কুমিল্লায় নূরজাহান বাঈজীর মসজিদ

মোঃ ইব্রাহীম খলিলঃ
——————————————
কিছুদিন আগে কুমিল্লা গোমতী নদীর ধারে বেড়াতে গিয়েছিলাম , অনেকদিন  ঐখানে যাওয়া  হয়না।গোমতী নদীর উত্তরপাড় হয়ে চারদিকের নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করছি দুইজনে। নদীর পাড়ের গ্রামগুলো দূর থেকে দেখতে খুব মনোরম লাগছিলো , পাড়ের উপর মেঠো পথে চলছি , হঠাৎ আমার সাথের ছোট ভাইটি বললো তার প্রসাব পেয়েছে , তাকে বললাম ঝোপ ঝাড়ে গিয়ে সেরে আসতে।
সে লজ্জা পাচ্ছে , আশে পাশের রাস্তা দিয়ে মানুষ চলছে , সে সাহস ও পাচ্ছে না। মোটকথা হল সে ইজি ফিল করছে না , সে তাতে অভ্যস্ত নয়। তাই আমরা মসজিদের খোঁজ করতে লাগলাম , পাড় থেকে নেমে একটা গ্রামে ঢুকে গেলাম , একজন কৃষক কিংবা রাখাল তার গরু বাছুর নিয়ে চলছে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম এইখানের মসজিদটি কোথায় , সে বললো কোন মসজিদ – বাইজি মসজিদ।
হোয়াট ?
বাইজি মসজিদ মানে ? বাঈজীদের আবার মসজিদ আছে নাকি।
পাশে একজন ব্যক্তি , পাঞ্জাবি টুপি পড়া , পাশে হেঁটে যাচ্ছে তাকে বললাম , নামাজ পড়ার মসজিদ কোথায় , সে বললো আসেন আমার সাথে। মসজিদে যাওয়ার পথে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, বাইজি মসজিদের মানেটা কি ? সে বললো বহু বছর আগের একজন বাইজি ছিল ত্রিপুরার রাজার সে এই মসজিদ নির্মাণ করে , কিন্তু এই মসজিদে কখনো আজান কিংবা নামাজ পড়া হয় নাই। তাকে বললাম – সেখানে পৌঁছতে হলে কিভাবে যেতে হবে , সে বললো অমুক রাস্তা ধরে গন্তব্যে পৌঁছলেই পাবেন , কথা বলতে বলতে আমরা মসজিদে পৌঁছলাম , তাকে কৃতজ্ঞতা জানালাম , সালাম দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলাম। ছোটভাই তার কর্ম সম্পাদন করলে , তাকে বাইজি মসজিদে ঘুরতে যাওয়ার কথা বলতেই , সে রাজি হল না। কারণ পড়ন্ত বিকাল , শহর আমাদের থেকে অনেক দূরে। সেখান থেকে বাসায় (শহরে ) পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ও হয়ে যেতে পারে। কিন্তু আমার পীড়াপীড়িতে সে যেতে রাজি হল। যাওয়ার পথে কিছু পুরানো দিনের মন্দির পড়েছে , যাদের চারপাশে বিশাল ঝোপঝাড় , এইসব মন্দির আর ঝোপঝাড়ে কত কিসিমের সাপ কিলবিল করছে কে জানে ?
আমাদের গন্তৰে পৌঁছলাম যখন প্রায় অন্ধকার শুরু হইছে। দেখলাম ঝোপ ঝাড় , শেওলা পরিপূর্ণ একটা শত বছরের পুরান দিনের স্থাপনা। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়া , বেশিক্ষন থাকা হয় নাই , বাসায় এসে এই সম্পর্কে ইন্টারনেট এ জানার চেষ্টা করলাম , ইউটুবে দেশের পথে নামে একটা চ্যানেল এ কুমিল্লা এপিসোড এ এই সম্পর্কে জানতে পারলাম।
বহু বছর আগে , আনুমানিক ১৭৭০ সালে কুমিল্লা ছিল ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত। ঠিক সেইসময় গোমতী নদীর গা ঘেঁষে একটা গ্রাম , নাম তার মাঝিগাছা , মাঝিগাছা গ্রামে নুরজাহান ও তার ছোট দু বোন মোগরজান ও ফুলজানরা বসবাস করতেন।
খুব সম্ভব ১৭৭০ সালে দুর্ভিরে সময় কিশোরী নুরজাহানকে সাপে কামড়ালে তাকে ভেলায় করে গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। ত্রিপুরার মহারাজার দরবারে নিয়ে চিকিতসায় সুস্থ করে তুলে। ধীরে ধীরে মেনেকা তাকে নাচ-গান শিখিয়ে মহারাজার দরবারে সেরা বাঈজিতে পরিণত করে। প্রায় ৩৫ বছর রাজা মহারাজাদের দরবারে নর্তকী হিসেবে থাকার পর মধ্য বয়সেই নর্তকী নুজাহান রাজদরবার ছেড়ে নিজ গ্রাম মাঝিগাছায় আসেন। এ সময় ত্রিপুরার মহারাজা বাঈজি নুরজাহানকে মাঝিগাছায় কয়েক একর জমি ও প্রচুর অর্থ, স্বর্ণালংকার দান করেন। নুরজাহান নিজেকে এক জমিদারের বিধবা স্ত্রী পরিচয়ে মাঝিগাছায় বসবাস শুরু করে। তখন প্রায়ই নুরজাহান তার ছোট দু বোনকে খুঁজতে বেরুতো। গ্রামের মানুষদের নানা রকম সাহায্য সহযোগিতা করতেন।
এক সময় বাঈজি নুরজাহান তার অতীত কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য এক মাওলানার শরণাপন্ন হলে মাওলানা নুরজাহানকে নিজ খরচে এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণ করতে বলেন। মাওলানার পরামর্শ মতে বাঈজি নুরজাহান এলাকায় মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। স্থানীয় গণ্যমান্য লোকজন এ কাজে এগিয়ে আসেন। নুরজাহানের পুরো আর্থিক যোগানে মসজিদ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। নুরজাহান যে মাওলানার পরামর্শে মসজিদ নির্মাণ করেছেন সেই মাওলানা কে গ্রামবাসীদের সঙ্গে বসে মসজিদে নামাজ পড়ার দিন তারিখ ধার্য করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। একদিন মাওলানা সাহেব গ্রামবাসীদের সঙ্গে এক সভায় এসে অতি উতসাহী হয়ে নুরজাহানের জীবন কাহিনী বলে দিলে নুরজাহানের বাঈজি পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যায় এবং তা পুরো গ্রামে জানাজানি হয়। ঐ দিনই সভায় সিদ্ধান্ত হয় নর্তকী নুরজাহানের অর্থে নির্মিত মসজিদে কেউ নামাজ পড়বে না। এটি বাইজি মসজিদ। এই মসজিদে নামাজ পড়া জায়েজ না। সেই সিদ্ধান্তের পর থেকেই ঐ মসজিদে কোনদিন আজান হয়নি। কেউ নামাজ পড়েনি। এ ঘটনার পর বাঈজি নুরজাহান আক্ষেভে দুঃখে নিজ গৃহে একাকীত্ব জীবন কাটিয়েছেন বেশ কয়েক বছর। অনেকের মতে, গ্রামের মানুষের ওই আচরণে আঘাত পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে অন্যত্র চলে গেছে। আবার কারো মতে, গ্রামের মানুষের অপবাদ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে এবং তার নির্মিত মসজিদের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়েছে। সম্ভবত সেই থেকেই মসজিদের পশ্চিম দিকের কিছু অংশ বর্তমানেও কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে চান্দপুর এলাকা অতিক্রম করে যেতে হয় এই মসজিদে। গোমতী নদীর উত্তর পাড়ে বাঈজি মসজিদটি দু’শ বছর ধরে কালের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
আফসোস নুরজাহান যদি জানতো আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও করুনাময়। আমি অব্শ্যই তখনকার সময়কার গ্রামবাসীদের এই উদ্যোগকে সমর্থন করছি , যে সেখানে তারা নামাজ পড়ে নাই। কারণ নবী করিম (সাঃ ) যখন ছোট ছিলেন তখন কাবার সংস্কার করা হচ্ছিলো , তখনকার মূর্তিপূজক কুরাইশরা পর্যন্ত কাবা নির্মাণে যে অর্থ দরকার ছিল সেটা যে হালাল উপার্জনের হতে হবে , সে ব্যাপারে তারা খুবই সচেতন ছিল , অথচ তারা ছিল প্যাগান। মূর্তিপূজক হয়েও তাদের সে সেন্স ছিল।
তবে কুমিল্লার স্থানীয় লোকেরা সেই মসজিদকে “নডীর মসজিদ” বলেও ডাকে।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন