ইউথেনেশিয়াঃআধুনিক শৈল্পিক মৃত্যু

হাসিবুর রহমান ভাসানীঃ

আমাদের দেশে প্রায়শই একটা ব্যাপার দেখা যায় যে,একজন বয়ষ্ক মানুষ যখন খুব অসুস্থতা নিয়ে অনেক্ক্ষণ যাবৎ মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করেন তখন আশেপাশের অনেকেই দোয়া দুরুদ পড়েন বা যে যার ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী প্রার্থনা করেন যাতে তার মৃত্যুটা সহজ হয়।
আরও একটা ব্যাপার ইদানীং খবরের পাতা খুললে হরহামেশাই দেখা যায় যে,অনেক হাসপাতালেই মা বাবা নবজাতককে ফেলে পালাচ্ছেন কারণ নবজাতক এক বা একাধিক ত্রুটি(জন্মগত) নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে।
আবার ধরুন,কেউ একটা অ্যাকসিডেন্টে হাত-পা হারালো বা মোটামুটি অক্ষম হয়ে পড়লো;
সে ক্ষেত্রে তার কাছের মানুষগুলোই তাকে বাকি জীবন দেখাশোনা করে।
খারাপভাবে বললে,ওই মানুষটি পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

আচ্ছা,যদি এমন কোনো নিয়ম থাকতো যেখানে,
এইসব পরিস্থিতির সম্মুখীন কোনো ব্যক্তি চাইলেই যখন তখন তার ইচ্ছেতে নিজের জীবনের ইতি টানতে পারবেন।
মানে আইনানুযায়ী স্বেচ্ছামৃত্যু বা কারো সহায়তায় আত্মহত্যা বেছে নিতে পারবেন।

সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা কেমন হতো….?

আসলেই কি কোথাও এমন আইন/নিয়ম আছে ?

অবশ্যই আছে।

আর এই প্রক্রিয়াটার নামই হলো ইউথেনেশিয়া।
এটা একটা গ্রীক শব্দ।
যার শাব্দিক অর্থ (Good death) সুন্দর মৃত্যু।
এটিকে অবশ্য Painless death বা যন্ত্রণাহীন মৃত্যু বলেও অ্যাখ্যায়িত করা হয়।

ইউথেনেশিয়া প্রথমবারের মতো শুরু হয় নেদারল্যান্ডস এ।
গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে একজন চিকিৎসক তার ভাইয়ের উপর প্রথমবার এটি প্রয়োগ করেন।
তার ভাই ছিলেন মৃত্যুপথযাত্রী এবং সেই সময়ে শরীরে প্রচন্ড যন্ত্রণা অনুভব করছিলেন;
তাই তার চিকিৎসক ভাইকে বারংবার অনুরোধ করে ইউথেনেশিয়ার মাধ্যমে স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেন।

একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে,
এই প্রথাটি কিন্তু কয়েক শতক আগেও ছিলো।
তবে খানিকটা ভিন্ন পন্থায়।
প্রাচীণ রোম বা গ্রিসে হেমলক বিষ প্রয়োগে মৃত্যু ঘটানোর কিন্তু অনেক নজির আছে।
এছাড়াও তামিলনাড়ুতে ‘থালাইকোথাল’ নামক
একধরনের ইউথেনেশিয়া(কারো সহায়তায় আত্মহত্যা) আগে থেকেই প্রচলিত ছিল।

ইউথেনেশিয়া মূলত ৩ ধরনের;
প্রথমটি স্বেচ্ছায়(Voluntary)।
এ ক্ষেত্রে আপনি নিজের ইচ্ছেতেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন এবং স্বেচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করলেন।
দ্বিতীয়টি অনৈচ্ছিক(Involuntary) এই ক্ষেত্রে দেখা যায়,যাকে ইউথেনেশিয়ার মাধ্যমে মারা হবে সে শিশু,অথবা বিচারবুদ্ধি অক্ষম কিংবা অন্তিমযাত্রায় গুরুতর যন্ত্রণায় কাতর।
চিকিৎসক তখন তার নিকটাত্মীয়ের সম্মতিতে এটি করতে পারবেন।
তৃতীয়টিও ব্যক্তির অসম্মতিতে (Non voluntary)
তবে এক্ষেত্রে ব্যক্তি অনুমতি দেয়ার মতো অবস্থায় থাকেন না।
যার উপর এটি করা হবে সে গুরুতর অসুস্থতায় অজ্ঞান অবস্থায় থাকেন কিংবা জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মানো শিশু।

আর যদি মৃত্যু ঘটানোর দিক দিয়ে চিন্তা করা হয় তাহলে ইউথেনেশিয়া সাধারণত ২ ধরনের হয়ে থাকে।
প্রত্যক্ষ(Active) এবং পরোক্ষ(Passive)।
প্রত্যক্ষভাবে মৃত্যু ঘটানোর ব্যাপারটা হচ্ছে,আপনি স্বেচ্ছায় চিকিৎসকের সহায়তায় মরতে চাচ্ছেন।

এ ক্ষেত্রে চিকিৎসক খুবই উচ্চ মাত্রায় মানে Lethal(মারণ) ডোজের ঘুমের ঔষধ কিংবা অন্য যে কোনো নিশ্চিত মৃত্যু আনয়নকারী ড্রাগ ইনজেকশনের মাধ্যমে আপনার শরীরে প্রবেশ করাবে।
লিথাল ডোজের সিডেটিভ ড্রাগ অথবা পেইনকিলার আপনার শরীরে পুশ করলে আপনি কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে চলে যাবেন এবং খুবই দ্রুততম সময়ে,শান্তিতে মৃত্যুবরণ করবেন।

আর পরোক্ষ ব্যাপারটায় চিকিৎসক আপনার শরীরে কিছুই পুশ করবেন না।
ধরুন আপনি ভয়ানক অসুস্থতা নিয়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র(ICU) তে অবস্থান করছেন কিংবা বিশেষ কোনো ব্যব্স্থার মাধ্যমে চিকিৎসক আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন;
হতে পারে একটা গুরুত্বপূর্ণ অপারেশন যেটা না করলে আপনি মারা যাবেন।
এসব ক্ষেত্রে যদি আপনার পরিবারের সম্মতিতে আইসিইউ ভেন্টিলেটর থেকে আপনাকে সরিয়ে ফেলা হয় বা ওই গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনটি না করা হয় অথবা চিকিৎসক আপনাকে বাঁচাতে বিশেষ পরিসেবা দেয়া বন্ধ করে দেয়;
যাতে করে আপনি এমনিতেই মারা যান।
এই ব্যাপারগুলোই মূলত পরোক্ষ ইউথেনেশিয়া।
যেটা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও বৈধতা পেয়েছে।

পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত নয়টি দেশে ইউথেনেশিয়াকে পূর্ণাঙ্গ বৈধতা দিয়েছে।
এরা হচ্ছে নেদারল্যান্ডস(সর্বপ্রথম),বেলজিয়াম,কলম্বিয়া,
লুক্সেমবার্গ,সুইজারল্যান্ড,জার্মানি,জাপান,
আলবেনিয়া,আমেরিকা(কিছু প্রদেশ)।
এছাড়া আরও অনেকগুলো দেশে আংশিক বৈধতা রয়েছে।
বর্তমান সময়ে পাশ্চাত্যে ইউথেনেশিয়া বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

বেলজিয়ামে ২০০৭ সালে মোট মৃত্যুর ১.৮ শতাংশ
ছিলো ইউথেনেশিয়ার মধ্যমে।
২০১৩ সালে সেটা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৪.৬ শতাংশ।
নেদারল্যান্ডস এ এই সংখ্যাটা দিন দিন অনেক বাড়ছে।
২০১২ সালে মোট ৪১৮৮টি ইউথেনেশিয়ার মাধ্যমে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে দেশটি;
সে হিসেবে ওখানে মৃত হওয়া প্রতি ৩০ জনে ১ জন করে ইউথেনেশিয়ার মাধ্যমে ইহলোকে ত্যাগ করেছেন।

পৃথিবীর অনেক বড় মাপের ব্যক্তিবর্গরাও ইউথেনেশিয়ার মাধ্যমে মৃত্যু বেছে নিয়েছেন।
যেমন ইতালিয়ান কবি ও পেইন্টার Piergiorgio Welby,অস্ট্রিয়ান অভিনেতা Herbert Fux,নেদারল্যান্ডসের লেখক Annie M.G.Schmidt সহ আরও অনেকেই।

ইংল্যান্ডে ইউথেনেশিয়া অবৈধ স্বত্বেও রাজা পঞ্চম জর্জ ইউথেনেশিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুবরন করেন।
তিনি Cardio-Respiratory Failure
(হৃদযন্ত্র-শ্বসনযন্ত্র অকার্যকর হয়ে পরা)
এ ভুগছিলেন।
তাকে মরফিন এবং কোকেইন দিয়ে মৃত্যু ঘটানো হয়।
ইউথেনেশিয়া নিয়ে সারাবিশ্বে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ টিরও অধিক সিনেমা নির্মাণ করা হয়েছে।
বিখ্যাত রোমান্টিক সিনেমা Me Before You কিংবা হৃত্মিক রোশনের ‘গুজারিশ’ এ দুটো সিনেমাতেও ইউথেনেশিয়া ব্যাপারটিকে দেখানো হয়েছে।

এবার আসি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে,
বাংলাদেশে ইউথেনেশিয়া নিষিদ্ধ।
কারণ ইসলামে এ ব্যাপারটিকে অবৈধ বলা হয়েছে।

একজন ডাক্তার তার পেশাগত হিপোক্রেটিস শপথেই বলে থাকেন “I will give no deadly medicine to any one if asked,Nor suggested any such counsel”
কিন্তু তারপরেও দেশীয় আইনানুযায়ী তারা
ইউথেনেশিয়া এবং গর্ভপাত করাতে পারবেন।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ইউথেনেশিয়া সমর্থন করে বলেছেন,
“I think those who have terminal illnesses and are in great pain should have the right to choose to end their own life.”

Reference:
★The Essentials Of Forensic Medicine And Toxicology [K.S.NARAYAN Reddy]
★ https://www.storypick.com/euthanasia-facts/
★https://www.google.com/amp/s/www.asianage.com/amp/life/health/090318/here-are-10-facts-about-euthanasia-you-probably-did-not-know.html
★https://en.m.wikipedia.org/wiki/Category:Films_about_euthanasia
★https://www.defendnz.co.nz/info/euthanasia-and-assisted-suicide-deaths-increase-every-year
★https://www.nbcnews.com/news/world/painless-death-or-precipitous-cliff-transsexual-chooses-euthanasia-after-failed-flna8C11339134
★https://m.ranker.com/list/famous-people-who-died-of-euthanasia/reference
★https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC4441884/#:~:text=The%20first%20known%20case%20of,take%20his%20life%20(23).

হাসিবুর রহমান ভাসানী- সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও মেডিকেল ছাত্র

আরও পড়ুন