ভ্রমণ কাহিনীঃ লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক (পর্ব-০১)

নুরে আলম মুকতা

আশকোনা হাজী ক্যাম্পে যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় সন্ধ্যা। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়তে শুরু করেছে। ক্লান্ত সবাই। কিন্তু অদ্ভুত একধরনের আনন্দ সবার মনে । এ আনন্দ প্রকাশ করার মতো নয়। সবাই নিজের লাগেজ নিয়ে যাচ্ছি,মনে হচ্ছে যেন পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। মোয়াল্লেম সকলকে বুঝে নিয়ে চললেন রাত্রী যাপনের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে।

কিন্তু হায় আল্লাহ! আল্লাহর মেহমানদের অবস্থা দেখে তো তাজ্জব! আমাদের আগে থেকে মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা আর কুষ্টিয়া অঞ্চলের বেশকিছু হজ্ব যাত্রী ঐ বিশাল হলরুমের ফ্লোরে শুয়েছিলেন। সবার জন্য প্রায় দুই ফুট বাই পাঁচফুট লম্বা একটি করে ফোমের ম্যাট,একটি নামকাওয়াস্তে বালিশ আর গাদা করে রাখা মিহি কম্বল। ধুলা ঝেড়ে নিতে হবে।

ওয়াশরুম গন আর বেশ দূরে। যাদের দ্রুত ডেলিভারী করতে হয়, তারা সাবধান থাকবেন। বেশীর ভাগ বয়সী মানুষের এটি বড় সমস্যা। আমাদের দেশে জীবনের সব কাজ সেরে তবে বেঁচে থাকলে হজ্ব। তো বয়স হলে কি অবস্থা আন্দাজ করাও মুশকিল ? আমার দিকে তাই অনেকেই বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকায়। কেউ কেউ মনে করেন দাদা অথবা বাবার সহযোগিতার জন্য ক্যাম্পে আছি। যে যা পারে ভাবুন । আমি তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকি। রাতটুকুই তো। এজন্য কারো তেমন ওজর দেখিনি। সবাই তো হজ্ব যাত্রী এজন্য মনে হয় কেউ প্রতিবাদও করে না।

পাশের লোকজনের কথা শুনে চোখ চড়খগাছ! ওরা পাঁচ দিন থেকে ওই অবস্থায় অপেক্ষমান। কেউ নেই খোঁজ নেয়ার,খাবার পাচ্ছেন না। কাগজ-পত্রও কিছু নেই। মোয়াল্লেম এসে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একটি কার্ড দিয়ে লাপাত্তা।

একজন আমাদের কাছে ছুটে এলেন,’ভাই আপনারা কোথা থেকে এলেন,কখন যাবেন, ফ্লাইট কখন?’ ইত্যাদি প্রশ্ন। আমরা যথা সম্ভব উত্তর দিলে উনাদের মানসিক অবস্থা ভেঙ্গে পড়ার মতো হয়। আমরা তো অবাক!

মহিলাদের বন্দোবস্ত ভিন্ন দিকে এজন্য আমরা সবাই বেকায়দায় পড়ি। আমরা তো হজ্বে যাচ্ছি, প্রায় সবাই বয়স্ক কিন্ত আমি তো বোনের সাথী হিসাবে যাচ্ছি আর বয়সও অনেক কম। এজন্য ছুটতে হচ্ছে বেশী আমাকে। হজ্ব ক্যাম্পে গিয়েই বয়সীদের ত্রাহী ত্রাহী অবস্থা। জরুরত তো বিস্তর কিন্তু দেখবে কে ? সর্বত্র পুলিশের নজরদারী। জরুরী প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া যায়না। সব কিছু ওখানে পাওয়াও যায়না। এবার ফেরত প্রবাসীদের কারনে মানুষ কিছুটা ধারনা পেয়েছে মনে হয়। আমার এক ব্যাংক কর্মকর্তা বোনের ছেলে ওর পরিবার সহ রাত নয়টার সময় এসেছিলো আমাদের সাথে দেখা করতে। আমি অনেক কষ্টে ওদের সোনামুখ গুলো দেখার জন্য পুলিশ দের অনেক অনুরোধ করে গেলাম। কিন্তু আপা পর্যন্ত নিয়ে যাবার ব্যাবস্থা করতে পারলাম না। মর্মাহত হয়েছিলাম।

ওরা কেন এরকম করে পরে জেনেছিলাম। আশেপাশের পরিবেশ নাকি এরকম আচরণ করতে বাধ্য করে। রাতে এলো কাফেলার মালিক বিশাল কাগজের বান্ডিল হাতে নিয়ে। আগে তোরজোড় শুরু করলো রাতের খানার জন্য। ততক্ষনে আমি আমার ভাইবোনদের বাসা থেকে আনা খাদ্যে উদরপূর্তি করেছি। কাফেলার মালিক খানার ব্যাবস্থা ভালোই করলেন ক্যাম্পের হোটেলে।

কিন্তু আমাকে চাপিয়ে দিয়ে গেলেন বড় কাজের বহর। অনেক গুলো ইমিগ্রেশনের ফরম পূরণ। বহু রাত অবধি কাজ করে আবার প্রস্তুতি নিতে হবে। সকাল দশটায় ফ্লাইট। এর মধ্যে আমার স্টুয়ার্ট বন্ধুকে ফোন দিলাম। ওর প্রশ্ন, “তুই ওখানে কেমনে রাত কাটালি, আপাসহ তুই আমার এখানে উঠলিনা কেন, টিকিট পেয়েছিস,ভিসার সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে কিনা? তোর পাশেই দেখ অন্য কাফেলার নাজেহাল অবস্থা।” আমাদের সব আনুষ্ঠানিকতা চুকে গেছে শুনে ও বিস্ময় প্রকাশ করলো। ফ্লাইট নম্বর জানার পর ও শান্ত হলো।

ইমিগ্রেশন আর মালামাল স্ক্যানিং এর কাজ হাজী ক্যাম্পেই হবে এজন্য আমাদের সকাল সাতটার মধ্যে প্রস্তুত থাকতে বলা হল।

ইহরাম বাঁধার পর থেকে নিজের মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। আমার কাছে এটি অপার্থিব মনে হয়েছে।

আমাদের আত্মীয় স্বজনেরা সবাই বিদায় জানাতে চলে এসেছে। হঠাৎ খেয়াল করলাম ইউনিফর্ম পরা একজন বিমানের লোক আমাদের দিকে আসছে। আমার কাছে এসে জড়িয়ে ধরল। আমার কাঁধে অশ্রু পড়ছে বুঝতে পারছি। “চল একটু পাশে যাই।” ও বললো।
“তোরা তো এখনি আমাদের প্রস্তুতি নিতে বলেছিস,আবার পাশে কেমন করে যাব?” আমি বন্ধুর উদ্দেশ্যে বললাম ।”তোদের সকাল দশটার ফ্লাইটটি দুপুর দুটায় যাবে। কিছু সময় আমার সাথে থাক।” বিনয়ের সাথে আমার বন্ধু বলল ।

কাফেলার লোকজন মনে হলো শান্তি পেল। আমার মনে এক ধরনের আশংকা দেখে বন্ধু অভয় দিয়ে বললো,”তোরা যাচ্ছিস,সব আনুষ্ঠানিকতা ঠিক আছে। হজ্বের সময় ফ্লাইট সময়ের তারতম্য বড় কোন বিষয় নয়। আমার দূঃখ হচ্ছে, তুই রাতে ফোন দিলে আমি আপাকে সেবা দিতে পারতাম।”

আবারও ওর চোখ ভেজা। আমি বললাম, “আমার কাঁদার কথা। তুই কেন?” ও তখন ভারি গলায় বলল, “দোস্ত কতদিন বিমানে আছি সৌভাগ্য হলো না,বন্ধুদের মধ্যে তুই প্রথম।” আমি ওকে থামিয়ে দিলাম।

দশটার পর চেকিং এর জন্য আমাদের লাইনে দাঁড়াতে হল। স্ক্যানারের কাছে লাগেজ আর সমস্ত হ্যান্ডব্যাগও দিলাম। এখানে আমি প্রিয় বন্ধুদের অনুরোধ করব,

লাগেজ ভারী করবেন না, আর বেশি দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধবেন না। যেকোন সময় খুলতে সহজ হয় এরকম ব্যাবস্থা নেবেন। লাগেজের ওপর নাম ঠিকানা আর চেনা যায় এরকম কিছু চিহ্ন দেয়া যেতে পারে। কিছু না লিখে পাসপোর্ট নম্বর আর দেশের মোবাইল নম্বর লিখলে আপনার লাগেজ হারাবে না। বাংলাদেশ বিমানে যাবার ব্যাবস্থা হলে ভালো। অন্য কোন এয়ার লাইন্স হলে হাজীদের মাল-সামানের বিষয়ে বিস্তর ঝামেলা হয়। হজ্ব যাত্রীদের যত্ন আর সেবার বিষয়ে আমাদের বিমান প্রশংসার দাবীদার।

স্ক্যানিংয়ের সময় আমার কাঁধ ব্যাগে রাখা সেভিং কীট-বক্স ট্রেসড হয়। অপারেটর বলল, ”স্যার এগুলো বের করে আপনার আত্মীয়কে দিয়ে দেন। জেদ্দায় এগুলো ওরা ফেলে দিবে। আমরা হলে কোন সমস্যা ছিলো না।” আমি ওটা বের করে আমার ভাইপো কে দিয়ে দিলাম। আমরা চলে যাবার পর আমার ঢাকায় ব্যাবহৃত সার্ট প্যান্ট আর ঐ সেভিং কীট বাড়িতে ফেরত গেলে একমাত্র কন্যা খুব কেঁদেছিল।

স্ক্যানিং শেষে আমাদের স্বল্প প্রশিক্ষণের জন্য জমায়েত করা হলো শুধু নির্দিষ্ট ফ্লাইটের যাত্রীদের। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন মাওলানা আমাদের দিক নির্দেশনা দিলেন হজ্ব বিষয়ে। আমার কাছে বাস্তব, উপকারী আর প্রাঞ্জল মনে হয়েছিল এ নির্দেশনা। মাওলানার নিকট আমি কৃতজ্ঞ। একজন সুদর্শন বিমানের কর্মকর্তা এসে আমার নাম ধরে ডাকলে আমি অবাক হই ! মামা আপনার আর খালাম্মার টিকিট দুটো দ্রুত আমাকে দেন, এখান থেকে বিমানের গাড়ী পোর্টে নিয়ে যাবার আগেই আমি আবারো আসছি, আমি আপনার ভাগ্নের ভার্সিটি ফ্রেন্ড। আমি কথা না বাড়িয়ে দিয়ে দিই। প্রশিক্ষণের জন্য মনোনিবেশ করি। দশমিনিট পরেই বিমানের গাড়ি চলে আসে। ততক্ষনে আমরা সবাই বোর্ডিং পাস পেয়ে গিয়েছি।

বিমানের লাউঞ্জে সবাই প্রবেশ করছি এমন সময় আমাদের বোর্ডিং পাস দেখে ইমিগ্রেশন পুলিশের সন্দেহ হয়। ওরা ভাই-বোনকে আটকে দেয়। আমার কোন ভাবান্তর হয়নি। হাজীদের সবার টিকেট ইকোনমি ক্লাসের। আমার ভাগ্নে আমাদের গুলো বিজনেস করেছিলো। হজ্ব ফ্লাইটে তো বিজনেস প্রায় ফাঁকা থাকে তাই এ হালাল স্বজনপ্রীতি।

(চলবে)

লেখকঃ কলেজ শিক্ষক ও সহ-সম্পাদক, মহীয়সী

আরও পড়ুন