ইসলামে নারী অধিকারঃ বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা

সাজেদা হোমায়রা

খুব কষ্টের সাথে বলতে হচ্ছে….আজ আমরা এমন একটি সমাজে বাস করছি…যেখানে ইসলাম নারীদের যে ন্যায্য অধিকারগুলো দিয়েছে, সেগুলো থেকে তাকে বঞ্চিত করা হচ্ছে!
ইভেন অনেক ইসলাম প্র্যাকটিসিং পরিবারগুলোতেও মেয়েরা তাদের ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না!

এমন একটি সমাজে আমরা বাস করছি যে সমাজ এখনো বিশ্বাস করে ‘স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর জান্নাত’ টাইপের ভুয়া হাদীস… এবং মেয়েদের পায়ের নীচেই দাবিয়ে রাখে!

খুব জোর দিয়ে বলতে পারি…ইসলাম নারীকে ন্যায্য অধিকার দিয়েছে! ন্যায্য মর্যাদা দিয়েছে!

কোনো সন্দেহ নেই, ইসলাম খুব শক্তিশালী একটা বেইজের উপর দাঁড়িয়ে আছে!

ইসলাম পূর্ব যুগে মেয়েদেরকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। মেয়ে সন্তান জন্মানো ছিলো সেখানে অভিশাপ ও অপমানের বিষয়। কিন্তু ইসলাম কন্যা সন্তানের জন্মকে বলেছে ‘সুসংবাদ’ এবং ঘোষণা দিয়েছে, মেয়েদের সযত্নে লালন পালন করা পিতামাতা যাবে জান্নাতে।

ইসলাম মেয়েদেরকে এতো মর্যাদা দেয়ার কারণেই ইসলামের প্রথম যুগে নারীরা স্কলার হয়ে উঠেছিলো।

বাংলাদেশে এমন কয়টা পরিবার আছে যে পরপর ২/৩ টা মেয়ে জন্মালেও হীনমন্যতায় ভুগে না?

হ্যাঁ, এখনও এ সমাজে মেয়ে শিশু জন্ম নিলে পরিবার হীনমন্যতায় ভুগে ও দুঃখ পায়। পরপর দুটি ছেলে জন্মালে পরিবার অতটা অখুশী হয় না, যতোটা হয় পরপর দুটি মেয়ে জন্মালে।

আজো আমাদের সমাজে নারীরা পিছিয়ে আছে কারণ তার স্বামী ইসলাম প্রেমী হলেও তাকে একাডেমিক/ ইসলামী শিক্ষার কোনো সুযোগ করে দেয় না।

অনেক সময় ইসলাম প্রাকটিসিং পুরুষকেও জিজ্ঞেস করলে দেখা যায়, তারা তাদের স্ত্রীর মোহরানা দেননি। অথচ এই মোহরানা নারীর প্রতি সম্মান দেখানোর জন্যই প্রণিত হয়েছে।

পারিবারিক সম্পত্তি থেকে বোনদের বঞ্চিত করা এখন খুব কমন একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশে কয়টা পরিবার সম্পত্তি বন্টনে ইসলামী উত্তরাধিকার আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করছে?
অথচ ইসলামে মেয়েদের উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির পূর্ণ নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। বাবা-মা এবং স্বামী উভয় দিক থেকেই।

এ সমাজে এখনো যৌতুকের মাধ্যমে মেয়ে কেনা বেচা হয়! অথচ ইসলামে যৌতুক গ্রহণ সম্পূর্ণ হারাম।

ইসলাম নারীকে স্বাধীনতা দিয়েছে বলেই ইসলামী যুগে নারীরা রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তৃতাতেও প্রতিবাদ করেছিলেন।
একবার উমারের (রা.) শাসনামলে খলিফা তাঁর বক্তৃতায় মহিলাদের মোহরানা ফিক্সড করে দিতে চেয়ছিলেন। তখনই সাথে সাথে এক মহিলা কুরআনের যুক্তি দিয়ে খলিফার এ কথার বিরোধিতা করেন। শেষ পর্যন্ত খলিফা তার সিদ্ধান্ত উড্রো করে নেন এবং মহিলাটির বক্তব্যকে সঠিক বলে মন্তব্য করেন।

ইসলাম নারীকে স্বাধীনতা দিয়েছে বলেই বিয়েতে নারীর মতামত নেয়াকে আবশ্যক করে দিয়েছে। ইসলামে মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বিয়ে দেয়া যাবে না।

ইসলাম নারীকে স্বাধীনতা দিয়েছে বলেই স্বামীর সাথে এ্যাডজাস্টমেন্ট না হলে নিজের উদ্যোগে সে ডিভোর্স চাইতে পারে।

রাসূলের (সা.) যুগে পরিবারে নির্যাতিত/অবহেলিত নারীরা নির্দ্বিধায় রাসূল সা. এর কাছে এসে অভিযোগ করতে পেরেছেন – ‘সংসারে তাকে তার প্রাপ্য হক দেয়া হয়নি’ বা ‘তার স্বামীকে তার পছন্দ নয়’।

সেক্ষত্রে রাসূল সা. তাদের আলাদা হয়ে যেতে বলেছেন এবং সেক্ষেত্রে ডিভোর্সী নারীর সম্মান একটুও কমেনি।

অথচ আমাদের সমাজে ডিভোর্সীদের দেখা হয় ভিন্ন চোখে! এমনভাবে তাকে দেখা হয়, যেন সে একটা জঘন্য পাপ করে ফেলেছে।

অনেক ক্ষেত্রে হাসবেন্ড ওয়াইফের মধ্যে মানসিকতার মিল নাও হতে পারে এবং কনজুগাল লাইফ দূর্বিসহ হয়ে উঠতে পারে। কেউ যদি এই দূর্বিসহ জীবন থেকে বেরিয়ে এসে ভালো থাকতে চায়, এতে ইসলামের কোনো বাধা নেই।

মেধা, যোগ্যতা ও প্রতিভা নারী-পুরুষ উভয়েরই রয়েছে। নারীকে যদি তার মেধা ও যোগ্যতা ব্যবহার করার সুযোগ করে দেয়া যায়, সে পারবে এবং পেরেছেও। কিন্তু বর্তমান সমাজ ব্যবস্হায় নারীকে বাইরে কাজ করতে গিয়ে এমন অনেক হয়রানির সম্মুখীন হতে হয় যে শেষ পর্যন্ত তার জীবনটাই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যায়। এটা আমাদের সমাজেরই ব্যর্থতা! আমাদের সমাজ মেয়েদের মেধা বিকশিত হবার সুযোগ করে দিতে পারেনি!

রাসূল সা. নারীদের সৃজনশীল চিন্তা চেতনায় ও শিক্ষা গবেষণায় সুদক্ষ করার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্হাও নিয়েছিলেন। নির্দিষ্ট দিনে তিনি তাদের বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা ও উপদেশ দিতেন।

ইসলামের প্রথম যুগে মেয়েদের যোগ্যতা ও মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হতো।

হুদাইবিয়ার সংকট মোকাবিলায় রাসূল সা. তাঁর স্ত্রী উম্মে সালমা রা. এর পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।

মহিলা সাহাবী শিফা রা. এর যোগ্যতার কারণে উমার রা. তাঁকে মদীনার মার্কেট নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এটি অনেক বড় একটি পদ/দায়িত্ব ছিলো। শিফা রা. এর কাজ ছিলো, বাজারে কেনা বেচার ক্ষেত্রে শরিয়াহ মেইনটেইন হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা। শিফা রা. বাজার ঘুরে দেখতেন এবং সেখানকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে খলিফাকে রিপোর্ট করতেন।

অবশ্যই সেসময়ের পরিবেশটাও মেয়েদের কাজের উপযোগী ছিলো এবং সেখানে মেয়েরা যথেষ্ট নিরাপদ ছিলো। ফলে মেয়েরাও তাদের মেধা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে পেরেছিলো।

উমার রা. শিফা (রা.)কে তার মেধা ও যোগ্যতার কারণে বিশেষ মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন।

এভাবেই সে যুগে মেয়েদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হয়েছিলো ।

কিন্তু আমাদের আজকের সমাজে মেয়েদের মেধা ও যোগ্যতা কতোটুকুইবা মূল্যায়িত হচ্ছে? পরিবার বা সমাজ কোনো জায়গাই কি তারা যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছে?
আর তাদের কাজের জায়গাইবা কতোটুকু নিরাপদ?

ইসলাম নারীকে যে অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছে তা অনুধাবন এবং বাস্তবায়ন আজ খুব প্রয়োজন পরিবারে ও সমাজে….

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

( লেখাটি উইমেন এক্সপ্রেস ব্লগে লেখকের ব্যক্তিগত ব্লগে পূর্ব প্রকাশিত )

 

আরও পড়ুন