জ্ঞান অর্জনই হোক মুক্তির উপায়

এম আর রাসেল

“মুসলমানুদের পতনে বিশ্ব কি হারালো” মাওলানা আবুল হাসান নদভী রচিত একটি পাঠকপ্রিয় চিন্তা জাগানিয়া গ্রন্থ। ইতিহাস প্রিয় পাঠকবৃন্দ এখান থেকে প্রয়োজনীয় জারক রস খুব সহজেই সংগ্রহ করতে পারে।

এই গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছিলেন মিসরের খ্যাতিমান সাহিত্যিক সাইয়েদ কুতুব। ভূমিকার প্রারম্ভে তিনি লিখেছেন, “আজ এমন ব্যক্তির ভীষণ প্রয়োজন যিনি মুসলিম উম্মাহকে সাবধান করে বলবেন, স্বীয় দীন সম্পর্কে তোমাদের অজ্ঞতার কথা, হতাশাব্যঞ্জক গাফিলতির কথা। যিনি তাদের চোখে চোখ রেখে পরিষ্কার করে বলবেন- এই দীন কোন উত্তরাধিকার নয়, বরং তা অর্জন করতে হয়, হাসিল করতে হয় শাণিত বিশ্বাস দিয়ে, জাগ্রত চেতনা দিয়ে।” আপ্তবাক্যের প্রতিটি কথার মাঝে যেন আমাদের দেশের মুসলমান সমাজের চিত্র প্রতিভাত হয়ে উঠছে। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শান্তির বিধান আজ যেন খেল-তামাশার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। জ্ঞান অর্জনে অনীহা, আলস্যে সময়যাপন অর্জনের পাল্লাকে করছে শূণ্য। অথচ হাদীসে বলা হয়েছে,”জ্ঞান বিজ্ঞান মুসলমানদের হারানো সম্পদ, যেখানে তা পাও তা কুঁড়িয়ে নাও। ”

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে অনেক কিছুই চোখে পড়ে। শুধুমাত্র সস্তা জনপ্রিয়তা ও নিজের আমিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে কিছু ব্যক্তি ইসলামের অপব্যাখামূলক বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করছেন। এমতাবস্থায় ,আমরা যারা শিক্ষার আলোয় অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে সক্ষম হয়েছি, তাদের কিছুটা দায়িত্ব রয়েই যায়। অশিক্ষা ও ধর্মীয় গোড়ামিতে আচ্ছন্ন আমাদের সমাজ ব্যবস্থার সংস্কার সাধন প্রায় দুঃসাধ্য একটি কর্ম। এখানে ইসমামের প্রচার ও প্রসার এর ইতিহাস পৃথিবীর কাছেই একটা বিরাট ধাঁধাঁ।

বাংলাদেশে বসবাসকারী মুসলমানদের জানতে হলে এর শিকড়ে দৃষ্টিপাত করতে হবে। এই শিকড়ের চিত্র খোঁজার কিছুটা সূত্রের দেখা মেলে আহমদ ছফা রচিত “বাঙালি মুসলমানের মন” প্রবন্ধটিতে। বাঙালি মুসলমান সমাজের আসল রূপ ও তাদের মনন প্রবৃত্তি অত্যন্ত যুক্তিগ্রাহ্য ভাষায় তিনি তুলে ধরেছেন। লেখকের ভাষ্যমতে “ইসলাম সমন্ধে তৎকালীন মুসলমানদের জ্ঞান কিছু লোকশ্রুতি, জনশ্রুতি, আউলিয়া দরবেশের অলৌকিক ক্রিয়াকান্ড ইত্যাদির মাঝেই সীমিত ছিল”।

বর্তমান সময়েও এসবের প্রভাব দীপ্তিময় আভা ছড়িয়ে রেখেছে। আহমদ ছফা আরও বলেছেন-” ইসলামও যে একটা উন্নত দীপ্তধারার সভ্যতা এবং মহীয়ান সংস্কৃতির বাহন হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে একটা সামাজিক বিপ্লব সংসাধন করেছিল, বাঙালি মুসলমানের মনে তার কোন গভীরাশ্রয়ী প্রভাব পড়েনি বললেই চলে।”

বাস্তবিকই ইসলামের যুক্তিবাদী জ্ঞানের প্রসার ও প্রতিষ্ঠা এখনও এই ভূ-খণ্ডে অধরাই রয়ে গেছে।”বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে সাফল্যঃ একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ” গ্রন্থে আকবর আলী খান কিছু তথ্য তুলে ধরেছেন। ১৯০০ সালের ভারতে মুসলমান জনসংখ্যা ছিল ৬ কোটি ২১ লাখ। আর শুধু বাংলায় মুসলমান ছিল ২ কোটি ১৫ লাখ। এর বিপরীতে সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মুসলমান ছিল অটোমান সাম্রাজ্যে মাত্র ১ কোটি ৫৫ লাখ। সংখ্যাতাত্ত্বিক দিক থেকে মুসলমানের সংখ্যা বেশি থাকলেও বর্তমান সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের দুর্দশার মূল কারণ সহজেই অনুমেয়।

ব্রিটিশ শাসনকালীন সময়ে শিক্ষার দিক থেকে মুসলমানদের পিছিয়ে থাকার কিছু যৌক্তিক কারণ ছিল বটে। কিন্তু বর্তমান সময়েও মুসলমানদের পিছিয়ে থাকার কারণটাও দিবালোকের মত স্পষ্ট। তা হল জ্ঞানের রাজ্যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে না পারা ।

ইউরোপীয় রেনেসাঁস পাশ্চাত্যকে আলোকিত করলেও এর পিছনে যে ইসলামের ভূমিকা ছিল মূখ্য তা অনেক পণ্ডিতই শিকার করে থাকেন। “বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান” বইয়ে লেখক মরিস বুকাইলি বলেছেন, “আমরা ইসলামের সংস্কৃতির কাছে বহুলভাবে ঋণী”। এসব ইতিহাস আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত আমরা অনেকেই জানার ইচ্ছাও প্রকাশ করি না।

এজন্যই হয়ত সৈয়দ আশরাফ আলী ” Muslim Contribution to Science and Technology” বইয়ের ভূমিকায় যথার্থই লিখেছেন, ” Most of the Muslims, indeed do not know about the historic and stupendous contributions that the Muslims have made to science and technology. ”

অতীত ইতিহাসের গৌরবের বাণী কথার ফুলঝুরিতে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি আমরা হৃদয়ে ধারণ করি, জ্ঞান সাধনায় লিপ্ত থাকি তবেই একদিন সুহাসিনী ভোরের দেখা মিলবে। মানবিক পৃথিবী নাই বা গড়তে পারলাম, অন্তত শুদ্ধতার বাণীতে হৃদয় আলোকিত করতে পারব।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, গবেষক ও কলাম লেখক 

আরও পড়ুন