কর্মমুখী ও সুখী জীবনের পাথেয়

ইব্রাহীম নাজ

কথায় আছে- সুস্থ দেহ প্রশান্ত মন, কর্মব্যস্ত সুখী জীবন। এই জীবনকে কিভাবে কর্মমুখী করবেন এবং কিভাবে সুখী করবেন? কর্মের মাধ্যমেই মানুষের পরিণতি নির্ধারিত হয়। দুনিয়া ও আখেরাতের সুখ-শান্তি সফলতা-ব্যর্থতা কর্মের ওপরই নির্ভরশীল। সৎ কর্মশীলদের জীবন হয় আলোকিত ও সফল। পক্ষান্তরে অলস ও অসৎ কর্মশীলদের জীবন হয় অন্ধকারাচ্ছন্ন ও ব্যর্থ। পার্থিব জীবনের উন্নতি ও পারলৌকিক কল্যাণ কামনায় কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই ইসলাম কাজের প্রতি সীমাহীন গুরুত্বারোপ করেছে এবং কর্মহীন অলস জীবনযাপনকে পাপ বলে গণ্য করেছে। কর্মক্ষেত্র ও সংসার একসঙ্গে সামলানো সহজ কথা নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দুই ক্ষেত্র একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে নিজের প্রোডাক্টিভ লাইফ অনেকাংশেই বেসামাল হয়ে যাচ্ছে মানুষের।

ঈমানদার মুসলমান ও মুসলিমাহ হতে গেলে সকলের আগে নিজের লাইফস্টাইলটা নির্দিষ্ট একটা রুটিনে বেঁধে ফেলতে হবে। রুটিন থেকে আসে ভাল অভ্যাস, ভাল অভ্যাস থেকে আসে কার্যকরী জীবনযাত্রা। আর সে অভ্যাস তৈরি করার তিনটে পদ্ধতি রয়েছে-

১. উৎসাহ বা ট্রিগারঃ

এমন কিছু যা আপনার অভ্যাসটি শুরু হতে সাহায্য করবে। কোনও সময়, যেমন খুব সকালে ওঠা। আজানের শব্দ, কুরআনের বাণী, যেকোনও একটা অনুভূতি যা আপনাকে মনে করাবে যে জীবন সুন্দর করতে গেলে একটা অভ্যাস প্রয়োজন।

২. রুটিনঃ

ট্রিগার ফলো করতে শুরু করলে আস্তে-আস্তে আসবে রুটিন। ফজরের নামাজ পড়া হতে পারে আপনার দিনের শুরু রুটিন। রুটিন মানে, আপনি জানেন আপনাকে সারাদিনে ঠিক কী কী করতে হবে।

৩. পুরস্কারঃ

অভ্যাসের শেষ হয় পুরস্কারে। এই যে সকাল সকাল উঠে ফজরের নমাজ পড়লে আপনার মনটা সারাদিন অদ্ভুত শান্ত থাকে, এটাই পুরস্কার। ওয়ার্ক-ফ্যামিলির ভারসাম্য বজায় থাকায় আপনার মনে যে তৃপ্তি থাকবে, সেটাই অভ্যাসের পুরস্কার। এইভাবে আস্তে-আস্তে তৈরি হবে এক কর্মঠ মুসলমানের জীবন। যেকোনও কাজই হোক না কেন, প্রকৃত মুসলমান নিজের সেরাটুকু দিয়ে সেটা পালন করবে। নিজেকে ভেঙে চুরে নিয়ে যাবে উন্নতির শিখরে। সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য, সৎ কর্ম, সৎ অভ্যাস সমস্তকিছুই প্রয়োজন জীবনযাপনের উন্নতির জন্য।

একজন সৎ মুসলমানের জীবনযাপনের উল্লেখযোগ্য তিনখানা অঙ্গ হল-

 ১। জীবনের আন্তরিক উদ্দেশ্যঃ

একজন মানুষের জীবনের ভিত হল তার উদ্দেশ্য। তার দৈনন্দিন কাজকর্ম থেকে ইবাদত পর্যন্ত সবকিছুই উদ্দেশ্যের তারে বাঁধা। উদ্দেশ্য থেকেই আসে কর্ম। হজরত মহম্মদ (সাঃ) বলেছেন, ‘কর্ম সাধিত হয় একমাত্র উদ্দেশ্যের দ্বারা। যে মানুষের উদ্দেশ্য যেমন সেই মানুষ তেমন পুরস্কারের যোগ্য।‘ (বুখারি, মুসলিম) আমাদের দ্বীন সবসময় সৎ উদ্দেশ্যসাধনে জোর দেন। আল্লাহ আমাদের হৃদয়ের কথা জানেন, তাই আমাদের আর কেউ ভুল বুঝলেও আল্লাহ আমাদের কখনোই ভুল বুঝবে না। আল্লাহ রয়েছে বলেই আমাদের মানসিক শান্তি রয়েছে। শুধু এটুকু খেয়াল করা উচিৎ , আমাদের উদ্দেশ্যসাধনে যেন দুনিয়া ও আখিরাতে উন্নতি হয়।

২। কর্মযোগঃ

শুধু উদ্দেশ্য থাকলেই হবে না। সময় থাকতে তার সাধনা না করলে উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যায়। আল্লাহ চান আমরা আমাদের হৃদয়ের উদ্দেশ্যকে কর্মযোগে বদলে ফেলি। পরিশ্রম করতে মুসলমানরা কখনও ভয় পায় না। হেরে যেতেও ভয় পায় না। একবার যখন উদ্দেশ্য স্থির হয়ে গিয়েছে তখন শত বাধা-বিপত্তিতেও কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে বারবার। ধরে নেওয়া যাক, আপনি সুস্থ সুগঠিত শরীর চান। এইটা আপনার উদ্দেশ্য, অতএব, রোজ জিমে গিয়ে ব্যায়াম না করলে আপনার উদ্দেশ্যসাধন হবে না। তাই, জিমে যাওয়া আপনার কর্মযোগ। সৎ পথে কঠিন পরিশ্রম করলে আল্লাহ আপনার উন্নতির পথে সুগম করে দেবেন।

৩। দোয়া ও প্রার্থনাঃ

একজন প্রকৃত মুসলমানের জীবন আল্লাহর দান। তাই জীবনের প্রতি পদক্ষেপে আল্লাহর নাম নেবেন। প্রার্থনা করবেন আল্লাহ যেন কখনও আপনাকে ত্যাগ না করেন। অন্যের মঙ্গলের জন্য দোয়া করবেন। এই দোয়া ও প্রার্থনা আপনাকে আল্লাহের আরেকটু কাছের মানুষ করে তুলবে। যখন সবকিছু ব্যর্থ হয়ে যায় তখন দোয়াই আমাদের শক্তি যোগায়। তাই, প্রার্থনা হোক আপনার শক্তি, আল্লাহর দ্বারে হোক আপনার আশ্রয়। পবিত্র কোরআন শরীফে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, আর আমার বান্দারা যখন আমার সম্বন্ধে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন তুমি বল, আমি তো কাছেই আছি। যখন কোন প্রার্থনাকারী আমাকে ডাকে, তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিই। (আল-কোরআন, ২:১৮৬) আল্লাহর ভরসা, প্রার্থনার শক্তি আর নিজের উদ্দেশ্যসাধনের ইচ্ছা… এই তিনে মিলে তৈরি হয় একজন কর্মঠ মুসলমান। তাই, নিজেদের জীবন গড়ে তুলতে এই পদক্ষেপ একান্তই নেওয়া উচিৎ। শান্তিপূর্ণ কর্মদ্যোত জীবনই একজন প্রকৃত মুসলমানের কাম্য।

লেখকঃ কলামিস্ট

আরও পড়ুন