স্ট্রেস এবং স্ট্রেস রেসপন্স

এইচ বি রিতা

বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনাগুলোতে সব সময় সতর্ক করা হয় যে, আমাদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস(মানসিক চাপ) ও এ্যাংজাইটি(উদ্বেগ) আমাদের ডিপ্রেশন এবং ডিমেনশিয়াজনিত সমস্যাগুলো বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়। বেক্রেষ্ট হেলথ সায়েন্সেসের রটম্যান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নেতৃত্বে পর্যালোচনাটিতে, পশু ও মানব গবেষণায় দেখা যায় যে দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস, এ্যাংজাইটি এবং ভয় আমাদের মস্তিষ্কের ক্ষেত্রগুলিকে মারাত্বকভাবে প্রভাবিত করে। বর্তমান সময়কালে বিগত কয়েক মাস যাবত আমরা অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক পরিবেশের ঘটনাগুলিকে যেভাবে অনুধাবন করছি, তাতে আমাদের স্ট্রেস ও এ্যাংজাইটি বৃদ্ধি; অতি স্বাভাবিক।

এ এক ভয়ংকর দুঃসময় পার করছি আমরা যা ইতিহাসের ‌অনন্য মহামারী বা দুর্যোগকালীন ঘটনাগুলো থেকে একেবারেই পৃথক। আমেরিকা ছিল আমাদের স্বপ্নের দেশ। আজ সেই আমেরিকা সর্বাধিক কোভিড-১৯ কেইস এর প্রথম তালিকায়। আক্রান্ত ৫,১০৫,৭১০ এবং ১৬৪,৪৮৮। দ্বিতীয় তালিকায় ব্রাজিল এবং ইন্ডিয়া আছে তৃতীয় তালিকায়। বাংলাদেশে দিন দিন বাড়ছে আক্রান্ত্র সংখ্যা। বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৫৫ হাজার ১১৩ ছাড়িয়ে গেছে।

উন্নত দেশগুলোতে চিকিৎসা বিভাগ পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করলেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর পাশাপাশি বেড়েছে বেকারত্ব, অর্থনৈতিক সংকট, সহিংসতা, চাকরী হ্রাস, দৈনন্দিন জীবন যাপনে অনিরাপত্তা।
‌অন্যদিকে, বাংলাদেশের চিকিৎসা বিভাগ ও পদ্ধতি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা রয়েছে। দেশের দূর্নীতি বর্তমানে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও জড়িত হয়েছে। যেখানে বাহিরের দেশগুলোতে স্বাস্থ্য সেবকরাই এখন করোনা লড়াইয়ে আমাদের ভরসা, সেখানে বাংলাদেশের কিছু কিছু স্বাস্থ্য সেবক ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে সাধারণ জনগন আছেন দুশ্চিন্তায়। করোনার রোগীকে চিকিৎসা দেবার অজুহাতে সাধারণ জনগনকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে কিছু কিছু স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলো থেকে। তাদের অবহেলায় মরছে শিশু, গর্ভবতী মায়েরা। টাকার বিনিময়ে করোনা টেষ্ট না করেই দেয়া হচ্ছে ভুল কাগজ। রিস্ক নিয়ে কাজে যাচ্ছেন অনেকে। বেকারত্বের সংখ্যা বাড়ছে। দেয়া হচ্ছেনা বেকার ভাতা বা যথেষ্ট পরিমানের কোন সরকারী অনুদান। শিক্ষাক্ষেত্র পরিচালনায় প্রশাসন কতদূর এগিয়ে, বুঝে নেয়া মুশকিল নয়। আর ধর্ষণ? কোভিড-১৯ এখনো সেটা দমাতে পারেনি।

বর্তমান পরিস্থিতে আমাদের স্ট্রেসে থাকার যথেষ্ট উপকরণ রয়েছে। প্রতিদিন কোভিড-১৯ কেড়ে নিচ্ছে শতক হাজারো প্রাণ। পরিবার আত্বীয়দের মৃত্যু, বিক্ষোভে আহত হচ্ছে মানুষ, গুলিবিদ্ধ ছুরিকাঘাতে মরছে নিরিহ মানুষ। পথে বের হবার নিরাপত্তা নেই। ঘরের ডোরবেল বাজলেও আতঙ্কের শেষ নেই। স্কুল বন্ধে সমস্যায় আছেন চাকরীজীবি পিতা-মাতারা। বিশেষ করে বাহিরের দেশগুলোতে স্পেশাল নিড শিক্ষার্থীদের গৃহবন্দিত্ব পরিবারের জন্য বিরাট এক সমস্যা।

স্ট্রেস একটি মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধি এবং শরীরের প্রতিক্রিয়া। তবে এই দীর্ঘ মেয়াদী স্ট্রেস আমাদের জীবনকে কতটা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে, তা হয়তো আমাদের জানা নেই। স্ট্রেস থেকে শারীরিক সমস্যাগুলো বৃদ্ধি পায়। যেমন-মাথাব্যথা, হজমজনিত সমস্যা এবং ঘুমের স্বল্পতা। এটি বিভ্রান্তি, এ্যাংজাইটি এবং ডিপ্রেশন সৃষ্টি করার উৎস। আমেরিকান সাইকোলজিকাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুসারে, চিকিৎসাবিহীন দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ এবং ইম্মিউন সিস্টেমের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি স্থূলত্বের নির্ভরযোগ্য উৎস এবং হৃদরোগেরও কারণ। এবং উল্লেখ্য যে, এই স্ট্রেস থেকেই অনেকের ইম্মিউনিটি দূর্বল হয়ে পড়ায় তারা কোভিড-১৯ মোকাবেলায় লড়াই করতে ব্যর্থ হন।

এই স্ট্রেস থেকে পরিত্রাণের উপায় তবে কি?
আমাদের জন্য স্ট্রেস নতুন কোন ব্যপার নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতি অনেকের ক্ষনস্থায়ী স্ট্রেসকে দীর্ঘস্থায়ী করবে বলে মনে করছেন মনস্তত্ত্বিকবিদরা।
আদিম যুগে আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন গুহা বা জঙ্গলে বসবাস করতো, তখন সচরাচর তারা হিংস্র বন্যপ্রাণি দ্বারা আক্রমন হতো। এবং হিংস্র বন্যপ্রাণীদের হাত থেকে বাঁচার জন্যে তাদের একটাই পথ ছিলো-হয় প্রাণিটার সাথে লড়াই করা কিংবা জীবন বাঁচানোর জন্য দৌড়ে পালানো।
যুগ পাল্টেছে। এখন বন্যপাণীর সাথে লড়াই করার প্রয়োজনও ফুরিয়েছে। তবে দৈনন্দিন জীবনে টিকে থাকার নানান উপকরণ দত্তক নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত আমরা পাওয়া-না পাওয়া, হার-জিত, হতাশা-ব্যান্জনার যে লড়াই করে যাচ্ছি, তাতে আমাদের সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টিম উদ্দীপ্ত থাকছে এবং নিঃসৃত হচ্ছে বিভিন্ন স্ট্রেস-হরমোন, যেমন- এড্রিনালিন, নর-এড্রিনালিন এবং কর্টিসল। বণ্য আদিমতা শেষ হলেও লড়াই আমরা প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছি।
আর একেই বলে ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স, বাংলায় যাকে বলে ট্রেস রেসপন্স। ট্রেস রেসপন্স হচ্ছে আমাদের অটোনোমিক নার্ভাস সিস্টেমের একটি স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

দিনের পর দিন ক্রমাগত দুঃশ্চিন্তা ও স্ট্রেস করতে থাকলে শরীরের স্নায়ু ও পেশিগুলো যে পরিমাণে সংকুচিত হয়, সে অনুপাতে শিথিল হতে পারে না। যার ফলে নানারকম সাইকোসোমাটিক বা মনোদৈহিক রোগব্যধি আমাদের আক্রমন করে বসে।
যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোর চিকিৎসাবিজ্ঞানী ডা. মেয়র ফ্রেডম্যান এবং ডা. রে রোনেম্যান দীর্ঘ গবেষণার পর দেখান যে, হৃদরোগের সাথে অস্থিরচিত্ততা, বিদ্বেষ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও ভুল জীবনাচরণের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। আর এর অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে জীবন সম্পর্কে আমাদের ভুল দৃষ্টিভঙ্গি অর্থাৎ ভ্রান্ত জীবনদৃষ্টি। আর এটাই ট্রেস রেসপন্স।

ধরুন, আপনি কারো থেকে টাকা ধার করেছেন। পাওনাদার সে টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু আপনি এই মুহূর্তে টাকা শোধ করতে পারছেন না। তখন কি করবেন? নিজেকে রক্ষার্থে পাওনাদারকে মেরে ফেলবেন? পালিয়ে যাবেন? নাকি পাওনাদারকে অনুরোধ করে সময় চাইবেন দেনা শোধ করতে? আপনি এখন পরিস্থতি সামাল দিতে যেভাবে রিয়্যাক্ট করবেন, সেটাই ফাইট অর ফ্লাইট অর্থাৎ ট্রেস রেসপন্স। এবং রিয়েকশন যাই হোক, তা আমাদের সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টিমকে উদ্দীপ্ত রাখছে। কাজেই, ট্রেস এড়ানো কিছুতেই সম্ভব হচ্ছেনা।

একই প্ল্যাটফর্মে আপনি এবং আপনার সহকর্মী বা বন্ধু।
আপনি পুরস্কারটি পেলেননা কিন্তু আপনার পাশেরজন পেয়ে গেল। এতে আপনি ঈর্শান্বীত না হয়ে যখন তার অর্জনে খুশী হবেন বা খুশী না হতে পারলেও তার প্রতি আপনি বিরুপ কোন আচরণ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখবেন, তখন সেটা ইতিবাচক স্ট্রেস রেসপন্স। আর যদি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারেন, তবে সেটা নেতিবাচক স্ট্রেস রেসপন্স।

পুরো পৃথিবী থেকে যতদিন এই মহামারী সম্পূর্ণ নির্মূল না হবে, অর্থনৈতিক দুর্যোগ, বর্ণ-বৈষম্যবাদী আচরণ, স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হবে, ততদিন স্ট্রেস
অনবরত বাড়তেই থাকবে। এবং আমাদের ডিপ্রেশন ও এ্যাংজাইটি ক্রোনিক আকাড়ে আমাদের আক্রান্ত করবে। তবে, এটা মেনে নিতে হবে যে, স্ট্রেস আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের একটি উপাদান। একে ছাড়া জীবন যাবন বলা যায় অসম্ভব। তবে, যতটা সম্ভব বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নিয়ে তার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়ার মানসিকতা গ্রহণ করতে পারলে, সময়কে ভাগ করে পরিকল্পনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নিলে, দৈনন্দিন জীবনধারণে বিরুপ মনোভাব ও আচরণ এড়িয়ে চলতে পারলে, টেনশন ও স্ট্রেস অনেকটাই কমে যাবে এবং স্টেস রেসপন্স ইতিহাচক হবে বলে আশা করা যায়।

লেখক:যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী  কলামিস্ট, লেখক, সাংবাদিক  ও  সমাজকর্মী  

আরও পড়ুন