বউ পেটানো ইসলামে নয়

নুসাইবা; ইসলামেই নারীর মুক্তি |২|

সাজিদ আব্দুল্লাহ

নুসাইবা অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। পড়ালেখায় ভালো। বক্তৃতায় পোক্ত। সুন্দর ভাষাশৈলি আর ব্যক্তিত্বে অনড়। নিজেকে সাজিয়েছে আধুনিকতার উচ্চতর আঙ্গিকে। যুক্তিতর্ক তার পছন্দের সাবজেক্ট। পছন্দও করে যুক্তিনির্ভর কথা বলতে। লেখালেখি করে বিভিন্ন ব্লগে। একজন নারীবাদী লেখিকা হওয়ার সাথে সাথে, কমিউনিজমের সাথে সম্পৃক্ত একজন মুক্তমনা নাস্তিক। নাস্তিক ধর্মে ধর্মান্ধ বলা চলে।
সেদিন শান্তি ক্লাসরুমে বসে ছিলো। কোনকিছু ভাবছিলো। হয়তো তার সামনের দিনগুলো নিয়েই। সামনে মাসে তার বিয়ে। জানা ছিলো ক্লাসের অনেকেরই। অজানা ছিলো না জান্নাতেরও। সে এটা নিয়ে মাঝে মাঝে খুঁচা দিতেও ভুলে না। খুঁচায় খুঁচায় অনেক কথাই বলে ফেলে জান্নাত। শান্তির তা পছন্দ হয় না। কিন্তু বান্ধবী দুষ্টুমি করছে ভেবে; ছেড়ে দেয়।
আজও একইরকম। শান্তির আনমনা হয়ে বসে থাকা দেখে নুসাইবার আনন্দই হলো। অনেক কথা জড়ো করে ফেললো। এমনিতেও বক্তৃতায় সে কড়ড়া লিগার। আর অন্যকে বুঝানোই মহাপণ্ডিত। তার উপর আবার ভুঁড়ি ভুঁড়ি দলিল। তাই খুশদিল খুঁচা দিতে গেলো,
—কিরে মন খারাপ?
—নারে। এমনিতেই একটু খারাপ লাগছে।
—তোর তো সামনে আরও অনেক বিপদ পেরুতে হবে!
—কেন, আমি আবার কি করলাম?
—সামনে না তোর বিয়ে! বিয়ে মানেই তো একটা পুরুষের জন্য, নিজের সব বিলিয়ে দেওয়া। স্বামীর দাসী হয়ে থাকা। যেমনটা তোদের ধর্ম বলে।
—এটা তুই কোথায় পেলি! আর বিয়ে মানে যদি হয় পুরুষের জন্য সব বিলিয়ে দেওয়া, তাহলে, বিয়ে মানে স্ত্রীর জন্যও স্বামীর সব বিলিয়ে দেওয়া। যেমন সূরা বাকারা’র ১৮৭নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘তোমরা (পুরুষরা) তাদের পরিচ্ছদ, তারা (মহিলারা) তোমাদের পরিচ্ছদ।’
অর্থাৎ স্বামী ছাড়া স্ত্রী উলঙ্গ, স্ত্রী ছাড়া স্বামী উলঙ্গ। অর্থাৎ দু’জনেরই দু’জনার। যেমনটা তোরা সিনেমা, উপন্যাস, কবিতায় বলে থাকিস।
শুধু এটাই নয়। অন্যত্র সূরা বাকারার ২২৮নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘পুরুষদের স্ত্রীদের উপর যেমন অধিকার রয়েছে,তেমনই স্ত্রীদেরও পুরুষদের উপর অধিকার রয়েছে।’ তারপরও বলবি ‘আমি দাসী হতে যাচ্ছি?’
—সেদিন এক বইয়ে পড়েছিলাম ‘কোরআন শরীফে পুরুষদের নারীদের প্রহার করার অনুমতি দিয়েছে, সীমিত অপরাধেই। এটা কিভাবে একটি ধর্মের বিধান হতে পারে? এটা তো নারীদের প্রহার করার জন্য বলছে। তোর তো বিয়ে হচ্ছে, তুই কি প্রস্তুত মার খাওয়ার জন্য?
—সে বইয়ে সূরা নিসার ৩৪নম্বর আয়াতের কথা এভাবে বলা হয়েছে ‘স্ত্রীদের মধ্যে অবাধ্যতার আশংকা করলেই তাদের প্রহার করো।’
কিন্তু মূলত কোরআনে কি বলা হয়েছে সেটাও দেখ! সেখানে বলা হয়েছে ‘পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল। কেননা আল্লাহ একের উপর অপরকে কর্তত্ব দান করেছেন এবং এজন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীগণ হয় অনুগতা। এবং আল্লাহ যা হেফাজতযোগ্য করেছেন, তা হেফাজত করে, লোকচক্ষুর আড়ালেও। এবং যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশংকা করো তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যাত্যাগ করো, প্রহার করো। যদি তারা তাতে বাধ্য হয়ে যায়— তবে তাদের জন্য অন্যপথ অনুসন্ধান করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার উপর শ্রেষ্ঠ।’
—কর্তৃত্ব কেন দিবে?
—দেখ! একটি দেশে একজন প্রেসিডেন্ট থাকে। সে সবার উপর কর্তৃত্বশীল। আর একজন মেয়র, একটি পৌরসভার সকলের উপর কর্তৃত্বশীল। এখন মনে কর, এই রুল ভেঙে যদি আমরা সবাই প্রেসিডেন্ট হই, তাহলে কি দেশে শান্তি থাকবে? কক্ষনও না। সেজন্য দেশের সকলের মাঝ থেকে একজনকে প্রেসিডেন্ট বানানো হয়। পৌরসভার সকলের মাঝ থেকে একজনকে মেয়র নির্বাচিত করা হয়। এটা কি অযৌক্তিক?
—না।
—আচ্ছা। ঠিক তেমনই একটি পরিবার। যদি স্বামী স্ত্রী সবাই গৃহপ্রধান হয়, তাহলে কি ঘরে শান্তি থাকবে? ভুলেও না। সেজন্য একজনকে গৃহপ্রধান নির্ধারণ করা হয়েছে।
—পুরুষকেই কেন, সেটা তো একজনই নারীকেও করতে পারতো! পুরুষকেই কেন?
—একজন পুরুষ প্রকৃতিগত শক্তিশালী হয়। এর অহরহ প্রমাণ আছে। এটা তোরও অজানা না। মানসিকভাবেও। তাহলে গৃহপ্রধান হওয়ার যোগ্যতা কার বেশি?
—আমিও যদি ইনকাম করি তাহলে কি আমিই প্রধান?
—আচ্ছা নুসাইবা মনে কর! তুই আর তোর স্বামী একসাথে শষ্যক্ষেত করলি, সকালে বের হলি রাতে ফিরলি। রান্না হয়নি। কাজেই তো ব্যস্ত সারাদিন। রান্নার সুযোগই বা কই! বাচ্চারা সকাল থেকে না খেয়ে আছে। গোসল হয়নি। ঘর বিশ্রী হয়ে আছে। সারাদিন কাজ করে এসব তখন করার পরিস্থিতি না থাকবে তোর; না থাকবে তোর স্বামীর। তখন তোর বাচ্চারা না খেয়ে মরবে। তুইও। তোর স্বামীও। এজন্য আল্লাহ তা’আলা সকলের জন্য একটি নিয়ম করে দিলেন। যেমন ‘সূর্য আলো দেয়, পৃথিবী তা থেকে আলো নেয়।’ দু’জনই এককাজ করে না। যদি পৃথিবীও আলো দিতো তাহলে বসবাস উপযোগী হতো না পৃথিবী।
ঠিক সেরকমই নারীদের দিয়েছেন ঘরের কাজ, বাচ্চাদের দেখে রাখতে। রান্না বান্না করতে। আর পুরুষদের দিয়েছেন, নিজের এবং তার আগে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে।

পুরুষ পরিবারের সকলের খাদ্য, পোষাকের ব্যবস্থা করবে, আর স্ত্রীগণ তা ব্যবহার করবে। এবং তাদের সন্তানকে বড় করে তুলবে। আর একটি দেশের নিরাপত্তার জন্য যেমন প্রধানের আনুগত্য করা লাগে, তেমনই পরিবারের শান্তির জন্য পারিবারিক প্রধানের আনুগত্য করা। এটাই।
—আচ্ছা ঠিক আছে এটা বুঝলাম। কিন্তু অবাধ্যতার আশংকা করলেই প্রহার করার কথাটা কি নারীর অধিকার হরণ না?
—তুই যে আয়াতের কথা বলছিস সেই আয়াতের তরজমা হলো ‘যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশংকা করো তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যাত্যাগ করো, প্রহার করো।’ এই আয়াতের তাফসির এভাবে করা হয়েছে ‘প্রথমে তাদের সদুপদেশ দাও, তা কাজ না হলে শয্যাত্যাগ করো, তাতেও যদি কাজ না হয় তাহলে মৃদু প্রহার করো।
—কিন্তু আয়াতে তো সেরকম কিছু বলা হয়নি। আমি জেনেছি এটা ভুল ব্যাখ্যা।
—আচ্ছা বল! আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাকিস্তানি লেখকদের বই থেকে পড়ি, তাহলে কি আমরা মুক্তিযুদ্ধের মূল ইতিহাস পাবো?
—না। তার সাথে এর কি সম্পর্ক?
—ঠিক। তাহলে মূল ইতিহাস জানার জন্য বাংলাদেশী লেখকদের বইই পড়তে হবে। ঠিক সেরকমই কোরআন বুঝতে হলে তাদের কথা চলবে না। কারণ তারা কোরআন বিরোধী। এখন তুই কোরআন বুঝবি, সেটা তোর বুঝতে হবে ‘যেভাবে বুঝিয়েছেন এই গ্রন্থ যার উপর অবতীর্ণ হয়েছে সেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুযায়ী।’ অন্যথায় সেটার অপব্যাখ্যাই পাবি। সে হিসেবে আমাদের কোরআনের বিষয়ে সেই মতটাই ধরে নিতে হবে, যা তিনি বুঝিয়েছেন। এবং বোখারী শরীফেও এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে মৃদু প্রহার বলেই। বিয়ে অধ্যায়ে দেখে নিস সময় করে।
—তিনিই নাকি ‘বউ পেটাতেন?’ আয়েশার বুকে মেরেছিলেন?
—সহীহ মুসলিম শরিফের এই হাদীসে বলা হয়েছে ‘আয়েশা রাদিআল্লাহ আনহা বলেছেন’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে একটা থাপ্পড় মারলেন যাতে আমি ব্যথা পেলাম।’ একটা থাপ্পড়, এটা বউ পেটানো! তুই আজ সারাদিন আমাকে কতগুলো থাপ্পড় মেরেছিস, তার হিসেব আছে?
—আমরা তো এমনিতেই দুষ্টুমি করে মারি।
—আচ্ছা নে আমিও মারলাম। ব্যথা লাগলো?
শান্তি নুসাইবাকে মৃদু একটা ঘুষি দিয়ে বললো।
—মারলে তো লাগবেই। আর তোর হাতের ঘুষিও চল্লিশ কেজি।
—আচ্ছা নুসাইবা! ব্যথা পেয়েছিস, তাই বলে কি ‘আমি তোকে পিটিয়েছি?’ বন্ধু হিসেবে একটু কিল ঘুসি একজন আরেকজনকে দেওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু না। এটার জন্য হাইকোর্টে কেস করতে হবে? আর তিনি ছিলেন তার স্ত্রী, অর্থাৎ সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। আবার অনেক সময় ভুল শুধরানোর জন্যও বুকে মুষ্টিবদ্ধ আঘাত করা হয়। কখনও বা ভীতি দূর করার জন্য। এটার অর্থ পেটানো না।
এখন দেখ ইসলাম স্ত্রীদের প্রহারের বিষয়ে কি বলে।
আবদুল্লাহ্ ইবনু যাম‘আহ রাদ্বি. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা কেউ নিজ স্ত্রীদেরকে গোলামের মত প্রহার করো না। কেননা, দিনের শেষে তার সঙ্গেই তো মিলিত হবে।
(বোখারী শরীফ ৫২০৪)
স্ত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহার করো। যদি তাদের কোনো কিছু অপছন্দ হয়, তাহলে জেনো রাখ! তার মধ্যে আল্লাহ তাআলা অনেক কল্যাণ রেখেছেন।
(সূরা নিসার ১৯)
এখন বল কোথায় ইসলাম ‘বউ পেটানো’র কথা বললো! বরং দেখছি নিষেধ করছে। আচ্ছা ক্লাস শেষ করি। সময় হয়ে গেছে।
—হুম।

(চলবে)

আগের পর্ব প্রদীপ্ত পথের সন্ধানে 

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন