সুন্দর চরিত্রের সন্ধানে…

মাহবুবা শারমিন

“কিয়ামতের দিন দাঁড়িপাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে সুন্দর চরিত্র!” (তিরমিজী). মুমিনদের জন্যে এটা একটা লোভনীয় হাদিস! একজন মুসলিম বিচারের দিন আল্লাহর সামনে নিজের স্কোর বাড়াতে নিজ চরিত্রকে শুধরানো অনেক জরুরি মনে করে। ভাবতেই ভালো লাগে যে, আমি যদি জাস্ট কোনোভাবে আমার চরিত্রটাকে সুন্দর করতে পারি, কিয়ামতের দিন তাহলে আমার পাল্লা সবচেয়ে ভারী হবে বিইজনিল্লাহ!

আল্লাহর জন্যে নিজের চরিত্রকে ঘষে মেজে সুন্দর রাখার কিছু প্র্যাকটিস এমন হতে পারে —

● সবসময় সবাইকে নিয়ে ভালো চিন্তা করা । উপযুক্ত প্রমান ছাড়া কাউকে খারাপ ভেবে না বসা । সাহাবীদের সময় একবার এক সাহাবী যখন দেখলেন আরেকজন সাহাবীর দাড়ি থেকে মদের ফোঁটা বেয়ে বেয়ে পড়ছে, সে তাকে প্রথমেই দোষ না দিয়ে ভাবলেন, হয়তো তার সাথে কারো ঝগড়া হয়েছে, এর ফলে রাগ করে কেউ তার দিকে মদের গ্লাস ছুড়ে মেরেছে।

● নিয়তেই বরকত! প্রতিনিয়ত নিজের নিয়তকে চেক করা. আমি এই কাজটা কেন করছি? কাকে খুশি করার জন্যে করছি? কেউ যদি সত্যি কোনো কাজ আন্তরিক ভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে করে – তাহলে সেই কাজে High কোয়ালিটি থাকবে! একটা সিম্পল নিয়ত করলে যে কোনো কাজ বরকতপূর্ণ হয়ে যায়. যেমন কেউ যদি ঘুমানোর আগে এই নিয়ত করে ঘুমায় যে, “হে আল্লাহ! আমি এই ঘুমের মাধ্যমে যে energy পাবো, সেটা দিয়ে যেন ঘুম থেকে উঠে আরো ভালোভাবে তোমার ইবাদাত করতে পারি।” তাহলে পুরা ঘুমটাই তার জন্যে ইবাদাত হবে এবং সে যতটা সময় ঘুমাযে তার জন্যে নেকী পেতে থাকবে! সুবহানাল্লাহ ঘুমানোর জন্যে পুরস্কার!

● অপ্রয়োজনীয় কথা-আলাপে মশগুল না হওয়া। কেউ কথা বলার সময় তাকে কথার মাঝে cut-off না করা! শেইখ বলেন, “কেউ কথা বলতে থাকলে কখনো তাকে মাঝখানে কাট করে দিয়ে নিজের কথা বলা শুরু করে দিও না. কারণ, যে কথা বলছে সে যদি জ্ঞানী হয়, তাকে শুনতে থাকো, তোমার জ্ঞান বাড়বে! আর যে কথা বলছে, সে যদি মূর্খ হয় তাকে শুনতে থাকো – তোমার ধৈর্য্য বাড়বে! নিশ্চয়ই তোমার ধৈর্য্য অর্জন করা জ্ঞান অর্জন করার থেকে বেশি জরুরি!”

● নিজের সমালোচনা শুনলে অফেন্ডেড না হওয়া! চিন্তা করে দেখা – আমার মাঝে কি আসলেই এই ভুল আছে? ইমাম শাফি’ই (রা:) একবার ভরা সমাবেশে ক্লাস করাচ্ছিলেন। তখন এক লোক হুড়মুড় করে তার ক্লাসে ঢুকে গেলেন। তার দিকে আঙ্গুল তুলে বললেন, “তুমি কি ইমাম শাফি’ই?” ইমাম বললেন, “জ্বী, আমি শাফি’ই”। তখন লোকটি সবার সামনে চেঁচিয়ে বললেন ইমামকে বললেন, “তুমি একটা ফাসিক, কাফির এবং জঘন্য প্রকৃতির লোক!” ইমাম শুনলেন। শুধু সমালোচনা না, তাকে সবার সামনে খুব খারাপ ভাবে অপমান করা হয়েছে! তিনি অফেন্ডেড তো হলেননা, বরং এর উত্তরে তৎক্ষনাত দুই হাত তুলে সবার সামনে দুআ করলেন, “হে আল্লাহ! এই ব্যক্তি যদি সত্য বলে থাকেন, তাহলে তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমার উপর দয়া করো এবং আমার তাওবা কবুল করে নাও! আর যদি এই ব্যক্তি যা বললেন, সেটা সত্য না হয়, তাহলে তার এ আচরণের জন্যে তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও, তার উপর দয়া করো এবং তার তাওবা কবুল করে নাও!”

● প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাবার আগে সবাইকে মাফ করে দিয়ে অন্তর ক্লিন করে ঘুমানো

● কোনো ব্যাপারে অন্তরে অহংকার ঢুকে যাচ্ছে কি না চেক করা. যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমান অহংকার থাকবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণ-ও পাবে না (সহীহ হাদিস)

● যদি কারো উপর হিংসা হতে থাকে, সেই ব্যক্তির নাম ধরে তার সাফল্যের জন্যে বেশি বেশি দুয়া করা. এটাকে অনেক স্কলার হিংসার বেস্ট চিকিৎসা বলেছেন। একটা উদাহরণ দেই, ধরেন অফিসে তানহা অনেক ভালো পারফরম্যান্স করলো, এতে কলিগ শাকিলে হিংসা হচ্ছে। শাকিল কন্ট্রোল করতে পারছে না. তার মনে এটা নিয়ে কষ্ট লেগেই আছে যে, তার বন্ধু তার থেকে এতো ভালো অবস্থানে আছে, অথচ সেও অনেক পরিশ্রম করে. শাকিল সেই দিন থেকে বেশি বেশি বন্ধু তানহার জন্যে দুয়া করতে থাকলো, আল্লাহ যেন তানহাকে আরো বেশি সাফল্য দেন, রহমত এবং বরকত দেন! আলহামদুলিল্লাহ দুয়া করতে করতে কয় মাসের মধ্যেই শাকিলের অন্তর থেকে হিংসা দূর হয়ে গেলো। আল্লাহ সুবহানাতায়ালা শাকিল এবং তানহা দুইজনকেই অনেক ভালো পজিশনে যাবার তাওফিক দিলেন।

● নিজের ভুল/গুনাহ -র একটা লিস্ট বানানো। নিজের ভুল নিয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত থাকা, যেন অন্যের ভুল নিয়ে গল্প করার কোনো সুযোগ না থাকে।কিন্তু দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হরহামেশা এটা ঘটতে থাকে।

● এমন কোনো কথা কারো পিছনে কখনো না বলা, যেটা সে যদি সামনে থাকতো, তাহলে তার সামনে কখনোই বলা যেত না. এটাই গীবতের ক্লাসিক Definition. গীবত মৃত ভাইয়ের মাংস খাবার মতন জঘন্য গুনাহ (কুরআন: সুরাহ হুজুরাত)

● রাস্তার মধ্যখানে কখনো ময়লা না ফেলা! আমার স্বামীকে দেখতাম সে দেশে গেলে একটা ব্যাগ নিয়ে ঘুরতো। বলতো, দেশে তো সব জায়গায় Trash can পাওয়া যায় না. সারাদিনের ময়লা সে তার ঐ ব্যাগে রাখতো। ঘরে এসে ময়লার বিনে ফেলে দিতো। রাস্তার মাঝে থেকে কিছু ফেলে দেওয়াটাও সাদাকাহ।

● বড় – ছোট সবাইকে নিয়ে ভালো চিন্তা করা. যারা আমাদের থেকে বয়সে বড়, তারা আমাদের থেকে বেশি বছর ধরে বেঁচে আছেন, কাজেই তারা আমার থেকে বেশি নেক কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। আবার যারা আমাদের থেকে বয়সে ছোট, তারা আমাদের থেকে কম গুনাহ করার সুযোগ পেয়েছে।

আল্লাহ সুবহানুতায়ালা আমাদের ভিতর-বাহির সব সুন্দর রাখুন। আমিন।
~ inspired by Imam Omar Suleiman’s “Behind the Scene- Spiritual Cleansing of the Believer”.

আরও পড়ুন