স্মৃতির পাতায় মা

আব্দুল লতিফ

রাতে স্বামী স্ত্রী ঘুমিয়ে আছে হঠাৎ তাদের বাচ্চা কান্না শুরু করে। তাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়।স্বামী স্ত্রীকে বাচ্চার কান্না থামাতে বলে মা চেষ্টা করে না পেরে বাচ্চাকে নিয়ে মাঝরাতেই হাটাহাটি করছে তা দেখে স্বামীর তার মায়ের কথা মনে পড়লো। সে মায়ের সাথে অনেক খারাপ আচরণ করে মাকে গ্রামের বাড়ি রেখে স্ত্রীকে নিয়ে শহরে বসবাস করছে। তার মন সারারাত খুব খারাপ ছিল। সে আনমনে ভাবতে শুরু করল। সন্তান যখন গর্ভে আসে মা খেতে পারে না যা খায় তা বমি করে বাহির করে। এভাবে দিন যেতে থাকে যত দিন যায় মার কষ্ট বাডতে থাকে। ১,২,৩,৪,৭,৮ মাস যেতে থাকে মা ঠিক মতো খেতে ও ঘুমাতে পারে না। রাতে যখন মা ঘুমায় তখন পেটে ব্যথা করে মা তখন উঠে বসে তাও থাকতে না পেরে মা দেয়ালে পিঠ লাগিয়ে দাডিয়ে কাদে। দিন যত যায় মায়ের কষ্ট ততই বাডে। মা কাজ করতে পারে না। উঠতে বসতে কষ্ট হয়।এভাবে দিন যেতে থাকে সময় ঘনিয়ে আসে সন্তান ডেলিভারির।মা সন্তান ডেলিভারিতে যাবে।যাবার আগে মা প্রতিবেশিদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়। একসাথে চলতে গিয় অনেক অন্যায় করেছি। অনেক ভুলত্রুটি করেছি সবাই মাফ করে দিও।

শ্বশুর,স্বাশুড়ি,ননদ,জা,দেবরসহ পরিবারের সবার কাছে দোয়া ও ক্ষমা চেয়ে নেয়।মা স্বামীর কাছেও ক্ষমা চায়,একসাথে সংসার করতে গিয়ে অনেক ভুলত্রুটি করেছি,অনেক কষ্ট দিয়েছি,তোমার অনেক কথার অবাধ্য হয়েছি,অনেক জ্বালাতন করেছি,তোমার অনেক হক আদায় করতে পারি নি।স্বামীগো আর সাক্ষাত হবে কি না জানিনা দয়া করে আমাকে মাফ করে দিও।চোখ ঝরা অশুনিয়ে মা স্বামীর কাছে ক্ষমা চেয়ে বিদায় নেয়।যাবার সময় মার বুকটা হাহাকার করে।

সময় আসে সন্তান ডেলিভারির প্রসব যন্ত্রনায় মা ছটফট করছে।মনে হচ্ছে তার প্রাণটা বাহির হয়ে যাবে।প্রসব যন্ত্রনা সহ্য করতে না পেরে মা দাইকে বলছে আমাকে বিষ দাও আমি বিষ খেয়ে প্রাণটা বের করে দিব।দাই বলে ধৈয্য ধারণ কর, মা ডাক শুনতে হলে একটু কষ্ট করতে হয়।যন্ত্রনা আরো বাডতে থাকে মা বলে আমাকে বটিটা দাও আমি গলা কেটে আমার প্রাণ বের করে দিব।দাই ঘর থেকে বটি সরিয়ে রেখে মাকে বলে ধৈয্য ধর।সন্তানের মুখ দেখতে হলে এটুকু কষ্ট সহ্য করতে হয়।মা প্রসব ব্যথায় ছটফট করে।মা বলে নিজের হাত দিয়ে প্রাণটা বাহির করে দিবে।দাই আবারও সান্তনা দেয়। দাই মাকে সান্তনা দেয়। মা যন্ত্রনায় ছটফট করতে থাকে।মার প্রাণটা যেন যায় আর আসে।মা যেন এ যুদ্ধের সাথে লড়াই করার শেষ শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছে।মা পরাজয় মেনে নিতে প্রস্তুত।অবশেষে মায়ের কোল জুড়ে ভূমিষ্ট হয় চাঁদের মত ফুটফুটে একটি ছেলে।মায়ের শরীর মৃত্যু যন্ত্রনার সাথে লড়াই করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।মাটির সাথে মিশে গেছে মায়ের শরীর।তবুও সন্তানের মুখ দেখার জন্য যেন চোখ দুটি খুলে রেখেছে।

সন্তান মায়ের সামনে আনা হল মা তার ৩২ টি নাড়ি ছেড়ার ধনকে দেখে সব ক্লান্তি ভুলে গেছে । হারানো সকল শক্তি যেন আবার ফিরে পেয়েছে।মায়ের মুখে তৃপ্তির হাসি।মা হওয়ার হাসি, মা পরম আদরে তার নাড়ি ছেড়ার ধনটাকে বুকে জড়িয় ধরে।হৃদয়ের সবটুকু ভালবাসা মা তার সন্তানকে উজাড় করে দেয়।শুরু হয় মায়ের নতুন জীবনের এতদিন মা একা ছিল। তার কোন সাবধানতার প্রয়োজন হয়নি।কিন্তু এখন মার কোল জুড়ে ফুটফুটে সন্তান।মা তার সন্তানকে মাটিতে রাখে না পিপড়ায় কামড়াবে বলে। এতে সন্তানের কষ্ট হবে।মা তার নাড়ি ছেড়ার ধনকে একা বাড়িতে রাখে না বাবু ভয় পাবে বলে।মা সব সময় সন্তান কোলে রাখে।কোলে করে ভাত খায়,মায়ের সন্তানটি ভাতের প্লেটে প্রশ্রাব করে মা রাগ করে না। মিষ্ট হাসি দিয় মা সন্তানকে চুমু দিয়ে সেই প্লেটের ভাতই মা খেয়ে নেয়।

মা ঘুমানোর সময় তার মন্তানকে ডান পাশে রাখে সন্তান ডান পাশে প্রশ্রাব করে,মা সন্তানকে বাম পাশে রাখে। সন্তান বাম পাশে প্রশ্রাব করে সন্তানকে সেখানেও রাখে না। তার নাড়ি ছেড়ার ধনটি কষ্ট পাবে বলে। মা তার স্নেহের পাত্রটিকে বুকে নিয়ে ঘুমায়। ঘুমের ঘোরে বাবুর ঘুম ভেঙ্গে যায়। কান্না শুরু করে।মায়ের ঘুম ভেঙ্গে যায়। মা সন্তানকে থামানোর চেষ্টা করে। কিন্তু থামে না। মা মাঝরাতেই সন্তানকে নিয়ে হাটাহাটি করে সন্তানের কান্না থামিয়ে,সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে মাও ঘুমিয়ে যায়। সকাল হয়; মায়ের আগেই খোকার ঘুম ভাঙ্গে। মা খোকাকে নিয়ে নতুন দিন শুরু করে। সন্তানের প্রশ্রাবের ভেজা পোষাকগুলো পরিষ্কার করে।

মাকে বাড়ির কাজ করতে হবে তাই তার আদরের সন্তানকে ননদ,জা,দেবর,শাশুড়ি ও শ্বশুরকে দিয়ে কাজ করে। তারা সন্তানকে নিয়ে বহিরে যায় । কাজ করতে করতে মায়ের মনটা সন্তানের জন্য আনচান করে। এই বোধহয় সন্তান কাঁদছে,সন্তানের ক্ষুধা লেগেছে। মা আর ধৈয্য ধারণ করতে পারছে না।কিছুক্ষণ পর সন্তান মায়ের কাছে আসে মা হাফ ছেড়ে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নেয়। দুধ পান করায়ে মায়ের চোখে তৃপ্তির হাসি।

এভাবে দিন কেটে যেতে থাকে। সন্তান আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। কথা বলতে শিখে মা,বাবা বলে ডাকতে শুরু করে। মা ডাক শোনার জন্য অনবরত সন্তানকে উৎসাহ দিতে থাকে। মা ডাকটি তার কাছে মধুর লাগে।সন্তান চলাফেরা করতে শুরু করে। যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতে শুরু করে। শুরু হয় মায়ের নতুন লড়াই,সন্তান কখন কোথায় যায়।

কোথাও পড়ে যায় কিনা,পানিতে নামে কিনা কতকিছু।সন্তান চোখের আড়াল হলেই শুরু হয় মায়ের টেনশন। মা এদিক সেদিক সন্তানকে খুঁজতে শুরু করে। যতক্ষণ না পায়,মায়ের বুকে শান্তি নাই। যখন সন্তানকে পায় মা আদর করে বুকে জড়িয়ে নেয়।

সন্তান আরো বড় হতে থাকে। স্কুলে ভর্তি হয়,সন্তান স্কুলে গেলে মা টেনশন করতে থাকে, না জানি কার সাথে দুষ্টামি করছে ও কাঁদছে। সন্তান ফিরে এলে মা স্বস্তি ফিরে পায়। এভাবেই কেটে যেতে থাকে দিন।

সন্তান প্রাথমিক স্কুল জীবন শেষ করে ভর্তি হয় হাই স্কুলে,সন্তানের পড়াশুনা ও সংসারের খরচ বাড়তে থাকে। অভাবের তাড়নায় নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাওয়ায়। নিজে ছেড়া কাপড় পরে সন্তানকে নতুন পোষাক কিনে দেয়।

হাই স্কুল জীবন শেষ করে ভর্তি হয় কলেজে,ভাল ফলাফল করে খুশিতে মায়ের বুক ভরে যায়। সন্তানকে অনার্সে ভর্তি করিয় দেয়। পড়াশুনা চলতে থাকে। সন্তান বাহিরে মেসে থাকে মায়ের চিন্তা শেষ হয় না। এই বুঝি সন্তানের কোন বিপদ হল। অনার্স, মাস্টার্স শেষ হয়।

সন্তান কিছু দিন বাসায় থাকে মা খুশি হয়। রাতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়। মা দরজা খুলে, জেগে থাকে। এভাবে চলে যায় দেড় বছর। সন্তানের চাকরি হয়। সন্তান শহরে চলে যায়। মা সারাক্ষণ চিন্তায় থাকে।

মা সন্তানকে বিয়ে দিয়ে বৌমাকে দেখতে চায়। সন্তান তার সুন্দরী গার্ল ফেন্ডকে বিয়ে করে। এভাবে সুখেই কাটে কিছু দিন।

তারপর শুরু হয় নতুন বিষয়। সুন্দরী বৌমা তাকে সহ্য করতে পারে না। মা ছাড় দিয় চলে। মাঝে মধ্যে প্রতিবাদও করে। ছেলে স্ত্রীর কথা শুনে মাকে বেধড়ম মারধর করে । মাকে সেই কুড়ে ঘরে রেখে স্ত্রীকে নিয়ে শহরে বসবাস করতে থাকে। মা তবুও সন্তানকে অভিশাপ করে না বরং সৃষ্টিকর্তার কাছে সন্তানকে ক্ষমা করার জন্য মিনতি করে।

এতক্ষণ ছেলেটি বন্ধুর সব কথা ,মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো।তার মনে পড়ে গেল সেও তার মাকে মেরেছে ও মাকে কুড়ে ঘরে রেখে এসে নিজে শহরে স্ত্রী,সন্তান নিয়ে সুখেই জীবন যাপন করছে। সে ছুটে যায় বাসায় । নিজের ব্যাগ নিয়ে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য রওনা দেয়। স্ত্রী, সন্তানকে বলে মাকে আনতে যাচ্ছি।

ট্রেনে টিকিট নেয়,ট্রেন যথা সময়ে যাত্রা করে। সন্তান বাসার দিকে যাচ্ছে আর ভাবছে ৫ বছর কেটে গেল না জানি মা কেমন আছে।

এদিকে মা দীর্ঘদিন না খেয়ে ও অসুস্থতার সাথে লড়াই করে। এখন মৃত্যুর সাথে পান্জা লড়ছে। আর মিট মিট করে চোখ খুলে,সবাইকে বলছে আমার খোকা আসে নি। মৃত্যুর অন্তিম মহুর্তে নিজের দুহাত তুলে বিধির কাছে সন্তানের সুখের জন্য ফরিয়াদ করে। মা প্রতিবেশিকে বলে খোকা এলে বলো আমি খোকাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। মা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়।……………

খোকা বাসায় গিয়ে দেখে অনেক লোক বাড়ির পাশে।সবাই মায়ের দাফন কাজ শেষ করে। শেষ বারের মত স্মৃতি চারণ করছে। খোকাকে দেখে তার চাচি বলে খোকারে এই বুঝি এলি। দেখ তোর মা খেতে না পেয়ে চিকিৎসা না পেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। দেখ খোকা তোর মা কি সুখে জানালা বিহীন ঘরে ঘুমিয়ে আছে। খোকারে তোর মা তোকে মৃত্যুর পূর্বে মাফ করে দিয়েছে। সন্তান মা মা মা……………বলে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কবর জড়িয়ে ধরে। নিজ ভুলের জন্য অনুশোচনা করতে থাকে।

লেখকঃ কলামিস্ট ও  সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন