ে গেলো, একে তো আজকের মতো দিনেও দেরি হলো তারওপর এখন আবার……. 

চিরচেনা গলির মোড় অতিক্রম করার সময় আজও নিয়মের ব্যত্যয় হয়নি। একদল ছেলে মহড়া দিচ্ছে , এদের আমি কোন দিন ঘরে ফিরতে দেখিনি, সে হোক রাত বা দিন পথই যেন তাদের আশ্রয়। অথচ এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান তারা আর এদের সদস্য জ্বি ভাই জ্বি ভাই করা কিট, যারা এলাকা টাকে অস্থির করে রাখে।স্বপ্ন আর বাস্তবতা শুধু এক দীর্ঘশ্বাস……

ধোঁয়ার কুন্ডলির ভিতর দিয়ে ছুটে চললাম গন্তব্যে। কথায় আছে “মরার ওপর খাঁড়া ঘা” আজ আমার তেমনটাই হলো। নিদিষ্ট জাগয়ায় পৌঁছাতে এখনও অনেকটা দূর, তার ওপর জ্যামের সমস্যা।  এমন সময় বিপত্তি সৃষ্টি করলো আমার কটকটি খটখটে স্কুটি টা। 

এখন আমার দম বন্ধ হওয়া অবস্থা কোথায় নিব কি করব, চোখ বুজে ভাবছি, মূহুর্তেই পিছনে গাড়ি হার্ড ব্রেক করার ঘ্যাচাত শব্দ আর ঠুক করে একটা ধাক্কা। আমি কাত হয়ে পড়ে যেতে যেতে উঠে দাঁড়ালাম। রাগে দুঃখে আমার কাহিল লাগল। গাড়ি চালক বের হয়ে এসে চিৎকার জুড়ে দিলো, “এমন ছোট খাটো গাড়ি নিয়ে ম্যাম সাব সেজে রাস্তার মাঝে কি করেন?” 

এবার রাগ বিরক্তে পরিণত হলো।

আমি কিছু বলতে নিচ্ছি…… 

এরই মধ্যে ড্রাইভার স্কুটিটা ঠেলে পাশ করার কসরত শুরু করে। রাগ আর বিরক্তি মিলেমিশে কেমন যেন একটা ভাব আসলো। আমি নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম, ভাব টা যা করার কর দেখি কি হয়। সময়ক্ষেপণ হওয়ায় গাড়ি থেকে এক ভদ্রলোক নেমে এলেন। কাছাকাছি হতেই চিনতে পারলাম, এক সময় বাবা তার অফিসে কাজ করতেন। তার একটা ইন্টারভিউতেও রিপোর্টার হিসেবে ছিলাম। 

“কি ব্যাপার ড্রাইভার!!! কখনও ঝামেলা ছাড়া কি গাড়ি চালাতে পারো নাহ?” -কপালে বিরক্তির রেখা স্পষ্ট।

-স্যার দোষ টা তো এই ম্যাম সাহেবের।

এবার আমি সালাম দিলাম, তাকালেন আমার দিকে। 

-স্যার ভালো আছেন?

-উমমম…তোমাকে চেনা চেনা লাগছে…কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছি না। 

-আমি বাবার পরিচয় দিলাম।

-হুম, তোমার বাবা ভালো মানুষ ছিলেন।তার চলে যাওয়ার কথা শুনে খারাপ লেগেছে।

– আমি নিচে তাকিয়ে আছি, অনেক সময় শব্দরাও লুকোচুরি খেলে। আজও এমন হলো। 

আমি আমার স্কুটির দিকে অসহায় ভঙ্গিতে তাকাতে লাগলাম। অবস্থাটা হয়ত তিনি বুঝলেন। 

-বললেন আমার সাথে যেতে পারো, কোথায় যাবে?

আমি কনফারেন্সের ঠিকানা বললাম, শুনে বললেন- তোমার ভাগ্য ভালো আমি ওখান দিয়েই যাচ্ছি। ইতস্তত করলাম কিন্তু একটা ফোন কাল মনকে আরো কাহিল করে দিল, যাওয়ার ভীষণ তাড়া পড়ল। ছোট ভাইকে ফোন দিয়ে স্কুটির গতি করলাম।

যদিও গাড়ি চলছে তার নিয়মে,তবে আমার মন বলছে ড্রাইভার দক্ষ না, আমি চালানো শুরু করি। আমি যে দেরি করে বের হলাম তার কথা কে বলবে। বারবার অস্থির ভাবে জানালা দিয়ে বাহিরে দেখছি। এমন দুই সময় হয়ে থাকে -এক. কোন কিছু নিয়ে শঙ্কিত হলে দুই. আপনি দুশ্চিন্তা করছেন কিন্তু সে বিষয়ে আপনার করার কিছুই না থাকলে। 

-তুমি কনফারেন্সে যাচ্ছো?

-আমি চট করে মুখ ঘুরিয়ে বললামঃ হু, আমার চাহনিতে আবাক হওয়ার ছাপ স্পষ্ট। 

-তোমার আইডি দেখে বুঝলাম।

-ওহ,( আয়োজকদের পক্ষ থেকে আইডি প্রদান করা হয়েছে, নিরাপত্তা  নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে) 

-আমিও জিজ্ঞেস করলাম আঙ্কেল আপনি?

-আজ তো নারী দিবস, সে উপলক্ষে নারী সমিতির উদ্যোগে আলোচনা সভার আয়োজন  করেছে, সেখানে প্রাধান অতিথি। 

সময় ১০.১০,

-ড্রাইভার চাচা আর কত সময় লাগবে?

-সিগন্যাল না পরলে ১৫-২০ মিনিট। 

খোঁজ নিলাম খটখটে কটকটির, সে এখন ভালো আছে, বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একটা বাক্য মনোযোগ কাড়লো,

“এটা তোমার সমস্যা, আমার মিটিং আছে। তুমি ক্যাব করে তাতে ডাক্তারের কাছে যাও আসার সময় ড্রাইভার নিয়ে আসবে।”

আমি জানিনা ওপারে কে বা কি উত্তর দিলো, পরক্ষণেই এপাশ থেকে –

“তুমি বাচ্চা না, এমন আচরণের কোন মানে নাই। সন্তান না দেওয়ার অক্ষমতার জন্য আমি দায়ী না। তুমি সংসারে আছো এতেই সুখী থাকো,এর বেশি আশা করো নাহ।”

খুব একটা উচ্চ স্বর ছিলো না, যেহেতু পাশেই বসা ছিলাম, না চাইতে অপ্রত্যাশিতভাবে কানে গেলো। বিষয়টা তিনিও অনুধাবন করলেন।

-তোমার আন্টির সাথে কথা হলো, মেয়ে মানুষ তো একটুতেই আবেগী হয়ে যায়।

-হু…..

-সামনের গেইটে রাখো। 

-আমি আমার সব কিছু নিয়ে নেমে যাচ্ছি, 

ফিরে আঙ্কেল কে ধন্যবাদ দিলাম।আমার হাতে দুটি কার্ড তুলে দিলেন, বললেন দরকার হলে যোগাযোগ করো।

গাড়ি আর তার যাত্রী তাদের গন্তব্যে ছুটছে… 

হাতে থাকা কার্ড দুটো ব্যাগে রাখতে গিয়েও নামে দৃষ্টি পড়লো….মিসেস…

নির্বাহী পরিচালক 

মহিলা পরিষদ।

মুচকি হাসলাম… হায়রে নারী দিবস হায়রে নারী।

২.

১০.৩৫ এ প্রবেশ করলাম হলরুমে, রুমজুড়ে মানুষে পরিপূর্ণ। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে এদিক সেদিক তাকাতেই এক স্বেচ্ছাসেবিকা এগিয়ে এলো।চেনা মাত্রই আমাকে আমার আসনটির কাছে যেতে সাহায্য করলো। আজ নারী দিবস উপলক্ষে বিশিষ্ট নারীদের সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। 

যারা গত একবছরে কোন  অবদান মূলক কাজ করেছেন। আমি একজন সাংবাদিক হিসেবে- আর্থ -সামাজিক ক্ষেত্রে  নারীর অবস্থা নিয়ে একটা রিপোর্ট করেছিলাম। ভীষণ সাড়া পাওয়ায় এই সম্মাননা।অনুষ্ঠানের কার্যক্রমের সূচনা ঘোষণা পর্ব শেষ, এখন উদ্বোধনী বক্তব্য চলছে।

আমি আমার কথা মনে মনে গুছাচ্ছিলাম এখন বক্তব্য রাখবেন…

নামের ঘোষণাটা শুনতেই  অবচেতনভাবেই তাকে দেখার জন্য তাকালাম, স্বনামধন্য বালিকা কলেজের অধ্যাপক। হুম তিনি আমারও শিক্ষক ছিলেন।

“আমি কলেজে নতুন, সিরিয়াস টাইপ শিক্ষার্থীদের একজন। দুনিয়ায় যত যাই করি ক্লাসের বিষয়ে কোন ছাড় নাই। ঝড় তুফান যাই হোক আমি ক্লাসে হাজির। একদিন ম্যামের ক্লাসে পিছন থেকে কেউ বারবার গুঁতো দিচ্ছিলো, এক পর্যায়ে  বিরক্তি চেহারা নিয়ে তাকালাম ওদের দিকে..ঝাড়ি দিলাম…

ম্যাম আমাকে দাঁড় করালেন, বললেন –

তোমার যে চেহারা, এমন করে তাকালে কেমন লাগে জানো? (আমি কালো,শ্যাম বর্ণ,উজ্জ্বল শ্যামলা না। কালোই)। ক্লাস শেষে বন্ধুরা সমবেদনা জানিয়েছিলো  অবশ্য…. 

আজ সে নারী অধিকার নিয়ে আলোচনা করছে….

কবিতা আবৃত্তির পর আবারও একজন বক্তব্য রাখলেন, এরপর কিছু শিক্ষার্থীদের মাঝে কুইজ প্রতিযোগিতা হলো।

এপর্যায়ে বক্তব্য রাখবেন…….

মহিলা সমিতির ঢাকা দক্ষিণ জোনের সভানেত্রী…..

” কিছু দিন আগে অফিসের পক্ষ থেকে এক মন্ত্রীর মেয়ের বিয়ের নিউজ কভার করতে গিয়েছিলাম। ঘটনাক্রমে এই নেত্রীর সাথে আলাপ, এক সাথে খেতে বসলাম।

কথায় কথায় বলছে, মন্ত্রীর মেয়ে বলে চলে গেলো।

– বুঝিনি তো বিষয়টা।

-আরে বুঝোনি, মেয়ের গায়ের রং ময়লা।এসব মেয়েদের বিয়ে দেওয়া কঠিন আজকাল। 

– আপনার মেয়ে আছে?

– আরে নাহ, এক ছেলে বাহিরে থাকে।

-বিয়ে করেছে? 

– দেশে তেমন মেয়েই পাচ্ছি না।

-কিছু বলতে গিয়েও সংযত করে নিলাম নিজেকে। কিছু মানুষের সাথে তর্কের থেকে নিরবতা শ্রেয়…..

আজ তার কণ্ঠের সুর ভিন্ন…… 

কখন যে আমার পর্ব এলো আনমনা ছিলাম, বুঝতে পারিনি। ম্যাম আপনার জন্য কিছু প্রশ্ন আছে…দর্শকদের কাছ থেকে….. 

আমি মাইক্রোফোন অন করলাম, শুভ দুপর। আমার কাছে আসা প্রশ্নগুলো আমি এখনে উপস্থিত সম্মানিত, গুনীজনের কাছে হস্তান্তর করছি। তারা আমার থেকে সুন্দর এবং মনতুষ্ট পূর্ণ উত্তর দিতে পারবেন। 

আমি আজকে এখানে একজন নারী হিসেবে আমার কিছু অনুভূতির প্রকাশ করবো, সম্পূর্ণ আমার চিন্তাধারা। তবে কারো মতামতকে অবশ্য আঘাত করবো না। আজকের দিনটা বলা হয় বিশেষ করে আমাদের জন্য। তাই আমার নিজের কথা বলবো, নিজের ভাবনা আপনাদের সাথে শেয়ার করবো। 

“আমাদের একটা বড় দাবি সমতা প্রতিষ্ঠা করা,(সজোড়ে করতালির শব্দ ধ্বনিত হচ্ছে) 

কিন্তু…… হুম কিন্তু  আছে। সমতা মানে সমান সমান হওয়া। সেই সূত্রে পুরুষ দিবস হওয়া উচিত(এবার সবাই অবাক হয়ে একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে)।

আমি কথার মাঝেই জিজ্ঞেস করলাম-আমি কি আমার কথা বলতে পারি? নাকি শেষ করে দিবো?

– পিনপতন নীরবতা, আয়োজক ও অন্যান্য অতিথিবৃন্দ দ্বিধাগ্রস্ত। 

অবশেষে সৌজন্যতার চাদর মুড়ে বললো বলুন বলুন….

দর্শকশ্রোতাও মনোযোগী হলো।

যদি এভাবে সব বিষয়ে সমতা করতে রাজি না থাকেন, তাহলে সমতা নয় বরং যার যার অধিকার প্রতিষ্ঠায় শ্রম দিন। পুরুষকে তার অধিকারে, সম্মানে পুরুষই রাখুন, নারীকে তার জায়গায় তার মতো সাজাতে দিন নিজেকে। দিন শেষে আমরা সবাই এক, নারী পুরুষ শ্রেণি বিভক্তি পরে, সর্বপ্রথম আমাদের পরিচয় আমারা মানুষ- সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট সেরা জীব। পুরুষ, পুরুষ হিসেবে, নারী- নারী হয়েই অনিন্দ্য সুন্দর। 

আমি নারী,আমি পুরুষের মতো মধ্য রাতে বাসায় ফেরা নিয়ে সমতা চাই না, তবে প্রয়োজনে বাহির হলে তখন নিরাপত্তার অধিকার চাই। বিয়ের কনে হয়ে সাদা কালো, সৌন্দর্যের ময়নাতদন্তের অভিক্রিয়া থেকে মুক্তি চাই। 

আমি কন্যার সম্মান চাই,আমি স্ত্রীর মর্যাদায় ভূষিত হতে, আমি মা হয়ে বৃদ্ধাশ্রমের সংকীর্ণ গণ্ডি পেরোতে দিনগুনি। আমি বোন, আমি ছাত্রী, আমি ভাতিজী, আমি ভাগ্নী, আমি নারী।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্মাননা সৃষ্টি কর্তার সৃষ্ট সেরা জীব মানুষ, অনন্য সম্মাননা আমি নারী। এর থেকে বড় আর কি আছে…তোমরা সমতা দেওয়ার আগে আমার পাওনা অধিকারটুকু ফিরিয়ে দাও।

আমি সুন্দর আমার সীমাবদ্ধতায়, আমি সুখী আমার আঙিনায়। যদি পারো আমার আমি কে ফিরে দিও, যা খোয়া গেছে  তথা কথিত এই লৌকিকতার জঞ্জালে পরিপূর্ণ দিবসের ভিড়ে। এটাই হবে আমার সেরা সম্মাননা। 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন