অতুলনীয়া

আবদুল্লাহ আরমান

তরুণ প্রজন্মের নিকট হাঁটু গেড়ে প্রেম নিবেদন বর্তমানে ভালোবাসার অভিব্যক্তি প্রকাশের সবচেয়ে রোমান্টিক পদ্ধতি। হাতে গোলাপ কিংবা আংটি নিয়ে “Will you marry me?” বলার দৃশ্য বর্তমান সমাজে বেশ পরিচিত ঘটনা।

যদিও ঐতিহাসিকভাবে দেবতা, নেতা বা সম্ভ্রান্ত নারীর সামনে বশ্যতা, আনুগত্য ও সম্মান প্রদর্শনে এভাবে বসার সাথে খৃষ্টীয় সংস্কৃতির যোগসূত্র আছে বলে অনেকেই মনে করেন।

আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ) ও একবার তাঁর স্ত্রী সাফিয়্যাহ (রাঃ)’র জন্য হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন। তবে তা তথাকথিত প্রেম নিবেদনের জন্য নয়, তিনি বসেছিলেন স্ত্রীর প্রতি দায়িত্বশীলতা,ভালোবাসা ও মর্যাদা রক্ষার অংশ হিসেবে।

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, “একবার দেখলাম সাফিয়্যা রাঃ (রাসূলের স্ত্রী) উটে ওঠার চেষ্টা করছেন। তা দেখে রাসূল সাঃ নিজের গাউন দিয়ে তাকে ঢেকে দিলেন (যাতে ওঠার সময় সতর উন্মুক্ত না হয়), তারপর উটের সামনে হাঁটু গেড়ে বসলেন যেন তাঁর হাটুর ওপর পা রেখে উটে উঠতে পারেন!!” (বুখারীঃ ২৮৯৩, মুসলিমঃ ১৩৬৫)। হাদীসটা দেখতে সাধাসিধে ঘটনা মনে হলেও এতে সুগভীর ভাবনার খোরাক রয়েছে।

মুহাম্মাদ সাঃ শুধু সর্বকালের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবীই নন; তিনি একাধারে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, মানবকূল শিরোমণি ও তাদের উভয় জগতের নেতা, বিশ্বনবী, পরিপূর্ণ চরিত্র ও আদর্শের ধারক ও বাহক, অদ্বিতীয় রাষ্ট্রনেতা, রহমাতুল্লিল আ’লামীন, অপরাজেয় সমরনায়ক, মন মাতানো সৌন্দর্য ও সর্বাগ্রগণ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী, এগুলো ছাড়াও তার শ্রেষ্ঠত্বের বহু দিক রয়েছে। তার উপমা তিনি নিজেই।

স্বয়ং আল্লাহ যার চারিত্রিক সনদ দিয়ে বলেনঃ
لَقَدۡ کَانَ لَکُمۡ فِیۡ رَسُوۡلِ اللّٰہِ اُسۡوَۃٌ حَسَنَۃٌ
ভাবার্থঃ অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ (সূরা আহযাবঃ ২১)

এত্তো মর্যাদার অধিকারী হয়েও তিনি এক নারীর জন্য ধূলা ও কঙ্করময় জমিনে হাঁটু গেড়ে বসেছিলেন। সেই মহীয়সী নারীও বিনা দ্বিধায় ‘বিশ্বনবী’র হাঁটুতে পা রেখে উটে চড়লেন, এটা কি সাধারণ কোনো দৃশ্য?

হ্যা, এটি অতি সাধারণ দৃশ্য কেননা সাফিয়্যাহ (রাঃ) এই মর্যাদার উপযুক্ত ছিলেন। কারণ মুহাম্মাদ (সাঃ) যেমন বিশ্বনবী, সাফিয়্যাহ (রাঃ)ও তেমনি “বিশ্বনবীর সহধর্মিণী”। তাঁর স্বামী যেমন রাষ্ট্রপ্রধান ও শ্রেষ্ঠ মানব তিনিও তেমনি “ফার্স্ট লেডী” (প্রচলিত অর্থে) ও “শ্রেষ্ঠ মানবের সহধর্মিণী”।

সবচেয়ে বড় কথা তাঁর স্বামী যত বড় ব্যক্তিত্বের অধিকারীই হোন না কেনো সবকিছুর উর্ধ্বে উঠে দাম্পত্য জীবনের সঙ্গী হিসেবে সাফিয়্যাহ (রাঃ)’র নিকট বিশ্বনবীর একমাত্র পরিচয় হলো তিনি তাঁর ‘স্বামী’। নবী হিসেবে নয় স্বামী হিসেবে তাঁর নিকট এতোটুকু মর্যাদা তিনি পেতেই পারেন।

ভালোবাসার বাহুডোরে বেঁধে একজন আদর্শ স্ত্রী তাঁর স্বামীর নিকট ধীরে ধীরে “অতুলনীয়া” হয়ে ওঠে। স্ত্রী যখন অতুলনীয়া হয় তখন বোধসম্পন্ন যে কোন মুসলিম পুরুষ তার ভালোবাসার মূল্য দিতে কার্পণ্যতা করে না। কারণ স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা তাঁর নিকট শুধু কর্তব্যই নয় এটা সুন্নাত ও ইবাদতও বটে। মুখে ভালোবাসি না বললেও অগোচরে তার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠিত হয় না। এই বৈশিষ্ট্য প্রায় প্রতিটি পুরুষের রক্তেই মিশে আছে।

একজন “অতুলনীয়ার” দায়িত্ব হলো ভালোবাসা দিয়ে পুরুষের সেই সুপ্ত বৈশিষ্ট্যকে জাগ্রত করে নিজের মর্যাদা ও অধিকার আদায় করা, যেমনটি করেছিলেন উম্মুল মু’মিনীন সাফিয়্যাহ (রাঃ)। বিনিময়ে ‘বিশ্বনবীর’ কাছ থেকে পেয়েছেন এই সুমহান মর্যাদা।

ইসলামের কনসেপ্ট হলো স্ত্রী তার স্বামীকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসিয়ে জীবন সাথী হিসেবে নিজেও তাঁর পাশে বসবে, স্বামীকে মুকুটবিহীন রাজা বানিয়ে নিজে তার রাণী হয়ে সিংহাসনের পাশে জায়গা করে নেবে। কারণ স্বামীর শ্রেষ্ঠত্ব মানেই স্ত্রীর শ্রেষ্ঠত্ব, স্বামীর মর্যাদা তো তাঁরই মর্যাদা। নারীদের এই ছোট্ট উপলব্ধিটুকু সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

আরও পড়ুন