আমাদের সালাতের প্রতি উদাসীনতা বনাম সাহাবাগণের সালাতে সিরিয়াসনেস (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

।। জামান শামস ।।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ মুজাহিদদের যুদ্ধের ময়দানে অব্যাহত তীর নিক্ষেপের সময়ও সালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। জীবনের সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল মুহূর্তও সালাত ছাড়ার কোন সূযোগ নেই।ছাড় তো তিনি দিয়েছেন- সফরের সময় সালাত সংক্ষিপ্ত করা,দু’ ওয়াক্ত জোহর আসর,মাগরিব ঈশা জমা করে একত্রে পড়া,মহিলাগণের মাসিক অসুখের সময় সালাত মওকুফ করা ইত্যাদি। এমনই যুদ্ধক্ষেত্রে কিভাবে সালাত আদায় করতে হবে তা আল্লাহ নিজেই স্থির করে দিয়েছেন। আর আমি আপনি জীবনের সুখকর অবস্থায় কোন কারণ ছাড়াই সালাত ছেড়ে দিচ্ছি !!

 

আল্লাহ তা’আলা কুরআনে কারীমে বলেন-
‎وَاِذَا کُنۡتَ فِیۡہِمۡ فَاَقَمۡتَ لَہُمُ الصَّلٰوۃَ فَلۡتَقُمۡ طَآئِفَۃٌ مِّنۡہُمۡ مَّعَکَ وَلۡیَاۡخُذُوۡۤا اَسۡلِحَتَہُمۡ ۟ فَاِذَا سَجَدُوۡا فَلۡیَکُوۡنُوۡا مِنۡ وَّرَآئِکُمۡ ۪ وَلۡتَاۡتِ طَآئِفَۃٌ اُخۡرٰی لَمۡ یُصَلُّوۡا فَلۡیُصَلُّوۡا مَعَکَ وَلۡیَاۡخُذُوۡا حِذۡرَہُمۡ وَاَسۡلِحَتَہُمۡ ۚ وَدَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَوۡ تَغۡفُلُوۡنَ عَنۡ اَسۡلِحَتِکُمۡ وَاَمۡتِعَتِکُمۡ فَیَمِیۡلُوۡنَ عَلَیۡکُمۡ مَّیۡلَۃً وَّاحِدَۃً ؕ وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡکُمۡ اِنۡ کَانَ بِکُمۡ اَذًی مِّنۡ مَّطَرٍ اَوۡ کُنۡتُمۡ مَّرۡضٰۤی اَنۡ تَضَعُوۡۤا اَسۡلِحَتَکُمۡ ۚ وَخُذُوۡا حِذۡرَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ اَعَدَّ لِلۡکٰفِرِیۡنَ عَذَابًا مُّہِیۡنًا
এবং (হে নবী! ) তুমি যখন তাদের মধ্যে উপস্থিত থাক ও তাদের নামায পড়াও তখন, (শত্রুর সাথে মুকাবিলার সময় তার নিয়ম এই যে, ) মুসলিমদের একটি দল তোমার সাথে দাঁড়াবে এবং নিজেদের অস্ত্র সাথে রাখবে। অতঃপর তারা যখন সিজদা করে নেবে, তখন তারা তোমাদের পিছনে চলে যাবে এবং অন্য দল, যারা এখনও নামায পড়েনি, সামনে এসে যাবে এবং তারা তোমার সাথে নামায পড়বে। তারাও নিজেদের আত্মরক্ষার উপকরণ ও অস্ত্র সাথে রাখবে। কাফিরগণ কামনা করে, তোমরা যেন তোমাদের অস্ত্রশস্ত্র ও আসবাবপত্র সম্বন্ধে অসতর্ক হও, যাতে তারা অতর্কিতে তোমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। যদি বৃষ্টির কারণে তোমাদের কষ্ট হয় অথবা তোমরা পীড়িত থাক, তবে নিজেদের অস্ত্র রেখে দিলেও তোমাদের কোনও শুনাহ নেই; কিন্তু আত্মত্মরক্ষার সামগ্রী সাথে রাখবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।
(আন নিসা,আয়াত ১০২)

 

আপনি যদি তাদেরকে জামাআতে নামায পড়াতে চান, আর তখন যদি এ আশঙ্কা হয় যে, সকলে একত্রে জামাতে নামায আদায় করলে কোন শত্রু সুযোগ পেয়ে হয়ত আক্রমণ করে বসতে পারে । তখন এই প্রক্রিয়ায় নামায একদল, একদল করে পড়বে ।

 

এক যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরছিলেন নবী সা.। সঙ্গে সাহাবীরা। পথে এক পাহাড়ি অঞ্চলে সন্ধ্যা হলো। রাত কাটানো সিদ্ধান্ত নিলেন এখানেই। পাহাড়ের কাছেই সমতল জায়গায় তাঁবু খাটানোর নির্দেশ দিলেন। সব আয়োজন সম্পন্ন হলে তিনি সাহাবাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাফেলা ও সৈন্যদলের পাহারায় কাকে দায়িত্ব দেয়া যায়?’ শুনে একজন মুহাজির ও এক আনসার সাহাবী উঠে বললেন, ‘এ দায়িত্ব আজকের রাতের জন্য আমাদের দিন।’ মহানবী সা. সন্তুষ্টচিত্তে তাদের আবেদন মঞ্জুর করলেন। তাদের নির্দেশ দিলেন, ‘পাহাড়ের ওই এলাকা দিয়ে শত্রু আসার ভয় রয়েছে, ওখানে গিয়ে তোমরা পাহারা দাও।’ মুহাজির সাহাবীর নাম আবদুল্লাহ ইবন বাশার রা. আর আনসার সাহাবীর নাম ছিল উমার ইবন ইয়াসির রা.।
মহানবী সা. এর নির্দেশ মতো তাঁরা পাহাড়ের নির্দিষ্ট জায়গায় চলে গেলেন। তারপর আনসার মুহাজির সাহাবীকে বললেন, ‘আমরা দু’জন এক সঙ্গে না জেগে বরং পালা করে পাহারা দেই। রাতের দুই ভাগ করে একাংশ তুমি জাগবে, অপর অংশে জাগব আমি। এতে করে দু’জন একসঙ্গে ঘুমিয়ে পরার ভয় থাকবে না।’ এই চুক্তি অনুসারে রাতের প্রথম অংশে আবদুল্লাহ ইবন বাশার রা. ঘুমালেন। আর পাহারায় বসলেন উমার ইবন ইয়াসির রা.। পাশে আবদুল্লাহ রা. ঘুমাচ্ছেন। ইয়াসির রা. বসে ছিলেন পাহারায়।
শুধু শুধু বসে বসে আর কতক্ষণ সময় কাটানো যায়। অলসভাবে সময় কাটাতে ভালো লাগছিল না তাঁর। কাজেই ওযু করে নামাজে দাঁড়ালেন। এমন সময় পাহাড়ের ওপাশ থেকে আসা শত্রুদের মধ্যে একজনের নজরে পড়ে গেলেন তিনি। এক ব্যক্তিকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আর কেউ আছে কিনা তা পরখ করার জন্য সাহাবীকে লক্ষ্য করে তীর ছুড়লো। পরপর দু’টি তীর গিয়ে তাঁর পাশে পড়ল। কিন্তু ইয়াসির রা. অচল অবিচল রইলেন। তৃতীয় তীর গিয়ে ইয়াসির রা. এর পায়ে বিদ্ধ হলো। তিনি তবুও নড়লেন না। এভাবে কয়েকটি তীর পরপর তাঁর গায়ে গিয়ে বিঁধল।

 

ইয়াসির রা. তীরগুলো গা থেকে খুলে ফেলে রুকু সিজদাহসহ নামাজ শেষ করলেন। তারপর আবদুল্লাহ রা. কে ডেকে তুললেন। ডাক শুনে দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন তিনি। দূরে পাহাড়ে এ পাশে দাঁড়ানো শত্রু একজনের স্থলে দুজনকে দেখে মনে করল, নিশ্চয়ই আরও লোক পাহারায় আছে। এই ভেবে আর সামনে বাড়তে সাহস পেলো না। পালিয়ে গেল। আবদুল্লাহ রা. জেগে উঠে ইয়াসির রা. এর রক্তাক্ত দেহের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কেন তুমি আমাকে আগেই জাগাওনি?’ উমার ইবনে ইয়াসির রা. বললেন, ‘আমি নামাজে সুরা কাহাফ পড়ছিলাম। সুরাটা শেষ না করে রুকু দিতে মন চাইছিল না। কিন্তু ভাবলাম যদি তীর খেয়ে মরে যাই, তাহলে আদিষ্ট পাহারার দায়িত্ব পালন করা হবে না। তাই তাড়াতাড়ি রুকু সিজদাহ করে নামায শেষ করেছি। এ ভয় না থাকলে মরে গেলেও সুরা খতম না করে আমি রুকুতে যেতাম না।’

 

প্রিয় বন্ধুগণ ! আল্লাহর সমশ্ত বন্দেগীর বিধান আসমান থেকে নবী সা. এর মাধ্যমে আসমান থেকে জমিনে নাযিল হয়েছে আর সালাত মিরাজ রজনীতে নবী সা. কে আল্লাহ তা’আলা জমিন থেকে আরশে আযীমে ডেকে নিয়ে হাদিয়া দিয়েছেন। ইবনু তাইমিয়া রাহ. বলেন,আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় হাবীবের আলাপচারিতাই হলো সালাতের শেষ বৈঠকের আত্তাহিয়্যাতু।আহা ! যদি আমরা বুঝে পড়তাম ! এর পরেও সর্বাধিকবার ওহী সহকারে সালাতের প্রসংগ এসেছে।

 

নবী সা. এর কয়েকটি হাদীস মন দিয়ে পড়ুন-সালাত না পড়ার পরিনতি সম্পর্কে
১.আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক লোক এসে বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমি ‘হাদ্দ’যোগ্য-এর কাজ (অপরাধ) করে ফেলেছি। আমার ওপর তা প্রয়োগ করুন। বর্ণনাকারী বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অপরাধ সম্পর্কে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। বরং সালাতের ওয়াক্ত হয়ে গেলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করলেন। লোকটিও রসূলের সাথে সালাত আদায় করলো। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সালাত শেষ করলে লোকটি দাঁড়িয়ে বললো, হে আল্লাহর রসূল! আমি হাদ্দ-এর কাজ করেছি। আমার ওপর আল্লাহর কিতাবের নির্দিষ্ট হাদ্দ জারী করুন। উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি কি আমাদের সাথে সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করনি। লোকটি বলল, হ্যাঁ, করেছি। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, (এ সালাতের মাধ্যমে) আল্লাহ তোমার গুনাহ বা হাদ্দ মাফ করে দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী ৬৮২৩, মুসলিম ২৭৬৪)

 

২.আবদুল্লাহ (রাঃ)] ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন্ কাজ (‘আমল) আল্লাহর কাছে বেশী প্রিয়? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, সঠিক সময়ে সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) আদায় করা। আমি বললাম, এরপর কোন্ কাজ? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করা। আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, এরপর কোন্ কাজ? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। রাবী [ইবনু মাস্‘ঊদ (রাঃ)] বলেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে এসব উত্তর দিলেন। আমি যদি আরও জিজ্ঞেস করতাম, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে আরও কথা বলতেন। ( সহীহ বুখারী ৫২৭, মুসলিম ৮৫, নাসায়ী ৬১০, আহমাদ ৩৮৯০, ইরওয়া ১১৯৮, সহীহ আত্ তারগীব ৩৯৭)

 

৩.উবাদাহ্ ইবনুস্ সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত (সালাত/নামায/নামাজ), যা আল্লাহ তা‘আলা (বান্দার জন্য) ফরয করেছেন। যে ব্যক্তি এ সালাতের জন্য ভালোভাবে উযূ (ওযু/ওজু/অজু) করবে, সঠিক সময়ে আদায় করবে এবং এর রুকূ‘ ও খুশুকে পরিপূর্ণরূপে করবে, তার জন্য আল্লাহর ওয়া‘দা রয়েছে যে, তিনি তাকে ক্ষমা করে দিবেন। আর যে তা না করবে, তার জন্য আল্লাহর ওয়া‘দা নেই। ইচ্ছা করলে তিনি ক্ষমা করে দিতে পারেন আর ইচ্ছা করলে শাস্তিও দিতে পারেন। ( আহমাদ ২২৭০৪, আবূ দাঊদ ৪২৫, মালিক ১৪, নাসায়ী ৪৬১, সহীহ আত্ তারগীব ৩৭০)

 

৪.বুরায়দাহ্ (রাঃ)হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমাদের ও তাদের (মুনাফিক্বদের) মধ্যে যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা হলো সালাত। অতএব যে সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) পরিত্যাগ করবে, সে (প্রকাশ্যে) কুফরী করলো (অর্থাৎ- কাফির হয়ে যাবে)। (তিরমিযী ২৬২১ , নাসায়ী ৪৬৩ ও ইবনু মাজাহ্ ১০৭৯)

 

৫.আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর ইবনুল ‘আস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সালাত (সালাত/নামায/নামাজ) সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে বললেনঃ যে ব্যক্তি সালাতের হিফাযাত করবে, তা কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন তার জন্য জ্যোতি, দলীল ও মুক্তির উপায় হবে। আর যে ব্যক্তি সালাতের হিফাযাত করবে না, তার জন্য এটা জ্যোতি, দলীল ও মুক্তির কারণ হবে না। কিয়ামতের (কিয়ামতের) দিন সে ক্বারূন, ফির্‘আওন, হামান ও উবাই বিন খালাফ-এর সাথে থাকবে।(আহমাদ ৬৫৪০, দারিমী ২৭২১, আত্ তারগীব ৩১২, বায়হাক্বী- শু‘আবুল ঈমান ২৫৬তে ।আল্লাহ আমাদের ফরজ সালাত আদায়ে আরো মনোযোগী করুন।আমিন।
লেখকঃ সাবেক অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড 
আরও পড়ুন