স্বনির্ভর হতে চাওয়া কি নারীর অপরাধ?

মাহফুজা শিরিন

কোন পথে এগুচ্ছে সমাজ? নাকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে পিছু হাটছে….? শিক্ষিতা একটা মেয়েকে স্বনির্ভর হতে চাওয়ার অপরাধে যদি শাস্তি পেতে হয় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে যদি সেই শাস্তি হত্যা পর্যন্ত গিয়ে গড়ায়, তাহলে যারা স্বনির্ভর না হয়ে নিজের উপর কতগুলো মানুষকে নির্ভর করিয়ে নিজের প্রতিভা,ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা সব চাপিয়ে রেখে বিনা পারিশ্রমিকে দিনের পর দিন সার্ভিস দিয়ে যায়, তাদের পুরুষ্কারগুলো কোথায়…??

ছোট বেলা কিছু না বুঝে ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম।জীবনের কোন একটা সময় মায়ের অসুস্থতার কারনে এক টানা পনেরো দিন হাসপাতালে থেকে ডাক্তারদের জীবন খুব কাছ থেকে দেখে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ওখানেই ঝেড়ে ফেললাম।কারন আমি আরামপ্রিয় মানুষ। একটা সাজানো সংসার, সুন্দর সুন্দর বাচ্চারা,একটা রান্নাঘর আর নিজের হাতে বানানো কিছু মজার মজার খাবার। ব্যাস জীবনটা চলে যাবে।তবে মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে কোন আপোষ নেই।একটা মেয়ের একটা ফাইল থাকা চাই।

কোন এক বিশেষ কারণে আব্বু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আমাকে প্রাইমেরি স্কুলে চাকরি দিবেন এবং আমি তার কাছেই থাকব।তার অভিযোগ তার রাজকন্যার অমর্যদা হচ্ছে।ততোদিনে আমিও এক রাজকন্যার মা।আব্বুর রাজকন্যার বয়স বিশ বছর আর আমার রাজকন্যার বয়স মাত্র দুই বছর।আমি নিজেকে বিবেকের কাঠগড়ায় দাড় করালাম।মনের আদালত রায় দিল বিশ বছরের রাজকন্যার পাশে তার বাবাকে নয় দুই বছরের রাজকন্যার পাশে তার বাবাকে রাখো।আর চাকরি ওসব আমকে দিয়ে হবে না কারন আমি বাহিরের পরিবেশে মোটেও সাবলীল নই।ভাইবা বোডে দাঁড়াব একথা ভেবেই আমার হাটু কাপছিল। সব চেয়ে আর্চয্যের বিষয় হল আমার মা কখনো চাননি আমি আমার আব্বুর কথা শুনি।এজন্য আমার সবচেয়ে প্রিয় মা মনে মনে অপ্রিয় হয়ে গেল।আমার একটাই অভিযোগ মেয়ে হয়ে কেন মেয়েদের দরদ বুঝবেনা!-একটা সময় চাকরি অপছন্দ করা এই আমিই আবার বোরিংনেস কাটাবার জন্য বাচ্চাদের বাবার কাছে কোন একটা কাজ করার অনুমতি চাইলাম সে আমাকে লজিক দেখাল বাচ্চাদের লাইফের এখন টার্নিং পয়েন্ট, তাদের মানুষ হওয়া সব চেয়ে জরুরি। প্রয়োজনে বাড়িটা তোমার নামে করে নাও,কত টাকা আর পাবে আমি সেভিং একাউন্ট করে দেই ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কিছু।আর এসবের জন্য তো আমার মায়ের কাছে এর চেয়ে ভাল ছেলে হতেই পারেনা। কত মেয়েদের গায়ে হাত তোলে,টর্চার করে!আমার মায়ের কথা মোটেও ভালো লাগেনি কারন বাচ্চাদের বাবাকে প্রায়ই তার কলিগ বা বন্ধুদের কাছে বলতে শুনি, -আমি তো প্রফেসর স্টুডেন্টস পড়াই আমি বুঝি বাচ্চাদের মা যেখানেই হাত রাখবে ভালো করবে,কিন্তু দরকার কি সন্তানদের মানুষ হওয়া সবার আগে।তাহলে সে জানতো কিন্তু কখনো সে উতসাহ দেয়নি।

যাই হোক মূল প্রসঙ্গে আসি -গত ২৩শে জুন স্বনির্ভর হতে চাওয়ার অপরাধে সুমাইয়া হত্যা হওয়ার পর থেকে একজন নারী হয়ে জন্মানো এই আমি যেমন হয়েছি আহত আর লজ্জিত, তেমন আবার নিজেকে কেমন যানি ধন্য ধন্য মনে হচ্ছে কারন আমাকে চাকরি চাওয়ার অপরাধে হত্যা করেনি!কেন জানি মায়ের সাথে গলা মিলিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে মেয়েরা কত কিছুর স্বীকার হয় প্রানে যে বেচে আছি সেটাও বা কম কিসে!

রুবাবা দৌলা মতিন নামে আমি একজন সফল নারী কে চিনতাম। উনি একটা কম্পানির উর্ধতন কর্মকর্তা ছিলেন। কোন বড় ধরনের একটা সাফল্যের জন্য তাকে পুরুষ্কৃত করা হয়ে ছিল। পুরুষ্কার হাতে নেয়ার সময় উনি যে কথা গুলো বলেছিলেন আমার কানে আজও বাজে।উনি বলছিলেন, আমি সাধারণ একজন নারী, আমাদের সমাজে আনাচে কানাচে আড়াল হয়ে আছে অনেক সফল নারী , এই পুরুষ্কারটা তাদের জন্য কারন আমরা তাদের কাছে অনেক ঋনী।আমার তার কথাগুলো মনে ধরেছিল কারন সত্যিকারের সফল নারীরা কখনো কাউকে ছোট করে দেখেনা।

সত্যিই তো! আমি ছোটবেলায় এক আছিয়াবানুকে দেখেছি যে প্রচন্ড শিতের মধ্যে বাচ্চাকে ফিডিং করাত আর মশলা পিষতো, সাথে এমন সুরেলা কন্ঠে গান ধরতেন কে জানে সুযোগ পেলে উনি ও হতে পারতেন একজন সাবিনা ইয়াসমিন অথবা রুনা লায়লা।একজন রব্বেজানি কে চিনতাম যে কুজো হয়েও ঢেঁকিতে কষে পার দিতেন আর পুথি বানিয়ে বানিয়ে বলতেন।তার অক্ষর জ্ঞান ও ছিল না, যদি থাকতো তাহলে হয়ত একটা কাগজ আর কলম নিয়ে ঝড়াতে পারতো সুফিয়া কামালের মতো অনেক কিছু।

এইসব আছিয়াবানুর বাটা মশলার তরকারি আর রব্বেজানিদের ঢেঁকিছাটা চাল খেয়ে আমাদের সমাজ অনেক এগিয়ে গেছে।শুধু তাদের অবদান কেউ মনে রাখেনি।মনে রাখবেনা কেউ সুমাইয়ার কথা।

কোন পথে এগোচ্ছে আমাদের সমাজ।একজন ঘর গুছানো নারীকে কোনঠাসা করতে ছারিনা।আবার সাবলম্বি একজন নারীকে দেইনা তার প্রাপ্য সন্মান।স্বনির্ভর হতে চাইলে তাকে করা হবে হত্যা!প্রশ্ন উঠে মনে আমাদের সমাজ মাঝেমাঝে পিছু হাটছেনা তো……!

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন