ফিলিসাইডঃ মা-বাবাকে হন্তারক বানায় যে রোগ

এইচ বি রিতা

‘জি, আমিই খুন করেছি তাদের। রাত তখন প্রায় তিনটা। প্রথমে ওদের শ্বাসরোধ করি বালিশ চাপা দিয়ে। দেখলাম, ছোট ছোট চোখগুলো কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে। আমি আরও শক্তি দিয়ে হাঁটু ভেঙে তাদের বুকের ওপর চেপে বসি। ধীরে ধীরে তাদের চোখ একেবারে শান্ত হয়ে যায়। শরীর নিস্তেজ হয়ে এলে বটি দিয়ে তাদের গলা কেটে দিই। এক এক করে কাজটা সারি। খুব কঠিন ছিল না। ওরা ছোট, বাঁচার জন্য খুব বেশি হাত-পা ছুড়তে পারেনি। চোখগুলো মরার পরও খোলা ছিল। খোলা চোখগুলো হাত দিয়ে বুজে দিই। তারপর উঠে গিয়ে নিজ হাতে চা করি। চা নিয়ে খাটে ওদের পাশে এসে যখন বসি, দেখি ওরা তখন রক্তে ডুবুডুবু। আমার অস্বস্তি শুরু হলো। চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে বমি ভাব হলো। তারপর কি হলো মনে নেই।’

এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে দম ছাড়লেন মুক্তা বেগম। পাশে দাঁড়ানো পুলিশ অফিসার মঞ্জুরুল আলম জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি পানি নেবেন?’ মুক্তা বেগম কোন জবাব দিলেন না। তিনি নির্বিকার চেয়ে আছেন ঘরের সিলিং ফ্যানটির দিকে। চারপাশে কী হচ্ছে, তাতে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই তাঁর।

মুক্তা বেগম, বয়স ১৯। সাত বছর আগে পালিয়ে বিয়ে করেন কাওসারকে। কাওসার পেশায় একজন গার্মেন্টস কর্মী। বিয়ের পরই জানতে পারেন, তাঁর স্বামীর আরও একটি স্ত্রী রয়েছে। প্রথম স্ত্রীর কাছেই তিনি থাকতেন; মাঝে মাঝে মুক্তা বেগমের কাছে রাত কাটাতে আসতেন। পিতার আর্থিক দুরবস্থা ও লোকলজ্জার ভয়ে বাবার বাড়ি আর ফিরে যাওয়া হয়নি মুক্তার। অভাবের টানাপোড়েন সংসারে আজ ভাত-কাপড়-দুধের কষ্ট, তো কাল স্বামীর প্রতারণার কষ্টে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই থাকত। এরই মাঝে এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম। সেই পাঁচ বছরের শামিমা ও তিন বছরের আবদুল্লাহকে নিজ হাতে গলা কেটে, পৃথিবী থেকে বিদায় দিয়েছেন মুক্তা বেগম। তারপর নিজেও ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে পড়ার চেষ্টা করেন।

খুন-খারাপি বাংলাদেশে বর্তমানে একটি সাধারণ বিষয়। কিন্তু কোনো মা যখন নিজ হাতে সন্তানদের জবাই করেন, তখন তা শুধু নিষ্ঠুর নয়, বিস্ময়করও বটে। এমন ঘটনা পৃথিবীকে নির্বাক করে দেয়। এমন সব ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা জানাই। নিন্দা জানিয়েই ক্ষান্ত হই না, আমরা নারীর নারীত্ব ও মমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করি। আক্ষরিক অর্থে এটাই স্বাভাবিক। একজন মমতাময়ী মা দ্বারা এমন গর্হিত কাজ করার পেছনে যে কারণটিকে আমরা সাধারণত দায়ী করি, তা হলো পরকীয়া সম্পর্ক। আমরা একচেটিয়া সিদ্ধান্তে উপনীত হই। আমরা ভেবে দেখি না, এর বাইরে আরও কোনো কারণ আছে কিনা। যাকে ৯ মাস ১০ দিন পেটে ধরেছেন মা, যাকে অসহনীয় তীব্র ব্যথার পর পৃথিবীর মুখ দেখিয়েছেন মা, যাকে রাতের পর রাত জেগে বুকের দুধ পান করিয়ে তিল তিল করে শরীর গড়েছেন, তাকে নিজ হাতে হত্যা করা যায় কী করে? এক মুহূর্তেই নাড়ির এই বাঁধন ছিন্ন করে দেওয়া কি এত সহজ? হ্যাঁ সহজ তো বটেই। বর্তমানে আমাদের মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের এমন বিপর্যয় ঘটেছে যে, নিজ সন্তানকে হত্যা করাও এখন পেঁয়াজ কাটার মতো স্বাভাবিক।

বাবা-মায়ের হাতে সন্তান হত্যার এ ঘটনাকে ইংরেজিতে বলা হয়ে থাকে ‘ফিলিসাইড’। ওহাইওর ক্লিভল্যান্ড মেডিকেল সেন্টারের পরিচালক ফরেনসিক সাইকিয়াট্রিস্ট বিভাগের অধ্যাপক ফিলিপ রেসনিক ১৯৭০ সালে তাঁর এক গবেষণায় জানান, ফিলিসাইড মূলত পাঁচ ধরনের হয়ে থাকে। অলট্রায়িস্টিক ফিলিসাইড, একিউটলি সাইকোটিক ফিলিসাইড, ফ্যাটাল ম্যালট্রিটমেন্ট ফিলিসাইড, আনওয়ান্টেড চাইল্ড ফিলিসাইড ও স্পাউসাল রিভেঞ্জ ফিলিসাইড। মুক্তা বেগমের ঘটনাটিকে অলট্রায়িস্টিক ফিলিসাইড বলা যায়। অলট্রায়িস্টিক ফিলিসাইডে একজন পিতা বা মাতা ধরে নেন যে, এই পৃথিবী তাঁর সন্তানের জন্য বসবাসের অযোগ্য। তিনি ধরে নেন যে, তাঁর সন্তান কষ্ট পাচ্ছে এবং তাকে মুক্তি দেওয়া দরকার। হতে পারে সত্যিই তাঁর সন্তান কষ্ট পাচ্ছে। কিংবা হতে পারে এটা কেবল তাঁর অসুস্থ মস্তিষ্কের ভাবনা। কল্পনা হোক আর বাস্তব, হত্যার মাধ্যমে সন্তানকে মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবা, মানসিক বিকারগ্রস্ততারই প্রমাণ। অলট্রায়িস্টিক ফিলিসাইডের ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় যে, সন্তান হত্যার পর আসামি নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে আসামি নিজেও একজন ভিকটিম।

পশ্চিমা বিশ্বে ফিলিসাইড একটি বহু পুরোনো সমস্যা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে এর ব্যাপক বিস্তার শুরু হয়েছে। ফিলিসাইডের বহু কারণের মধ্যে রয়েছে পারিবারিক কলহ, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে দ্বন্দ্ব, সমাজ ও পাঠ্যবইয়ে ধর্মভিত্তিক নৈতিক শিক্ষা বর্জন, মিডিয়ার কুপ্রভাবের মাধ্যমে বাইরের সংস্কৃতি বাহিত অশিক্ষা, সমঝোতা ও সহিষ্ণুতার অভাব এবং পরকীয়া সম্পর্ক। তবে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে যতগুলো ফিলিসাইডল ঘটনা ঘটেছে, তার বেশির ভাগই ছিল মানসিক বিকারগ্রস্ততা থেকে জন্ম নেওয়া-মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা এমনটিই মনে করেন।

এমন একটি ঘটনার কথা সবার মনে থাকার কথা। ২০১৬ সালের মার্চে প্রথম আলোসহ কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নের প্যারাভাঙ্গা এলাকায় মাহাথির নামের দেড় বছরের এক শিশুকে গলা কেটে হত্যা করেছেন তার মা সালমা বেগম। হত্যার পর তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, ‘দেখে যাও, আমি আমার সন্তানকে হত্যা করেছি।’ সালমার স্বামীর ভাষ্যমতে, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন। এর আগেও তিনি বেশ কয়েকবার সন্তানকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যার চেষ্টা করেন। যে নারী মানসিকভাবে অসুস্থ, যে নারীর অসুস্থতার কথা পরিবারের সবাই জানেন এবং অতীতেও তিনি নিজ সন্তানকে আক্রমণ করেছেন বেশ কয়েকবার, সে নারীর কাছে তাঁর সন্তান কতটুকু নিরাপদ? সেই নারী কি অনুভব করার ক্ষমতা রাখেন যে, সন্তানের গলা কেটে দেওয়া কতটা নির্মম? পরিবার থেকে তাঁর যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা কি নেওয়া হয়েছিল? পরিবারে পর্যাপ্ত যত্ন ও গুরুত্ব না পেয়ে তিনি কি অবহেলিত ছিলেন না?

সালমা বেগমের কী শাস্তি হয়েছিল জানা নেই। তবে ফিলিসাইডল ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে যে শাস্তির আগে আমাদের আইন ও আদালত মেন্টাল ইভালুয়েশনের মাধ্যমে আসামির মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করেন না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, ফিলিসাইডের পেছনে পারিবারিক সমস্যা বা স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে দাম্পত্য সমস্যাগুলোই প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ বেশির ভাগ ফিলিসাইডল অপরাধগুলো ঘটে অসুস্থ মানসিক অবস্থার কারণে। তাই, মানসিক চিকিৎসা ও পারিবারিকভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে ফিলিসাইডের মতো অপরাধগুলো অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই কম। বাংলাদেশে সরকারি হিসেবে মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভোগেন। কিন্তু এত বড়সংখ্যক রোগীদের জন্য দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মোট আড়াই শ; আর বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে মাত্র দুটি। দেশে জেলা পর্যায়ে মানসিক চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই বিশাল সংকটের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা জরুরি নয় কি?

একজন সাধারণ খুনির বেলায় যত সহজে সিদ্ধান্তে আসা যায়, ফিলিসাইডের ক্ষেত্রে তত সহজে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তে পোঁছানোর আগে মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু শাস্তি নিশ্চিত করলেই আমাদের পরিবার ও সমাজ থেকে ফিলিসাইডের মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো বন্ধ হবে না। শিশুর জীবন সুরক্ষায় আসামির শাস্তি নিশ্চিত করার আগে, সরকারি-বেসরকারিভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ফিলিসাইডের যথাযথ কারণ নির্ণয় করে, তার প্রতিকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অভিভাবক ও সন্তানদের কাউন্সেলিংয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, পর্যাপ্ত শিক্ষা ও জ্ঞানের অভাবে অনেকে বুঝতেই পারেন না আসলে সমস্যাটা কোথায় বা কতটা ভয়াবহ। আবার বুঝলেও দেখা যায় আর্থিক সংকটের কারণে কিংবা লোকলজ্জার ভয়ে মানসিক হতাশাগ্রস্ত অনেক মানুষই বিষয়টিকে এড়িয়ে যান। পরিবার, সমাজ ও সরকারকে এসব সূক্ষ্ম বিষয়ের ওপর নজর দিতে হবে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রতিটি অসামাজিক ও অনৈতিক সম্পর্ক নির্মূল করে সামাজিক সুস্থতা রক্ষার চেষ্টা করতে হবে। তবেই ফিলিসাইডের মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা রোধ করা সম্ভব।

লেখকঃ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাহিত্যিক, কলামিস্ট, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী

আরও পড়ুন