জীবনে আমরাই সমস্যা খুঁজে বের করি !

কামরুন নাহার মিশু

মেয়ের জন্মের ১৪ মাসের পর ছেলের জন্ম হওয়ায়,আমার শরীরের উপর মনের উপর এমন কঠিন প্রভাব পড়েছিল। আমি যেন হাসতে ভুলে গেছি, কাঁদতে ভুলে গেছি, সাজতে ভুলে গেছি।
কতদিন আয়না নিজেকে দেখিনি, চুলে চিরুনি দেইনি, মেয়ের বাবার দিকে কতদিন ফিরেও তাকাইনি।
ঠিক সেই বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে বাবার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলাম।

সারাদিন অকারণে হেসে, খেলে বাড়ি মাতানো মেয়েটা হঠাৎ করে এমন চুপসে যাওয়ায় আমার মা যেন দিশেহারা হয়ে পড়লেন। দু’টো ফুটফুটে মানব ছানা জন্ম দিয়ে, আমি যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেললাম।
আমার আম্মা বুঝতে পারলেন, পুরোটাই আমার মনের ব্যাপার। আমাকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন দিতে হলে বাস্তবতার মুখোমুখি করতে হবে। তিনি আমাকে আমার নানার বাড়ি বেড়াতে নিয়ে গেলেন।
বাচ্চারা কান্নাকাটি করে, পায়খানা, প্রশ্রাব করে, বমি করে সেজন্য আমি কোথাও যেতাম না। তিনি অনেকটা জোর করে, বাচ্চাদের সমস্ত দায়িত্ব নেবেন কথা দিয়ে আমাকে নিয়ে গেলেন।
নানুদের এলাকার এক মামা আছেন, আম্মা জোর করে আমাকে উনাদের ঘরেও নিয়ে গেলেন। অথচ বিয়ের আগেও আমি কখনো ওদের ঘরে যাইনি। সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, সেটা কখনো ভুলার নয়।
মামাতো ভাইয়ের একমাত্র ছেলে, দশ বছর বয়স। সে প্রতিবন্ধি। কথা বলতে পারে না। মুখ দিয়ে লালা ঝরে, হাঁটতে পারে না, খেতে পারে না। চব্বিশ ঘণ্টা কান্না করে, আর কোলে থাকে। মামা প্যারালাইসিস হয়ে হুইল চেয়ারে থাকেন। মামার মা, মানে নানু অসুস্থ। বিছানায় প্রশাব পায়খানা করেন। উনাকেও গোসল থেকে শুরু করে পানি পর্যন্ত মুখে তুলে খাইয়ে দিতে হয়।

মামাতো ভাইয়ের বউ ভোর ৬ টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে দাদী শাশুড়ি, শ্বশুর এবং ছেলের সেবা করেন। একদম চুপচাপ, কোনো শব্দ না করে। সামান্য সাহায্য করার মতো একটা কাজের লোক নেই। শুধু শাশুড়ি আছেন। তিনি অনেক ভালো। বউকে সব কাজে সহযোগিতা করেন। আমরা যাওয়ার পর এত ব্যস্ততার মাঝে আমাদের চা-ও খাইয়েছেন। হাসিমুখে কথাও বলেছেন। সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত যে পরীক্ষার মুখোমুখি এই মহিলা হয়েছেন, সে পরীক্ষার কাছে তো মানুষ্য সৃষ্ট সব কষ্টই তুচ্ছ।

তিনি আবার বিবাহবার্ষিকীতে কেক কেটে সেলিব্রেশন করে ফেসবুকে ছবি দেন। সরিষা ক্ষেতে স্বামী-সন্তানকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলে ফেসবুকে দেন। ছেলের চিকিৎসার জন্য ঢাকা গেলে, ছেলেকে নিয়ে শিশু পার্কেও যান।
মেয়েটার তেল চপচপে চুল, পান খাওয়া লাল ঠোঁট দেখলে মনে হয় জীবন আসলে মন্দ নয়। ভালো থাকার চাবিকাঠি নিজের কাছে। কেবল ভালো থাকতে জানতে হয়।

গতকাল ছোট ননশের বাসায় গিয়েছি। বেড়াতে নয় রোগী দেখতে। আপু অসুস্থ। যেনতেন অসুখ নয়। রীতিমত ক্যান্সার। আপু হুমাইরার আব্বুর বছর দশেকের বড় হবেন। এমন সুন্দরী, রুপবতী, গুণবতী, বুদ্ধিমতি,মানবিক মানুষ সচরাচর চোখে পড়ে না। তিনি নব্বইয়ের দশকে এলএলএম পাশ করেছেন।

বিয়ের প্রথম দশ বছর তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। এখন একটা মেয়ে আছে। এবার নবম শ্রেণিতে পড়ে। গতবছর স্ট্রোক করে ভাইয়ার বাম অংশ প্রায় অচল। থেরাপি দিয়ে এখন মোটামুটি একটু সুস্থ আছেন। নিয়মিত থেরাপি চলে। আপুর জরায়ু ক্যান্সার। অপারেশন করা হয়েছে। ক্যামোথেরাপি শুরু হবে শীঘ্রই। বাঁচামরা আল্লাহর হাতে।

সৃষ্টকর্তা প্রদত্ত কী কঠিন পরীক্ষা! আপুর শাশুড়ি আমার আমার শাশুড়ির দশকাঠি উপর দিয়ে যান। তাদেরও যৌথ পরিবার। তিনি একটা ইজি চেয়ারে বসে নিচতলা, দোতলা, তিনতলা চার ছেলের সংসারে একা রাজত্ব করেন। মেহমানদের কী নাস্তা দেয়া হবে, সে ব্যাপারেও তাঁর পরামর্শ নিতে হয়।
এসব সোনার মানুষগুলোর সৃষ্টিকর্তার প্রদত্ত একটা রহমত। একটা পরিবারের জন্য বিরাট বটবৃক্ষ। এত সুন্দর ওদের পরিবার। এত মানুষ, এত সমস্যা, অথচ কোনো শব্দ নেই। সবাই নিজ নিজ কাজ করছেন।
এদের দেখলে মনে হয়, জীবন আসলে কষ্টের নয়। আমরা সমস্যা খুঁজে বের করি, আমরাই কষ্ট পাই।
আমার আপুর জন্য সবাই দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন উনার মতো ভালো মানুষকে নেক হায়াত দান করেন।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট 

আরও পড়ুন