বই পড়ব কেন?

সুইটি শিলা

“ভালোবাসি” শব্দটিতে একটা অবিস্তৃত মায়া আছে, যে মায়া সহজে ধরা পড়ে না। তাকে খুব সন্তর্পণে, গভীর আবেগে অনুভব করতে হয়। ‘ভালোবাসা’ শব্দটি আমার কাছে যথেষ্ঠ গুরুত্ববহ, গভীর এবং ওজনদার একটি শব্দ। তেমনি ‘বই’ শব্দটিও আমার কাছে ভীষণই পরিচ্ছন্নতার, সুপ্ত ভালোবাসার। ” আমি বই পড়তে ভালবাসি” বাক্যটিতে বই এবং ভালবাসা দুটোই আছে। আমি মনে করি, বই এবং ভালবাসা দুটোই একে অপরের পরিপূরক। তাই এ বাক্যটিকে আমি একটি ওজনদার বাক্য হিসেবেই মনে করি। বইকে ভালবাসি বলেই তো বই পড়ি, বই নিয়ে ভাবি, বই নিয়ে স্বপ্ন দেখি।

কবির ভাষায় বলি,

“রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে
প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হবে।
কিন্তু বই খানা
অনন্ত যৌবনা হয়ে চিরদিন পাশে থাকবে।”
—————-(ওমর খৈয়াম)

এত কাব্যিক ভণিতা না করে বরং আসল কথাতেই আসা যাক। আমি কেন বই পড়ি? আমরা কেন বই পড়ব? এত বই পড়ে হবে কি? এমন সব প্রশ্নের মুখোমুখি যে কখনো হইনি, তা নয়। সেসব প্রশ্নের উত্তরই খোঁজার চেষ্টা করেছি আনমনে, আমি বই পড়তে ভালোবাসি এই একবাক্যে সেসব প্রশ্নের উত্তর দিলে সবার তা বোধগম্য নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিশদ বলাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।

শুরুতেই বলে রাখা ভালো, আমি যে বই পড়ার কথা বলছি তা কোন ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ কিংবা চাকুরি প্রস্তুতির বই নয়। আমি যে বইয়ের কথা বলছি তা আমাদের সমাজের কতিপয় মানুষের বিশেষ করে অভিভাবকদের মতে, ” আউটবই” (যদিও বই কিভাবে আউট হয়, তা আমার ঠিক বোধগম্য নয়) আমি এই আউটবইয়ের কথাই বলছি। তবে সেক্ষেত্রে আমি তাদের সুরে বেসুর মিলিয়ে সে বইগুলোকে ‘ইনার বই’ বলছি। কেননা, যে বইগুলি আমার হৃদয়চক্ষুকে প্রসারিত করেছে, দৃষ্টিকে স্বচ্ছ করেছে, আমার মাথার ভিতরে জটপাকিয়ে থাকা অতি সরু কোষগুলোকে মুক্তি দিয়েছে, যে বইগুলি আমার ঘুমন্ত অবয়বকে সদা জাগ্রত করেছে, যে বইগুলি আমাকে ভাবনার নতুন দ্বার উপহার দিয়েছে, সে তারা যাই বলুক না কেন আমি তাদের আউটবই বলতে পারিনা, আশা করছি পাঠকও আমার সাথে একমত হবেন।

প্রায়ই অনেককে বলতে শুনেছি, এতএত বই পড়ে করবিটা কি? বিদ্যাসাগর হবি না কি? আহা! তারা কি বোঝেনা যে বিদ্যাসাগর হওয়া অত সহজ কাজ নয়? যাক সেসব কথা। ‘আমি কেন বই পড়ি’–এখন বরং সে প্রসঙ্গেই আসি।

অনেকেই বিভিন্ন কারনে বই পড়ে। তবে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেককেই দেখেছি তাদের অন্যতম শখ হলো বই পড়া। আমি অবশ্য এই বিষয়ে কখনোই একমত হতে পারি নি যে বইপড়া একটা নিছকই শখ মাত্র। একটা বই আমাকে ভাবনার নব দুয়ারে এনে দাঁড় করিয়ে দিল, একটা বই আমাকে জ্ঞানোর আলোর মশাল জ্বালাতে সাহায্য করলো, সে বই পড়া আমার কাছে শখ কিভাবে হয়? বইপড়াকে আমি অপরিহার্য মনে করি, শখ আর অপরিহার্যতার মাঝে তো আকাশপাতাল তফাৎ, নয় কি? শখের বসে আর কেউ বই পড়ে থাকলেও, আমি কিন্তু তাদের দলে নই। কিছুদিন আগে আমার খুব কাছের ছোটভাই ও প্রিয় মানুষ ‘মোস্তফা মুরাদ’ একটি রচনা লিখেছিল, যার শিরোনাম ছিল “বই পড়ার শখ বাতিল করুন”। শিরোনাম দেখেই হয়তো অনেকেই চমকে গিয়েছিলেন, তবে বই পড়ার শখ কেন বাতিল করা উচিত তা তার লেখায় বেশ স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠেছিল।

‘আমি কেন বই পড়ি ‘ এ প্রশ্নের উত্তর বিখ্যাত ইংরেজি সাহিত্যিক ‘ফ্রান্সিস বেকন’ এর একটি উদ্ধৃতি দিয়েই দিতে চাই,

” Reading maketh a full man, conference a ready man and writing an exact man”

যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়,

“পড়াশুনা একজন পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি তৈরি করে, আলোচনা তাকে প্রস্তুত করে এবং লেখা তাকে গঠিত করে “।

অর্থাৎ বেকন বলতে চেয়েছেন, পড়াশুনা একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করে। এখন প্রশ্ন হলো এই পূর্ণাঙ্গ মানুষ বলতে আমরা কি বুঝি? পূর্ণ অঙ্গ, তাই তো?

” ক্রিয়াবাদী” সমাজবিজ্ঞানীরা ‘সমাজ’ কে গাড়ির ইঞ্জিন, ‘মানবদেহ’ এর সাথে তুলনা করেছেন। অর্থাৎ মানুষের দেহের প্রতিটি অঙ্গই সমান গুরুত্বপূর্ণ, প্রতিটি অঙ্গই, মানবদেহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই আলাদা আলাদা অংশ গুলোর যে কোন একটি যদি নষ্ট হয়ে যায় কিংবা বিশৃঙ্খলভাবে কাজ করতে শুরু করে তাহলো পুরো দেহই বিশৃঙ্খল হতে শুরু করবে। সেরকম গাড়ির ইঞ্জিন এর ক্ষেত্রেও।

তাই একজন মানুষ তখনই পূর্ণাঙ্গ যখন তার প্রতিটি অঙ্গ সমভাবে কাজ করছে। বেকন বলছেন, পড়াশুনা সেই পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি করে। কারন আপনি যখন নতুন একটা বই পড়বেন, সেটা হতে পারে ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি বা যেকোন বিষয়ক, সেই বইটি আপনার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাকে গতিশীল করবে, আপনার চিন্তার জগৎ উন্মুক্ত এবং প্রসারিত হবে।

বই আপনাকে এভাবেই পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করবে। জন্মসূত্রে আমরা মানুষ ঠিকই, তবুও গুরুজনরা যখন মাথায় হাত বুলিয়ে দু’আ করে তখন তারা বলে, “মানুষ হও “। আর এই মানুষ হতে অন্যতম পথনির্দেশক, সারথি হলো বই। এই মানুষ হওয়া বলতে আমি বুঝি, ‘মননে মানুষ হওয়া’। মনকে পরিশীলিত করা, নিজেকে শাণিত করা, এবং একই সাথে নিজেকে বিকশিত করা। আর এই পরিশীলিত হওয়া, বিকশিত হওয়ায় মূখ্য ভূমিকা পালন করে বই।

আবারো ফিরে আসি ফ্রান্সিস বেকন এর সেই উদ্ধৃতিতে, তিনি বলেছেন আলোচনা মানুষকে প্রস্তুত করে। আমি মনে করি একজন মানুষ একটি যথাযোগ্য এবং শক্তিশালী আলোচনা করতে পারে তখনি যখন সে বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে তার চিন্তার জগৎকে সমৃদ্ধ করে। একজন ব্যক্তি যত বেশি বই পড়বে তার আলোচনাও তত বেশি পোক্ত হবে।

তৃতীয় পয়েন্টে বেকন বলেছেন, লেখা একজন মানুষকে গঠিত করে। এই লেখালেখি করারও পূর্বশর্ত কিন্তু বই পড়া। আপনি চাইলেই হয়তো লিখতে পারবেন কিন্তু আপনার সেই লেখা কতটা শক্তিশালী হবে তা নির্ভর করে আপনি কি কি বই পড়েছেন, কিভাবে পড়েছেন তার উপর।

আহমদ ছফার বই ” যদ্যপি আমার গুরু” তে, জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যারের কথা উঠে এসেছে। স্যার বলেছেন,”পড়ার কাজটি অইল অন্যরকম। আপনে যখন মনে করলেন, কোনো বই পইড়্যা ফেলাইলেন, নিজেরে জিগাইবেন যে বইটা পড়ছেন, নিজের ভাষায় বইটা আবার লিখতে পারবেন কিনা। আপনার ভাষার জোর লেখকের মত শক্তিশালী না অইতে পারে, আপনের শব্দভান্ডার সামান্য অইতে পারে, তথাপি যদি মনে মনে আসল জিনিসটা রিপ্রোডিউস না করবার পারেন, ধইরা নিবেন, আপনের পড়া অয় নাই।”

তাই বই পড়া কেবল পড়াই নয়। বই পড়া আপনাকে যৌক্তিক চিন্তা করতে শেখাবে, আপনার জ্ঞানকে পরিশীলিত করবে এবং আপনার লেখক সত্তাকে জাগিয়ে তুলবে।

বই পড়লে আপনার আত্নিক পরিশুদ্ধি হবে। এছাড়াও —

বই মানুষের জ্ঞানকে বৃদ্ধি ও সমৃদ্ধ করে।
মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি করে।
যৌক্তিক চিন্তার দুয়ার খোলে।
শব্দভান্ডার বৃদ্ধি করে।

তাই আমি কেন বই পড়ব? বা আমরা কেন বই পড়ব এই চিন্তা না করে বরং বই পড়তে শুরু করেন, বই পড়ে কি হবে তা আপনি নিজেই বুঝবেন এবং অনুভব করবেন। তবে বই পড়ার ক্ষেত্রেও অনেক বিষয়ই খেয়াল রাখতে হবে।

ফ্রান্সিস বেকন তাঁর “Of Studies” নামক প্রবন্ধে বলেছেন,

“Some books are to be tasted, others to be swallowed, and some few to be chewed and digested”

অর্থাৎ কিছু বই শুধুমাত্র আংশিকভাবে পড়তে হবে, কিছু বই ভাসাভাসাভাবে পড়তে হবে, অল্প কিছু বই অধ্যাবসায় ও মনোযোগের সাথে পুরোপুরি পড়তে হবে।

তাই বই পড়ার ধরন এবং গুরুত্ব আপনাকে নিজেকেই বুঝতে হবে। বই মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। পার্থিব সমস্ত সম্পদ একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু বই হলো আপনার সেই সম্পদ যা কখনোই শেষ হবে না। শেষ করছি Warren Buffett এর উদ্ধৃতি দিয়ে।

Warren Buffett তাঁর পেশা জীবনের শুরুতেই প্রতিদিন ৬০০-১০০০ পৃষ্ঠা নিয়মিত পড়তেন । তিনি বলেন –

” Read 500 pages like this everyday . That’s how knowledge works . It builds up , like compound interest. All of you can do it , but I guarantee not many of you will.”

বই পড়ুন, নিজেকে ঋদ্ধ করুন, আনন্দে বাচুন। বই চির সঙ্গী হোক সবার। বইময় হোক সবার জীবন।

২৬ ডিসেম্বর, ২০২০

লেখকঃ কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন