ইসলামী পোষাক (৩)

ফাহমিদা নীলা

কথা বলছিলাম, ইসলামে পর্দা বিষয়ে। পর্দা বলতে প্রচলিত অর্থে আমরা পোষাকী পর্দাকেই বুঝি। এখন পোষাকী পর্দার কথা বলতে গেলে আসলে কিছুটা দ্বিধাগ্রস্থতা তৈরী হয়। কারণ এ নিয়ে ইসলামী স্কলারদের মধ্যেও কিছুটা দ্বিমত রয়েছে। সে প্রসঙ্গে পরে আসব। পোষাকের ব্যাপারে বেসিক যে বিষয়গুলো কোরআন এবং হাদিসের আলোকে প্রমাণিত, সেই বিষয়গুলো নিয়েই আগে বলি।

পোষাকের কিছু সাধারণ শর্ত রয়েছে নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে। সেগুলো কিছু পয়েন্ট আকারে বর্ণনা করছি-

১) স্বতন্ত্র অঙ্গ ব্যতীত সমস্ত শরীর ঢেকে রাখতে হবে।

এক্ষেত্রে নারীর মুখমন্ডল ও দু’হাতের কব্জি ব্যতীত সমস্ত শরীর ঢাকা অবশ্য কর্তব্য। পুরুষের নাভীর ওপর থেকে হাঁটুর নিচে এবং টাখনুর ওপর পর্যন্ত ঢাকতে হবে। পুরুষের হাটুর ওপরে এবং টাখনুর নিচে কাপড় পরা কবিরা গুনাহ ।

মহান আল্লাহ্ তায়ালা পবিত্র কোরআনে সূরা নূরের ৩১ নং আয়াতে বর্ণনা করেছেন,

‘হে নবী! ঈমানদার নারীদের বলুন,তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণভাবে প্রকাশমান তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুস্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, অধিকারভুক্ত দাসী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও বালক, যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ, তাদের ব্যতীত কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন সাজসজ্জা প্রকাশের জন্য জোরে পদচারনা না করে। হে মু’মিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো যেন তোমরা সফলকাম হও।’

(২) এমন পোশাক পরিধান করা যাবে না, যা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যৌন আবেদন সৃষ্টি করে বা বিকৃত চিন্তার জন্ম দেয়।

(৩) পরিহিত পোষাক পুরু হতে হবে। অর্থাৎ, পোশাক এমন পাতলা বা স্বচ্ছ্ব হওয়া যাবেনা যাতে কাপড় পরা সত্বেও ওপর দিয়ে ভেতরের চামড়া নজরে আসে।

(৪) পোশাক ঢিলেঢালা এবং মার্জিত হওয়া আবশ্যক। আঁট-সাঁট বা সংকীর্ণ পোষাক পরা যাবেনা যাতে দেহের গঠন বোঝা যায় ।

(৫) পোশাক যেন কোন অবিশ্বাসী বা কাফেরদের পোষাক সাদৃশ্য না হয়।

রাসূল (সা.) এ ব্যাপারে বলেন,

‘যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন (পোশাকে, চাল-চলনে অনুকরণ) করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত।’ (আবূ দাউদ, মিশকাত: ৪৩৪৭)

(৬) পোশাকটি যেন বিপরীত লিঙ্গের পোশাকের অনুরূপ না হয়। অর্থাৎ, কোন পুরুষ মহিলাদের সাদৃশ্য পোষাক পরতে পারবে না এবং কোন নারী পুরুষ সাদৃশ্য পোষাক পরতে পারবে না।

মহানবী (সা.) সেই সমস্ত নারীদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন, যারা পুরুষদের বেশ ধারণ করে এবং সেই সমস্ত পুরুষদেরকেও অভিশাপ দিয়েছেন, যারা নারীদের বেশ ধারণ করে। (আবূ দাউদ: ৪০৯৭, ইবনে মাজাহ: ১৯০৪)

(৭) পোশাক যেন এমন জাঁকজমকপূর্ণ বা প্রসিদ্ধ না হয় যা পরিধান করলে সাধারণত পরিধানকারীর মনে অহংকারের সৃষ্টি হয়।

মহানবী (সা.) বলেন- ‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে প্রসিদ্ধিজনক পোশাক পরবে, আল্লাহ্ তাকে কিয়ামতের দিন লাঞ্ছনার পোশাক পরাবেন। (আহমাদ, আবূ দাউদ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত: ৪৩৪৬)

(৮) পোষাক সুঘ্রাণ সুগন্ধি যুক্ত হওয়া যাবে না,যা অন্য মানুষকে আকৃষ্ট করে।

(৯) কোন সাজ-সজ্জায় সজ্জিত হওয়া যাবে না, যা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে।

(১০) নারীদের মুখমন্ডল প্রদর্শন করা যাবে কি না, এ সম্পর্কে দুই ধরনের মতবাদ আছে। কোন কোন স্কলারদের মতে মুখমন্ডল প্রদর্শন করা যাবে না,ঢেকে রাখতে হবে। আবার কারো কারো মতে, মুখমন্ডল প্রদর্শন করলে পাপ হবে না। তবে চেহারা যেহেতু সৌন্দর্যের কেন্দ্রবিন্দু, কাজেই ঢেকে রাখা উত্তম। তবে এখন যে পদ্ধতিতে মুখ ঢাকা হয়, এ ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই। মাথার কাপড় নীচের দিকে টেনে নিয়ে মুখ ঢাকার কথা বলা আছে। যা আমাদের রাসূল(স:) এর স্ত্রীগণ করে থাকতেন। বর্তমান সময়ে সেভাবে চলাফেরা করা অসম্ভব বললেই চলে। আর তাই পর্দার সুবিধার্থে বর্তমান মুখ ঢাকার প্রচলন শুরু হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে সূরা আহযাবের ৫৯নং আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন,

‘হে নাবী! আপনি আপনার পত্নী ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ বুকের উপর টেনে আনেন। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে কেউ উত্যক্ত করতে পারবে না। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’

এই আয়াত পর্যালোচনা করলে বোঝা যায় যে, মাথার কাপড় টেনে লম্বা ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢেকে রাখার কথা বলা হয়েছে মুসলিম নারীদের। তবে আরও অন্যান্য কিছু হাদিস থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে এমনও মনে হয় যে, ঐ সময়ও মহিলারা মুখ খোলা রাখতেন। এ নিয়ে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। অনেক ইসলামী চিন্তাবিদগণের মতে, একাডেমিক বা প্রফেশনাল কারণে মুখমন্ডল খোলা রাখা যাবে। এতে পাপ হবে না। বা কোন মহিলা যদি মুখমন্ডল ঢাকতে না চান, তবে তাদের স্বামীরা তাদের জোর করতে পারবে না। তবে একথা সকলের নিকট স্বীকার্য যে, মুখমন্ডল ঢেকে রাখতে পারলে তা উত্তম ।

(চলবে)

আগের পর্ব-ইসলামী পোষাক (২)

লেখকঃ সাহিত্যিক ও চিকিৎসক

আরও পড়ুন