বেঁচে ফেরার সত্যি গল্প (শেষ পর্ব)

শামীমা রহমান শান্তা

বাচ্চারা তারস্বরে কেঁদেই যাচ্ছিল।
‘আব্বু ওঠো! কি হয়েছে বল! আব্বু তোমার কি কিছু হয়েছে?
আমি ওদেরকে জড়িয়ে ধরে বললাম, আল্লাহর কাছে দোয়া করো। নিশ্চয়ই উনি ভালো হয়ে যাবেন।
তারপর আকাশের দিকে চেয়ে বললাম,
” আল্লাহ রাব্বুল আলামীন! এত বড় বিপদ থেকে আপনি রক্ষা করেছেন! এই বাচ্চাদের দিকে চেয়ে আমাদের উপর রহম করুন! এমন কোন বিপদ দিয়েন না আল্লাহ! তার ভার আমরা বয়তে পারব না!
আশেপাশের গ্রামের লোকজন আমাদেরকে গোল করে ঘিরে ধরে রাখল।রাস্তার দিয়ে তখনও বড় বড় যানবাহন চলাচল করছিল। আমি কিছু সাহায্যকারী লোকদেরকে বললাম।
ভাই রাস্তার ওপাশে যে মেঠো পথ, ওইখানে আমাদেরকে একটু নিয়ে চলেন। উনাকে আগে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে হবে। তারপর অ্যাম্বুলেন্স করে হসপিটালে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
আশেপাশে কোনো এম্বুলেন্স ছিল না। যতদূর শুনেছি প্রচুর লোকজনকে এম্বুলেন্স করে যশোর সদরে নেয়া হয়েছে।
ওনাকে কিছু লোকজন ধরাধরি করে উঠিয়ে বসিয়ে, তারপর আস্তে আস্তে যখন দাঁড় করাতে পারল এবং রাস্তা পার করে ওপরে নিয়ে গেল তখন আলহামদুলিল্লাহ, বলে ভাবলাম , নিশ্চয়ই বড় কোন ইনজুরি হয় নাই। তাহলে উনি দাঁড়াতে পারতেন না। অন্তরে তখন জিকির করতে লাগলাম, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ!
কিন্তু রাস্তা পার হওয়ার পরে আবার উনি মেঠোপথে শুয়ে পড়লেন এবং এবার কোনরকম নড়াচড়া করতে পারছিলেন না। খুব ভয় হচ্ছিল। তখনো আমার হাত থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে। বাচ্চারা ব্যথা ব্যথা করে কেঁদে উঠলো। ছোট মেয়েটা বলল, ‘মা আমার মাথায় চাপ লেগেছে! বড় মেয়েটা বলল, আমার হাতে পায়ে খুব ব্যথা আম্মু!
আমি তাড়াতাড়ি একজনকে বললাম,
একটু পানির ব্যবস্থা করেন, বাচ্চাদের মাথায় পানি ঢালা হল।
বড় মেয়েটার ব্যথা জায়গাগুলো চেক করলাম। বড় ধরনের কোনো সমস্যা পেলাম না।
ছেলে বলল, ‘
তুমি চিন্তা করোনা, আমার কিছুই হয়নি, আম্মু আব্বু কি ভাল হয়ে যাবে?
আমি বললাম, ইনশাআল্লাহ, আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুস্থ রাখবেন। তোমরা এখানে বস। আমি অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করি।
আমি আবারো উনার মাথায় হাত রেখে বললাম,
দোয়া কালাম পড়ো! আল্লাহর উপর ভরসা রাখো! আমি খুব দ্রুত তোমাকে হসপিটালে নিব ইনশাআল্লাহ!
আমার আর এক কাঁধে তখনও ব্যাগ ঝুলছিল। সেখান থেকে মোবাইলটা বের করলাম। দেখলাম অক্ষত আছে। তাড়াতাড়ি আমার ছোট ভাইকে ফোন করলাম। ও ঢাকাতেই আছে। ফোন করে বললাম ‘ছোটখাটো একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে, আমরা ঠিক আছি, কিন্তু সামান্য চোট লেগেছে! হসপিটালে যেতে হবে ! তুই শিগগিরই চায়না আপাকে খবর দে। আম্বুলান্স পাঠাতে বল। যাকে যাকে খবর দেয়া দরকার, খবর দিয়ে জরুরি বিভাগে আসতে বল। আমি এখানে সবকিছু ম্যানেজ করছি। সবাই ভালো আছি।
চায়না আপা আমাদের বড় বোন। যশোর নার্সিং ইনস্টিটিউটে নার্সিং কলেজের ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত আছেন। উনি খুব দ্রুত ব্যাপারটা ম্যানেজ করতে পারবেন। এতক্ষনে আমার মনে হল আমাদের ব্যাগগুলোর কথা। গুলো তো বাসের লাগেজ বক্সে ছিল।সব থেকে বড় কথা একটি ব্যাগে আমার স্কুলের খাতা পত্র আর রেজাল্ট তৈরির টেবুলেশন শীট ও কাগজপত্র ছিল। যেগুলো আমার কাছে আমানত।
আমি উদ্ধারকারী দুটো ছেলেকে বললাম। ভাই আমার ব্যাগ গুলো উদ্ধার করা জরুরি। আমাকে সাথে নিয়ে চলেন। ওগুলোর মধ্যে আমার স্কুলের কাগজপত্র আছে। একজন বলে উঠল,
“আপা জান বাঁচান আগে। পরে স্কুলের জিনিসপত্র খুঁজবেন।
আমি বললাম, বেঁচে যখন ফিরেছি! আমানত রক্ষা করতে হবে! চলুন খুঁজে নিয়ে আসি ব্যাগগুলো। ততক্ষণে অ্যাম্বুলেন্স এসে যাবে ইনশাআল্লাহ।”
পরিবারের অন্যদেরকে গ্রামবাসীর কাছে রেখে আবার বাসের কাছে গেলাম। যখন রাস্তা থেকে নিচে নামছিলাম মনে হল কমপক্ষে ৬/৭ ফিট নিচে নেমে গিয়েছি! বাস তখনও উল্টে আছে। চারিপাশে রক্তের ছাপ। মানুষজনের ব্যবহৃত জিনিস এ দিকে ওদিকে ছড়িয়ে আছে। কয়েকটা ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। তার মধ্যে আমার গুলো অক্ষত অবস্থায় আছে। আবারো জোরে বলে উঠলাম, আলহামদুলিল্লাহ।ততক্ষণে বাড়ির অন্যান্য সদস্যরা ফোন দিতে শুরু করেছে। সবাইকে আশ্বস্ত করে এম্বুলেন্স এর দিকে চললাম।
আমি বাম হাত দিয়ে ডান হাতটা উঁচু করে চেপে আছি। ছেলেদের কে বললাম ভাই আমার ব্যাগ গুলো একটু ওপারে নিয়ে চলো। অ্যাম্বুলেন্সে উঠাতে হবে। ততক্ষণে অ্যাম্বুলেন্স এসেছে। অ্যাম্বুলেন্সে দুটো বেড। একটাতে আর একটি রক্তাক্ত মানুষকে ওঠানো হয়েছিল। অন্যপাশে আমার উনাকে শোয়ানো হলো। মাঝখান দিয়ে আমার তিন বাচ্চা ও আমি উঠলাম। ব্যাগগুলো সিটের নিচে ঢুকিয়ে দেয়া হলো। আমাদের সঙ্গী হিসেবে একটা কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে পেলাম।
আমি তাকে বললাম, “আপনার কি হন উনি?
সে বলল, “আমার কেউ নয়। আমি স্বেচ্ছাসেবী। আমি আপনাদেরকে নিয়ে যেতে এসেছি। মোটামুটি সবাইকে নেয়া হয়েছে আপনারাই বাকি আছেন।”
মেয়েটির কথা শেষ করার পর ওই রক্তাক্ত লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল,
ভাই, আপনার কিছু হয়নি। আপনার নামটা বলুন। বলুন আপনার কি কষ্ট হচ্ছে!
আমি নিজেদের দুঃখের কথা ভুলে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। আমিও জিজ্ঞাসা করতে থাকলাম। ভাই বলুন! আপনার নাম বলুন! সে অস্পষ্ট স্বরে বলল, মনিরুল অথবা মমিন!
তারপর বলল, ‘আমার বাচ্চা! আমার ছেলে! আমার বাচ্চা!
মেয়েটা আবার তার মাথায় হাত রেখে বললো, “আপনার বাচ্চা ভালো আছে! আমি তাকে আপনার কাছে পৌঁছে দিব!
আপনি টেনশন করবেন না। আমরা হসপিটালে যাচ্ছি। আপনি সুস্থ হয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ।
ততক্ষণে আবার উনি আবার গোঙ্গাতে শুরু করেছেন। আমি ভয় পেয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম। খুব কষ্ট হচ্ছে! আমারা এখনই চলে যাব। ধৈর্য ধর! আল্লাহ ভরসা!
আমার পাশে বসা মেয়েটির নাম শাকিলা। ও দুজন রোগীকে সমান তালে সমবেদনা ও সাহস দিয়ে যাচ্ছিল। আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালাম।
একটু পরে আমার হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপু, আপনার হাত তো মনে হয় ভেঙে গিয়েছে! আপনার খুব ব্যথা হচ্ছে না! একটু ধৈর্য ধরেন ইনশাআল্লাহ ভালো হয়ে যাবেন!
আমি হেসে বললাম,
” না আমার ব্যাথা লাগছে না! আলহামদুলিল্লাহ! সবার কষ্টের থেকে আমার এ কষ্ট অনেক কম!
পুলিশ কেস। অ্যাম্বুলেন্সে আমাদের নাম-ঠিকানা নেয়া হলো। ততক্ষণে যশোর সদর হসপিটালের জরুরি বিভাগে চলে এসেছি। চারিদিকে লোকজন আমাদেরকে ঘিরে রেখেছে। অনেক মানুষ দেখলাম।
সাবধানে উনাদেরকে নামিয়ে জরুরি বিভাগে নেয়া হলো। আমাদের তিনজনকেই সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো। আমি বাচ্চাদেরকে ব্যাগগুলোর উপরে বসিয়ে। একবার জরুরি বিভাগে ঢুকি,একবার বাইরে আসি।এর মধ্যে আমার মা ও পরিবারের অন্যান্য লোকজন চলে এলো।
চারিদিকে সাংবাদিক-পুলিশ ও সাধারণ মানুষেরা গিজগিজ করছে। মনটা ভীষণ বিষন্ন, কি জানি কি হয়! কানাঘুষায় শুনতে পেলাম , দুজন স্পট ডেড! আর একজনের অবস্থা মারাত্মক খারাপ! হসপিটালে ভর্তি করা হয়েছে! জানিনা বাঁচবে কিনা! ইন্নালিল্লাহ ইন্নালিল্লাহ বলে আমি আমার লোকের ট্রলির পিছন পিছন ছুটে চললাম ৫ নাম্বার ওয়ার্ডের দিকে। পিছন পিছন দৌড়ে আসতে থাকলো পরিবারের অন্য সদস্যরা!
দোয়া করছিলাম, আল্লাহ নেক হায়াত দিন! আমার লোকটা কে নেক হায়াত দিন! বাঁচিয়ে রাখুন! সুস্থ রাখুন! আল্লাহ!
তখনো আমার হাত থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে! কেন জানি আমার পাশে বসা বাসের সেই মহিলার মায়াময় মুখ খানি বারবার মনে হচ্ছিলো। আমি ভাবছিলাম এবার তাকে অবশ্যই খুঁজে বের করব। হাসপাতালে কোনায় কোনায় খুঁজব তাকে! অবশ্যই খুঁজবো ! কোথায় উধাও হলো সে!যতদূর জানি বড়দের কে অনেক পরে কষ্ট করে বের করা হয়েছে! তিনি কোন দিক দিয়ে উধাও হলেন! আমি এখনো সে রহস্যের কিনারা করতে পারছিনা। কেন যে তার কথা এত মনে পড়ছে!
ততক্ষণে ৫ নাম্বার ওয়ার্ডে চলে এসেছি!
ডাক্তার নার্স ছুটে এসে তার পরীক্ষা করতে থাকলেন। আর আমি পুরো ওয়ার্ল্ড জুড়ে সমস্ত অ্যাক্সিডেন্টের রোগীদের খোঁজ নিলাম। শুধু পেলাম না সেই মায়াময় চাহনির মহিলাটিকে। দোয়া করলাম মনে মনে। তিনি যেখানেই থাকুন, যেন সুস্থ থাকেন। আল্লাহ তাকে রক্ষা করুন।যাকে মাত্র একবার দেখেছিলাম।কিন্তু কেন জানি তার প্রতি অনেক অনেক বেশী মায়া লাগছিল।
সবারই খুব মারাত্মক খারাপ অবস্থা! শুধু মনে হলো আমরা অক্ষত ভাবে ফিরে এসেছি!ছোট-বড় পুরুষ-মহিলা রক্তে একাকার হয়েছেন! ভেঙেচুরে গুড়া গুড়া হয়ে গিয়েছেন । অনেকে প্রিয়জনকে খুঁজে পাচ্ছেন না! আবার পড়লাম, আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ!
ডাক্তার এসে একগাদা এক্স-রে ও অন্যান্য টেস্টের কাগজ হাতে ধরিয়ে দিয়ে গেলেন। অবসন্নতায় চোখ বুজে আসছে। আমি ঠায় দাঁড়িয়ে ভাবছি! আল্লাহ! আমি বেঁচে আছি! আলহামদুলিল্লাহ! আমরা বেঁচে আছি! আলহামদুলিল্লাহ! আম্মু জড়িয়ে ধরে বললেন! আলহামদুলিল্লাহ! ইনশাআল্লাহ ভালো হয়ে যাবে! চারিদিকে আর্তপীড়িত মানুষের চিৎকারে নিজের ব্যাথাটা ব্যথাই মনে হচ্ছিল না তখন!

আগের পর্ব- বেঁচে ফেরার সত্যি গল্প (প্রথম পর্ব)

বিঃদ্রঃ লেখকের জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে

লেখকঃ সাহিত্যিক ও শিক্ষক 

আরও পড়ুন