আল কুরআনের ভাষায় সওম ও রমাদন (পর্ব-১)

মুনতাসির মামুন

রমাদন মাসের কথা আল কুরআনে এসেছে সূরা আল বাকারাতে। তাই রমাদন, রোযা, আল কুরআন এর মূল থীম বুঝতে আমাদের সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো ভালভাবে বোঝা দরকার। এ ছাড়া বেসিক বিষয়গুলো ক্লিয়ার হবে না। মূলত Nouman Ali Khan এর লেকচার/তাফসীরগুলো থেকেই এই নোট এর বেশিরভাগ বিষয় নেয়া হয়েছে। পড়ার পর নিচে দেয়া লিঙ্কে গিয়ে ভিডিও দেখে নিলে এবং সাথে এই নোটটি রাখলে আরো ক্লিয়ার হবে ইনশা আল্লাহ। কারণ অনেক কিছুই এখানে লেখা সম্ভব হয়নাই। এই লেখাটির পিডিএফ এর লিঙ্ক নিচে দেয়া হলোঃ

সূরা বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে রোযা ফরয করার কথা বলা হয়েছে। এই রোযা আগের উম্মতদের জন্যও ফরয ছিল। রোযার উদ্দেশ্য হিসাবে তাকওয়া (আল্লাহর ভয়ের মাধ্যমে নিজেকে সুরক্ষিত/নিরাপদ রাখা) অর্জনের আশা এর কথা বলা হয়েছে।

এই রোযা পূর্ববর্তীদের উপরও ফরয ছিলো। এই সূরা আল বাকারার আগের অংশে পূর্ববর্তি বনী ইসরাঈলদের কথা বলা হয়েছে এবং তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতির মূল কারন হিসাবে এই তাকওয়ার অভাবের কথাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাই এই রোযা আমাদের উপরও ফরয করা হয়েছে যাতে করে আশা করা যায় যে, আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারি।

নিচের ছবির সাহায্যে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এখানে ছবিতে দেখা যাচ্ছে একজন একটা ঢাল (রোযা হলো মানুষের জন্য ঢালসরুপ) কে ধরার/অর্জন করার জন্য চেষ্টা করছে। আল্লাহ নিশ্চয়তা দেন নাই যে, রোযা রাখলে তাকওয়া অর্জিত হবেই হবে। সমূহ সম্ভাবনার কথা বলেছেন আল্লাহ। তাই বান্দাহ এর উচিৎ চেষ্টা করা।

এই তাকওয়া কিভাবে রোযার মাধ্যমে অর্জিত হবে তা বোঝার সহায়তার জন্য শরীর ও মন এর কিছু সম্পর্কও বোঝা দরকার।

আমাদের আছে দুই রকম সত্তা। দেহ এবং হৃদয়। এগুলো কখনো এক সাথে কাজ করে আবার কখনও কখনও প্রতিপক্ষ হয়ে যায়। দেহ চায় আল্লাহর আদেশ না মেনে রোযার সময়েও খাবার খেতে ও পান করতে কারন এর শক্তি, বৃদ্ধির জন্য এগুলো দরকার। কিন্তু হৃদয় এ থাকে তাকওয়া (আল্লাহর ভয়), যা দেহকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা থেকে বাঁধা দেয়। এর ফলে দেহ ও হৃদয় এর মধ্যে কন্ট্রোল প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ চলতে থাকে। হৃদয়ে ‘তাকওয়া’ থাকার কারনে তা দেহকে কন্ট্রোল করে ও ইফতার পর্যন্ত দেহকে বিরত রাখে।

এভাবে সারা বছর তাকওয়ার সাহায্যে হৃদয়ের মাধ্যমে দেহকে ও দেহের সবচাইতে প্রয়োজনীয় বস্তুকে কন্ট্রোলে রাখার ট্রেনিং দেয় রোযা।

দেহের আরেকটি বড় ও মৌলিক চাহিদা হলো জৈবিক চাহিদা। দম্পতিদের বিশেষ করে নব দম্পতিদের জৈবিক চাহিদা থেকে দূরে থাকা একটি কষ্টকর ব্যপার। দেহ চায় উপভোগ করতে কিন্তু হৃদয় বাঁধা দেয়, দেহকে সতর্ক করে বলে, রোযা অবস্থায় করা যাবে না ।

দেহ প্রলুব্ধ হতে চায় কিন্তু রোযাদার এর হৃদয়ে তাকওয়া (আল্লাহর ভয়) থাকায় তা দেহকে বিরত রাখে। হৃদয়ে ‘তাকওয়া’ থাকার কারনে অবিবাহিতদের ক্ষেত্রে তা চোখসহ অন্যান্য অংগ এবং পুরা দেহকে বিরত রাখে। এভাবে দেহকে ও আবেগকে কন্ট্রোলে রাখার মাধ্যমে নিজের উপর পুরা কন্ট্রোল নেয়ার ট্রেনিং দেয় রোযা। এভাবেই রোযার সময় অর্থাৎ ১ মাস ট্রেনিংকালীন সময়ে তো বটেই এর পরে অন্য ১১ মাসের যে কোন সময়ে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার (তাকওয়া অর্জনের) শিক্ষা দেয় রোযা।

 

এভাবে ১ মাস না খেয়ে থাকার ফলে দেহ শক্তি কম পেয়ে দূর্বল হতে থাকে এবং হৃদয়ের উপর জয়ী হতে পারার শক্তি হারাতে থাকে। হৃদয়ে তাকওয়ার স্থান পাকাপোক্ত হতে থাকে। এভাবে রোযা ঢাল স্বরূপ (আল হাদীস)। রোযা তাকওয়া অর্জনে সহায়তা করে যা শয়তান ও অন্যান্য শত্রু হতে নিরাপদ রাখে। এর দ্বারা আক্রমন হতে রক্ষা পাওয়া যায়। রো্যা থাকা অবস্থায় সবচেয়ে ইররেজিস্টেবল বৈধ চাহিদাগুলোও যখন নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় তখন আশা করা যায় যে রমজানের পরে অবৈধ বিষয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

 

সূরা আল বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে মুহাম্মাদ (স) এর আগের নবীদের আমলের রোযার কথা বলা হয়েছে। এজন্য ১৮৪ নং আয়াতে ‘আইয়ামাম মা’দুদাত’ বলা হয়েছে যা ৩ দিন বা দশ দিনের কম দিন বোঝায়। আগের নবীদের উম্মতদের রোযা ভাঙার ফিদিয়ায় ২ টি অপশন রেখেছেন। অপশন ১: রোযা রাখা ও অপশন ২: মিসকিনের খাবার দান। তবে রোযা রাখতে পারলে সেটা বেশি ভাল একথাও আল্লাহ জানিয়ে দিলেন।

১৮৫ নং আয়াতে রোযার কথা একটু স্থগিত রেখে শুরুতে আল কুরআন অবতরনের কথা বললেন। রমাদন মাস, যে মাসে আল কুরআন নাযিল করা হয়েছে। রমাদান মাস যে মাসে রোযা রাখতে হবে, এইকথা না বলে আগে আল কুরআন নাযিলের কথা বলে আল্লাহ বোঝালেন এই কুরআন কত গুরুত্বপূর্ন যে সেটা রো্যার উপরও প্রভাব ফেলে একেও মহিমান্বিত করে ফেলেছে!

রোযার মূল উদ্দেশ্য ও রমাদন মাসের মূল উদ্দেশ্য এক নয়। এই কুরআন এর পরিচয়য় আল্লাহ দিচ্ছেন এভাবে যে, এটা পুরা মানবজাতির জন্য পথের দিশা।

এখানে আল কুরআন নাযিলের ব্যাপারে আল্লাহ ‘উনঝিলা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এর অর্থ একবার নাযিল হওয়া। এটি ঐ সময়ে ৭ম আসমান হতে ১ম আসমানে নাযিল হয়। অন্য জায়গায় (৩য় সূরা আলে ইমরান এর ৩ নং আয়াতে) এসেছে ‘নাঝঝালা’ অর্থ বার বার নাযিল হওয়া, এটি দ্বারা মুহাম্মাদ (স) এর উপর ২৩ বছরে ধাপে ধাপে আল কুরআন নাযিল হওয়ার বিষয়টি এসেছে।

রমাদন মাস-এ আল কুরআন নাযিল হয়েছে বিধায় এটি বছরের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মাস। কদরের রাত অন্যান্য সকল রাত এর চাইতে মহিমান্বিত কারন এই রাতেই আল কুরআন নাযিল হয়েছে। আল কুরআন ওহী আকারে বহন করে নিয়ে এসেছেন বলেই জীবরাঈল (আঃ) সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতা; আল কুরআন মুহাম্মাদ (সঃ) এর উপর নাযিল হয়েছে বলেই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। সুতরাং আল কুরআন পরশ-পাথরের মত। যে/যা কিছুই এর সাথে সম্পর্কযুক্ত হয় সেই/তাই শ্রেষ্ঠ হয়ে যায়। সুতরাং আসুন আমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত হতে আল কুরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলি। কারন আমাদের পথপ্রদর্শক মুহাম্মাদ (স) বলেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়” (-বুখারী)। এই কুরআনকে সাথে নিয়ে আমরা সকল মানুষের জন্য (হুদাল্লিন নাস) কাজ করি।

 

 

(চলবে)

লেখকঃ বুয়েটের প্রাক্তন ছাত্র, ইঞ্জিনিয়ার, কলাম লেখক ও সমাজকর্মী

আরও পড়ুন