নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও ইসলাম

আফিফা রায়হানা

মেয়েদের নিজেদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা- কথাটার মধ্যেই কেমন জানি নারীবাদী নারীবাদী গন্ধ আছে। প্র্যাক্টিসিং মহলে বললেই বুঝি ফেমিনিষ্ট বলে দূর দূর করবে। কিন্তু কেন জানি অনেক ক্ষেত্রেই এটা ইসলামের সাথে যায়। গোটা মানবজাতির মধ্যে ওয়ান অফ দ্যা বেষ্ট হিউম্যান বিইং, যাকে নারীপুরুষ উভয়ের জন্য অনুকরণীয় (কনিতিনা) করে বানানো হয়েছে, মারিয়াম (আঃ) এর কথাই ধরি। অল্পবয়সী একটা মেয়ে, নিজের জন্য লাইফস্টাইল বেছে নিলো আল্লাহ্‌র ইবাদত করবে। তার ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে মসজিদের ভেতর একটা রুমে থাকতে দেয়া হলো। গার্ডিয়ান হিসেবে জাকারিয়া (আঃ) তার দেখাশোনা করতেন, কিন্তু জোর করে চাপিয়ে দিতেন না। জোর করা বলতে আমি বুঝাচ্ছি একটা তরুণী মেয়েকে বলতেই পারতেন, কিসের এতো ইবাদত করা লাগবে মসজিদে বসে। বিয়ে দিচ্ছি, ঘর সংসার করো বসে, মেয়েদের এতো মসজিদে যাওয়া লাগবে না। দেশী প্রেক্ষিতে চিন্তা করলাম আর কি। মারিয়াম তার নিজের ডিসিশন নিয়েছিলেন।
খাদিজা (রা)। প্রকাশ্যে এসে ব্যবসা চালাতেন কি চালাতেন না, সে তর্কে না যেয়ে আসি উনার নিজের ব্যবসা উনি নিজে কন্ট্রোল করতেন। শী ওয়াজ ইন দ্যা কন্ট্রোলিং পাওয়ার। উনি ডিসিশন নিয়েছিলেন কাকে বিয়ে করবেন। নিজের থেকে ছোট বয়সের রসুলুল্লাহ (সাঃ) কি বিয়ের প্রপোজাল পাঠিয়েছিলেন। এখনকার মতো সমাজ বলতেই পারতো কিভাবে বাচ্চাসহ ডিভোর্সী মেয়ে কমবয়সী অবিবাহিত ছেলেকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়! স্পাউজ উনি নিজেই চুজ করলেন। মককার অন্য সব সম্ভ্রান্ত লোকদের প্রপোজাল উপেক্ষা করে উঠতি ক্যারিয়ারের রসুলুল্লাহ (সাঃ) কে বিয়ে করলেন। বিয়ের পর উনার প্রপার্টি হাজব্যান্ডকে দিয়ে দিলেন, সেটার সিদ্ধান্তও তার ছিল।
নুসাইবা (রা) রসুলুল্লাহর (সাঃ) সাথে যুদ্ধ করেছেন, তার নিজের সিদ্ধান্ত ছিল। এখনকার মতো হাজব্যান্ড বলতেই পারতো কই যাও, ব্যাটাদের মাঝখানে যুদ্ধ করতে। এসব ছেলেদের কাজ। আটকে রাখতে পারতো ঘরের ভেতর। ইসলামকে ইউজ করে তা তো করা যেতই। কিন্তু উনি গেলেন। একটা দুইটা না। গোটা কতক যুদ্ধে রসুলুল্লাহ (সাঃ) কে শিল্ড করে দাঁড়ালেন। একের পর এক তীর এসে বিঁধল উনার গায়ে। এক যুদ্ধে রসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ডানে-বাঁয়ে আমি যেদিকেই তাকাই। শুধু নুসাইবাকে দেখছিলাম।

ইসলামের ইতিহাসে সিংগেল মায়েরা একা হাতে বাচ্চা বড় করেছে। বাচ্চার লাইফের সব ইম্পর্টেন্ট ডিসিশন নিজে নিয়েছেন। হাজার (আঃ) সেই মরুভূমির মধ্যে রেখে আসা একাকী যোদ্ধা। ইসমাইলকে (আঃ) বড় করেছেন। ইমাম শাফেয়ীর মা, উনাকে এখন যেমন দেখি, সেও এক একাকী মায়ের অবদান।
লিস্ট গোজ অন এন্ড অন। এখন বলবেন উনারা আল্লাহর কাছ থেকে আসা স্পেশাল। উনারা এক্সেপশনাল। বাট দে আর মেইড এজ রোল মডেলস। শুধু স্পেসিফিক কিছু বৈশিষ্ট্যই না। উনাদের পার্সোনালিটিও তো অনুসরনযোগ্য। এখন এই পার্সোনালিটি অনুসরণ করতে গেলেই তো হায় হায় রব উঠবে। একটা স্পেসিফিক বাউন্ডারীর ভেতর থেকে ছেলেদের মতো মেয়েদেরও নিজের লাইফ নিজেদের মতো চালানোর স্বাধীনতা ইসলাম মেয়েদের দিয়েছে। কিন্তু ট্র্যাডিশন, সুবিধামাফিক ইসলাম নেয়া গোটা জিনিসটাকেই কমপ্লিকেটেড করে ফেলেছে। তুমি তো ওদের মতো না- বলবে তো? যদি বলি আমি ওদের মতো হতে চাই। চাইলেই দিবে?
“ঘরে বেঁধে রেখো না, নিয়ে যাও এগিয়ে” এই জিনিস আমাদের এখন মিনা থেকে শিখতে হয়। তাও ফেমিনিজমের গন্ধমাখা। যদি বলি, সুমাইয়া (রা) গেছে, নুসাইবা (রা) গেছে, আমি যেতে ক্ষতি কি? এখন বলবে তুমি দুনিয়ার পিছনে যাবে, উনারা আখিরাতের পিছনে গেছেন, তাই তো? যদি বলি, আমি ওদের পথেই যেতে চাই, দিবেন? তখন নানান বাহানা। স্বামী-সংসার দিয়েই তো জান্নাত পাবে, তাহলে কেন বাইরে দৌড়াবে? এরপর খুশীমনে ভাববে, যাক মুখটা বন্ধ করতে পারলাম।
সবার লাইফ এক রকম হবে না। সবাই একই কোর্স অফ একশন বেছে নেবে না লাইফে। কেউ ঘরকুনো হবে, কেউ আকাশ ছুঁতে চাইবে। কিন্তু শরিয়াহ্‌র সীমারেখার ভেতরে নিজের জীবনের অনেক ডিসিশন মেয়েদের নেয়ার ক্ষমতা আল্লাহ্‌ দিয়েছেন, সেটাকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

 

আরও পড়ুন