বউ মানে দাসী আর আর পেটানো নয়

নারীমুক্তির পথ |২|
সা জি দ

জান্নাত অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। পড়ালেখায় ভালো। বক্তৃতায় শ্রেষ্ঠ। যে কারো মন কাড়তে পারে তার ভাষাশৈলী। স্টাইল আধুনিকতার উচ্চস্তরে। যুক্তিতর্কে তাকে হার মানানো প্রায় অসম্ভব। একজন নারীবাদী লেখিকা হওয়ার সাথে সাথে, কমিউনিজমের সাথে সম্পৃক্ত একজন মুক্তমনা নাস্তিক।

সেদিন শান্তি শান্ত মনে বসেছিলো ক্লাসরুমে। কোনকিছু ভাবছিলো। হয়তো তার সামনের দিনগুলো নিয়েই। সামনে মাসে তার বিয়ে। এটা জানা ছিলো ক্লাসের অনেকেরই। অজানা ছিলো না জান্নাতেরও। সে এটা নিয়ে মাঝে মাঝে খোঁচা দিতে ভুলে না। খোঁচায় খোঁচায় অনেক কথায়ই বলে ফেলে জান্নাত। শান্তির তা অশান্তিই লাগে।

আজ শান্তির আনমনা হয়ে বসে থাকা দেখে তার আনন্দই লাগলো। অনেক কথা জড়ো করে ফেলল। এমনিতেই সে বক্তৃতায় অপ্রতুল। তার উপর আবার ভুঁড়ি ভুঁড়ি দলিল। তাই খুশে মনে খোঁচা দিতে গেল,
—কিরে মন খারাপ?
—নারে। এমনিতেই খারাপ লাগছে।
—তোর তো সামনে আরো অনেক বিপদ পেরোতে হবে!
—কেন, আমি আবার কি করলাম?
—সামনে না তোর বিয়ে! বিয়ে মানেই তো একটা পুরুষের জন্য, নিজের সব বিলিয়ে দেওয়া। স্বামীর দাসী হয়ে থাকা। যেমনটা তোদের ধর্ম বলে।
—এটা তুই কোথায় পেলি! আর বিয়ে মানে যদি হয় পুরুষের জন্য সব বিলিয়ে দেওয়া, তাহলে, বিয়ে মানে একজন পুরুষের জন্যও নিজের স্ত্রীর জন্য সব বিলিয়ে দেওয়া। যেমন সূরা বাকারা’র ১৮৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘তোমরা (পুরুষরা) তাদের পরিচ্ছদ, তারা (মহিলারা) তোমাদের পরিচ্ছদ।’

বিষয়টা এমন হলো ‘তাকে ছাড়া তুই উলঙ্গ, আর তুই ছাড়া সে উলঙ্গ।’ সুতরাং ‘তার জন্য তুই, তোর জন্য সে।’ তাহলে ইসলাম বলছে ‘দু’জন দু’জনার।’ যেমনটা তোরা সিনেমা, উপন্যাস, কবিতায় বলে থাকিস। আবার অন্যত্র সূরা বাকারার ২২৮নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘পুরুষদের স্ত্রীদের উপর যেমন অধিকার রয়েছে,তেমনই স্ত্রীদেরও পুরুষদের উপর অধিকার রয়েছে।’ তারপরও বলবি ‘আমি দাসী হতে যাচ্ছি?’

—সেদিন এক বইয়ে পড়েছিলাম ‘কোরআন শরীফে পুরুষদের নারীদের প্রহার করার অনুমতি দিয়েছে, সীমিত অপরাধেই, এটা কিভাবে একটি ধর্মের বিধান হতে পারে? এটা তো নারীদের প্রহার করার জন্য বলছে। তোর তো বিয়ে হচ্ছে, তুই কি প্রস্তুত মার খাওয়ার জন্য?
—সে বইয়ে সূরা নিসার ৩৪নম্বর আয়াতের কথা এভাবে বলা হয়েছে ‘স্ত্রীদের মধ্যে অবাধ্যতার আশংকা করলেই তাদের প্রহার করো।’ কিন্তু মূলত সেখানে কি বলা হয়েছে সেটা দেখ, সেখানে বলা হয়েছে ‘পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বশীল। কেননা আল্লাহ একের উপর অপরকে কর্তত্ব দান করেছেন এবং এজন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যায় করে। সেমতে নেককার স্ত্রীগণ হয় অনুগত। এবং আল্লাহ যা হেফাজত যোগ্য করেছেন, তা হেফাজত করে, লোকচক্ষুর আড়ালেও। এবং যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশংকা করো তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যাত্যাগ করো, এবং প্রহার করো। যদি তারা তাতে বাধ্য হয়ে যায়, তবে তাদের জন্য অন্যপথ অনুসন্ধান করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার উপর শ্রেষ্ঠ।’

—কর্তৃত্ব কেন দিবে?
—দেখ, একটি দেশে একজন প্রেসিডেন্ট থাকে। সে সবার উপর কর্তৃত্বশীল। আর একজন মেয়র, একটি পৌরসভার সকলের উপর কর্তৃত্বশীল। এখন মনে কর, এই রুল ভেঙে যদি আমরা সবাই প্রেসিডেন্ট হই, তাহলে কি দেশে শান্তি থাকবে? কক্ষনও না। সেজন্য দেশের সকলের মাঝ থেকে একজনকে প্রেসিডেন্ট বানানো। পৌরসভার সকলের মাঝ থেকে একজনকে মেয়র নির্বাচিত করা। যুক্তিযুক্ত।

তেমনই একটি পরিবার। যদি স্বামী স্ত্রী সবাই গৃহপ্রধান হয়, তাহলে কি ঘরে শান্তি থাকবে? ভুলেও না। সেজন্য একজনকে গৃহপ্রধান নির্ধারণ করা হয়েছে।
—কেনো সেটা তো একজনই নারীকেও করতে পারতো!
—একজন পুরুষ প্রকৃতিগত শক্তিশালী হয়। এটা সর্বজন বিদীত। তাহলে গৃহপ্রধান হওয়ার যোগ্যতা তাদেরই বেশি।
—আমি শক্তিশালী হলে কি আমিই প্রধান?
—মনে কর, তুই আর তোর স্বামী একসাথে শষ্যক্ষেত করলি, সকালে বের হলি রাতে ফিরলি। এখনও পাক হয়নি, তোরা তো কাজই করলি সারাদিন, পাকের সময় কই! বাচ্চারা সকাল থেকে না খেয়ে আছে, গোসল করানো হয়নি, ঘর বিশ্রী হয়ে আছে। সারাদিন কাজ করে এসব তখন করার পরিস্থিতি না থাকবে তোর, না থাকবে তোর স্বামীর। তদ্দরুন তোর বাচ্চারা না খেয়ে মরবে। তুইও। তোর স্বামীও। এজন্য আল্লাহ তায়ালা সকলের জন্য একটি নিয়ম করে দিয়েছেন। যেমন ‘সূর্য আলো দেয়, পৃথিবী তা থেকে আলো নেয়।’ দু’জনই এককাজ করে না। সেরকমই নারীদের দিয়েছেন ঘরের কাজ, বাচ্চাদের দেখে রাখতে। আর পুরুষদের দিয়েছেন, নিজের এবং তার আগে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে।

পুরুষ পরিবারের সকলের খাদ্য, পোষাকের ব্যবস্থা করবে, আর স্ত্রীগণ তা ব্যবহার করবে। এবং তাদের সন্তানকে বড় করে তুলবে। আর একটি দেশের নিরাপত্তার জন্য যেমন প্রধানের আনুগত্য করা লাগে, তেমনই পরিবারের শান্তির জন্য পারিবারিক প্রধানের আনুগত্য করা।

—আচ্ছা ঠিক আছে মানলাম। কিন্তু অবাধ্যতার আশংকা করলেই প্রহার করার কথাটা কি নারীর অধিকার হরণ না?
—তুই যে আয়াতের কথা বলছিস সেই আয়াতের তরজমা হলো ‘যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশংকা করো তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যাত্যাগ করো, এবং প্রহার করো।’ এই আয়াতের তাফসির এভাবে করা হয়েছে ‘প্রথমে তাদের সদুপদেশ দাও, তা কাজ না হলে শয্যাত্যাগ করো, তাতেও যদি কাজ না হয় তাহলে মৃদু প্রহার করো।
—কিন্তু আয়াতে তো সেরকম কিছু বলা হয়নি। আমি জেনেছি এটা ভুল ব্যাখ্যা।
—আচ্ছা বল, আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাকিস্তানি লেখকের বইয়ে পড়ি, তাহলে কি আমরা মুক্তিযুদ্ধের মূল ইতিহাস পাবো?
—না। তার সাথে এর কি সম্পর্ক?
—ঠিক। তাহলে মূল ইতিহাস জানার জন্য বাংলাদেশী লেখকদের বই পড়তে হবে। ঠিক সেরকমই কোরআন বুঝতে হলে তাদের কথা চলবে না। কারণ তারা কোরআন বিরোধী। এখন তুই কোরআন বুঝবি, সেটা তোর বুঝতে হবে ‘যেভাবে বুঝিয়েছেন এই গ্রন্থ যার উপর অবতীর্ণ হয়েছে সেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুযায়ী।’ অন্যথায় সেটার অপব্যাখ্যাই পাবি। সে হিসেবে আমাদের কোরআনের বিষয়ে সেই মতটাই ধরে নিতে হবে, যা তিনি বুঝিয়েছেন। এবং সহীহ বোখারী শরীফেও বলা হয়েছে মৃদু আঘাতের কথা।
—তিনিই নাকি ‘বউ পেটাতেন?’ আয়েশার বুকে মেরেছিলেন?
—সহীহ মুসলিম শরিফের এই হাদীসে বলা হয়েছে ‘আয়েশা রাদিআল্লাহ আনহা বলেছেন’ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে একটা থাপ্পড় মারলেন যাতে আমি ব্যথা পেলাম।’ একটা থাপ্পড়, এটা বউ পিটানো! তুই আজ সারাদিন আমাকে কতগুলো থাপ্পড় মেরেছিস, তার হিসেব আছে?
—আমরা তো ফ্রেন্ডলি মারি।
—আচ্ছা নে আমি তোরে মারলাম। শান্তি জান্নাতকে মৃদু একটা থাপ্পড় দিলো।
—যা মারোস কেন?
—ব্যথা লাগে?
—মারলে তো লাগবেই।
—ব্যথা পেয়েছিস, তাই বলে কি ‘আমি তোকে বউ পিটিয়েছি?’ বন্ধু হিসেবে একটু কিল ঘুসি একজন আরেকজনকে দিবেই। এটার জন্য হাইকোর্টে কেস করা যায় নাকি! আর তিনি ছিলেন তার স্ত্রী, অর্থাৎ সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। আর দেখ! বোখারী শরীফের ৫২০৪নম্বর হাদীসে আবদুল্লাহ্ ইবনু যাম‘আহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা কেউ নিজ স্ত্রীদেরকে গোলামের মত প্রহার করো না। কেননা, দিনের শেষে তার সঙ্গেই তো মিলিত হবে।
এখন বল কোথায় ইসলাম ‘বউ পেটানো’র কথা বললো! বরং দেখছি নিষেধ করছে। আচ্ছা চল ক্লাস শেষ করি। সময় হয়ে গেছে।

আগের পর্ব-

নারীমুক্তির পথ |১|-পথের যখন শুরু

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন