রঙ্গিন দুনিয়া শুধু আমি নেই

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ

গতকাল একজন রুগী দেখলাম।সফির আলি নাম।বয়স কত হবে ৫০ বছর। গ্রামের টং দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন আর আড্ডা দিচ্ছিলেন।হঠাৎ করেই বসা থেকে পড়ে গেলেন।স্বজনরা দ্রুত আমার কাছে নিয়ে আসলেন।আমি ক্লিনিক্যাল এক্সামিনেশন করে নিশ্চিত হলাম ব্রেন স্ট্রোক।
ডান পাশটা অবশ হয়ে গেছে।হাত পা আর নড়ছে না।মুখ টা বেঁকে গেছে।আমি শান্ত ভাবে তাকিয়ে ছিলাম সফির আলির মুখের দিকে।আর চলে গেলাম ভাবনার রাজ্য।

চা খেতে খেতে কত হাস্যরস করছিলেন সফির আলি,শরীরে কত শক্তি,গলায় ছিলো কত তীব্র জোর।মাত্র এক সেকেন্ড আগেও ভাবতে পেরেছিলেন কি এক সেকেন্ড পরই উনার মাংসপেশী গুলো দূর্বল হয়ে যাবে।গলার স্বর টা মিইয়ে যাবে।অস্পষ্ট হয়ে যাবে এক সেকেন্ড আগের গলার আওয়াজ। ভাবতে পারেননি সফির আলি?

আজ সকালে সফির আলির সিটি স্ক্যান রিপোর্টটার দিকে তাকিয়ে আনমনা হয়ে গেলাম।

কিছুদিন আগে আমার মেডিকেল কলেজের জুনিয়র ফাকিহার একটা পোস্ট চোখে পড়ল।মেয়েটা বসে ছিল সাস্টের একটা টিলার উপর।চারপাশের মুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য ছবিটাকে মোহনীয় করে তুলেছিল।ছবিটাতে লাইক দিয়ে পোস্ট না পড়েই স্ক্রল করে নীচে নেমে গেলাম।
সেইদিন রাতে আমার বন্ধু ডাঃ ফেরদৌস যখন তার সেই পোস্টে কমেন্ট করল, IVIG দিতে তখন আৎকে উঠলাম।আবার গেলাম তার পোস্টে।আমি থ- হয়ে গেলাম।ফাকিহা জিবিএস এ আক্রান্ত।

একদিন শনিবারে যেই মেয়েটি হেঁটে হেঁটে উঁচু টিলায় উঠেছিল, ঠিক পরের দিন রবিবারেই তার পা দুটো আস্তে আস্তে অবশ হতে লাগলো।৪০ দিন আগে মা কে হারানো মেয়েটি তখন হসপিটালের বেডে শুয়ে সাদা দেয়াল এর দিকে তাকিয়ে আছে।

সিলেটে যারা সাইক্লিং করেন,তারা নিশ্চয়ই সবাই ফাকিহাকে চেনেন।।এমন চপলা, চঞ্চল, সাহসী, দূরন্তপনা করা মায়াবী মেয়েটি এখন আর সাইক্লিং করতে পারবে না।
কবে আবার সাইকেলের প্যাডেলে তার পা দুটো পড়বে সেটা আমরা কেউ ই জানিনা।ফাকিহা এখন সুস্থ হয়েছে জেনেছি।

গফুর কাকার একমাত্র ছেলে মানিক ভাই।আমাদের এক ক্লাস সিনিয়র। রাস্তার সাথেই উনাদের ঘর।সেই রাস্তা দিয়ে আমরা সবাই আমাদের প্রিয় হাই স্যারের পিছনে পিছনে স্কুলে যেতাম।কত স্মৃতি।। সেই কৈশোরের সোনালী দিনগুলো আজ আর নেই।।স্যার মজার মজার গল্প বলতেন,কাউকে বকা দিতেন, আমরা আনন্দ চিত্তে সেগুলো উপভোগ করতাম।মানিক ভাই এক বাবার এক ছেলে।তিন বোনের আদুরে ভাই বাবার সংসারে হাল ধরতে লেখাপড়ায় ইস্তফা দিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত রেখেছিলেন।

আমি যখন মেডিকেলে চান্স পেলাম,চাচী রাস্তায় পেয়ে আমাকে জড়িয়ে কপালে চুমু খেয়েছিলেন।গফুর কাকা আমাদের বাড়ির সামনের ক্ষেতে যখন কাজ করতেন, আমি বাড়িতে গেলে উনার সাথে গল্প করতাম।হাসিমুখে সব সময় আমার খবর নিতেন।মানিক ভাই ভালো ড্রাইভার হয়ে উঠলেন,গফুর কাকার সংসারে সুখের ছোঁয়া।সেই মানিক ভাই এর লাশ আমার সামনে,কফিনটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ,গফুর কাকার আহাজারি, চাচী ও বোনগুলোর গগনবিদারী কান্নায় বাতাসটা সেদিন ভারী হয়ে গিয়েছিল।।

আমি শুধু ভাবছি ২৫ বছরের তরুণ মানিক ভাই কেন কফিনে?উনার তো চলে যাবার কথা ছিলো না।বোন দুইটা বিয়ের বাকী। ক্যান্সার আক্রান্ত গফুর কাকার চিকিৎসার ব্যয় কে বহন করবে।মানিক ভাই এর বিয়ের জন্য কন্যা দেখা হচ্ছিল।যখন গাড়িতে একা মানিক ভাই হয়ত সুখ স্বপ্নেই বিভোর ছিলেন,পেছন থেকে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে আসা লরি ট্রাক একটা চাপা দিয়ে এক নিমিষেই সব অন্ধকার করে দিলো।

পৃথিবীতে নিজের খুশীমতো আসিনি;খুশিমতো চলেও যাব না।জীবন হাত ধরে নিয়ে এসেছিল বলেই এসেছি।।মৃত্যু হাত ধরে নিয়ে চলে যাবে,তখন চলে যাব। চলে কিন্ত যেতেই হবে।আজ কেউ যাচ্ছে, কাল আমি বা আপনি।কনফার্ম রিটার্ন টিকেট হাতে আমাদের।

আমি ইদানিং জীবন দেখি। মানুষ দেখি।।ভাবনার একটা জগত তৈরি হয়েছে আমার।মাঝে মাঝে একাকী গভীর রাতে নিজেকে নিয়ে যাই সেই দুনিয়ায়।যেখানে আমি একা।শুণ্যতা, নীরবতা।কেউ নেই,প্রিয় মুখ গুলো দেখা যায়না।একটা তীব্র অন্ধকার চারদিকে।আমি নেই। কিন্ত নীল আকাশটা আগের মতই আছে।সাদা বকের ঝাঁক উড়ে যাবে নীল আকাশে।সমুদ্র আগের মতনই গর্জন করবে।পাখিরা গান গাইবে।গোলাপের সুরভীতে সুবাসিত হবে চারদিক।শুধু নেই আমি।সবাই প্রতিদিন যার যার কাজে ব্যস্ত হয়ে রইবে।পানসী রেস্টুরেন্টে ভীড় ঠিক আগের মতই থাকবে।পুকুর পাড়টিতে হয়ত কিছু শুকনো পাতা পড়ে রইবে।ফেসবুকের পাতা খুলে বন্ধুদের ছবিতে লাইক দিবে,কমেন্ট করবে, মজা করবে আমার বন্ধুরা।

আমার চেম্বারের চেয়ারটায় এসে বসবে অন্য কোন ডাক্তার।। সবাই খাবে,ঘুমাবে, কেউ কেউ আগের মতই নাক ডাকবে।।পাশের বাড়ির ছেলেটি রোজ রাতে জগজিৎ সিং এর গজল শুনবে।কিন্ত থাকবো না এই আমি।মা বাবা হয়ত খুব কাদঁবেন মাঝে মাঝে।অন্য ছেলে মেয়েদের ঘরের নাতি নাতনি দের হয়তবা আমার গল্প শুনাবেন।মা তখন কাপড়ের আঁচলে চোখ মুছবেন।
আমার তো খুব ইচ্ছে হবে মায়ের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুতে একটু স্পর্শ করতে।বাবা হয়ত নাতিদের নিয়ে হাঁটতে বের হবেন সকালে,ধর্মসাগর পাড়ে বসে নাতির হাত ধরে আমার গল্প শুনাবেন।আমার ভাগ্না বা ভাতিজা মনযোগী শ্রোতা হয়ে শুনে যাবে সেই অভাবের দিনের বিষাদময়ী নদী পাড়ি দিয়ে সবাইকে নিয়ে আলোক নগরীতে আসার গল্প।।আমি গল্প হয়ে যাবো।আমি ভাবতেই পারছিনা।কিন্ত এটাই তো নিয়তি।

আজ আমি জীবনের গল্প লিখি।আগামীকাল আমি কারো গল্প হয়ে যাবো।কিন্ত আমাদের হুশ নেই।আমরা বেহুশ হয়ে গেছি।।ক্ষমতার দম্ভ,অহংকার, লোভ, হিংসায়, কূটনামিতে আমরা ডুবে আছি গলা পরিমাণ।। কাকে ঠকাবো,কারটা মেরে খাবো,কার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাবো সেই কাজেই ব্যস্ত আমরা।আমাদের যে এখানে চিরস্থায়ী আবাস নেই সেটা মাটির মানুষ আমরা ভুলে আছি।

একজন বরফকে প্রশ্ন করলো, “তুমি এত ঠান্ডা কেনো?”

বরফ খুব ভালো উত্তর দিল, “আমার অতীতও জল, ভবিষ্যতও জল…তাহলে এতো গরমের(অহংকার) কি আছে।”

মানুষেরও অবস্থা কি একি রকম নয়?

মানুষের অতীতও “খালি হাত” এবং ভবিষ্যত ও “খালি হাত”.! তাহলে…???

এতো গরমের(অহংকার) কি আছে.!!!!

যেতে হবে।যাবার প্রস্তুতি নিতে হবে।।গাড়ি অপেক্ষা করছে।শুধু যাত্রীরা উঠার বাকি।।আমি চলে যাবো। কিন্ত কি রেখে যাবো এই রঙিন দুনিয়ায়।।

কিছু মায়া বিলিয়ে যাবো মানুষের মাঝে।সেই মায়া আমাকে সেই দুনিয়ায় মায়ায় বাঁধনে জড়িয়ে রাখবে।

লেখকঃ ডাক্তার ও কলামিস্ট

 

আরও পড়ুন