মাহফুজুর রহমান আখন্দের গানে রাসূল প্রেম

মির্জা মুহাম্মদ নূরুন্নবী নূরঃ

গোটা দুনিয়া যখন আইয়ামে জাহেলিয়াতের নিকষ আঁধারের অতল গভীরে নিমজ্জিত, মানবতাবোধের বিন্দুমাত্র অবস্থান যখন আকাশ কুসুম কল্পনার মতোই অদৃশ্যমান, বিবেকবোধ বলতে কোন কিছুর উপাদান যখন কোন মানুষের মধ্যে ছিলো না বিকশিত ঠিক সেই সময় ধরাকে আলোকিত করতে, বিবেকবোধকে শানিত করে মানবতাবোধের বিকাশ সাধনে এগিয়ে এসেছিলেন যে মহামানব তিনি হচ্ছেন জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা:)। যাঁর আগমনে বিশ্বজগত হয়েছিল আলোকিত, মানুষেরা পেয়েছিল তাদের সম্মান ও প্রাপ্য মর্যাদা, অশান্ত সমাজের লোকজনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল ভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধন তাঁর শানে আল্লাহ তায়ালা নিজেই স্তুতি গেয়েছেন, প্রশংসা করেছেন আপনার করে। তাই যুগে যুগে তাঁর বড়ত্ব গেয়ে হাজার কোটি রচনা সম্ভার রচিয়েছেন অগনিত কবি সাহিত্যিকেরাও। বেহিসাব কবিতা লিখে কবিতার ডালি সাজিয়েছেন কবিরা, গীতিকারেরা লিখেছেন গান আর গায়কেরা তাতে সুর করে গেয়ে আসছেন অনন্তকাল ধরে। বিশ্বের এমন নামিদামি কবিদের কাতারে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের লিখিয়েরাও পিছিয়ে নেই। এমনই আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন লেখক হচ্ছেন ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ। যিনি একাধারে কবি, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, গবেষক, প্রাবন্ধিক, গীতিকার এবং গায়ক। দেশ, জাতি এবং বিশ্বমানবতার পাশাপাশি আল্লাহ তায়ালার প্রিয় পাত্র বিশ্বমানবতার মহান শিক্ষক হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর গুনগান গেয়েও রচিয়েছেন সাহিত্য। লিখেছেন গান, তাতে আবার সুর দিয়েছেন নিজের করে এবং নিজের কন্ঠে গেয়েছেন একান্ত আপনার করে, দরদমাখা কন্ঠের ভার বয়ে। প্রিয় কবির লেখা গানের সমাহার থেকে কয়েকটি নাতে রাসূলের আলোচনা করার প্রয়াস পাব আশাকরি।

রাসূলের আগমনে ঝঞ্জা বিক্ষুব্ধ জাহেলিয়াতের এই ধরা আলোকিত হয়েছিল। আনন্দে নেচে উঠেছিল জগতের সকল সৃষ্টি। মানুষ, পশু পাখি থেকে শুরু করে বৃক্ষলতাও। শুকনো মরা পাতা গজে উঠেছিল প্রাণবন্ত হয়ে। সবুজ পাতার ঢেউয়ের নাচনে মেঘের দেশে সরব ধ্বনির উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হয়েছিল, পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুলের হাসি আর পক্ষীকুলের ছন্দ মাখা গানে পাখনা মেলে নেচে উঠেছিল ভোমরারাও। রাসূলের আগমনে খুশবু ধ্বনির মাতোয়ারায় বন বনানী সবুজ হয়েছিল। তাই রাসূলের নামে দরুর পড়ে মানুষের পিপাসিত হৃদয় আনন্দে ভরে উঠেছিল। আনন্দের দোলায় নেচে উঠেছিল গোটা বিশ্ব। প্রকৃতির এমন একটি দৃশ্য গানে গানে ফুটিয়ে তুলেছেন আমাদের প্রিয় কবি মাহফুজুর রহমান আখন্দ ভাই। কবির ভাষায়-

শুকনো মরা ডালগুলোতে
সবুজ পাতার ঢেউ,
মেঘের দেশে সরব ধ্বনি
আসলো ধরায় কেউ।

পাতার ফাঁকে ফুলের হাসি
ছন্দ মাখা গান,
ভোমরা নাচে পাখনা মেলে
খুশির অভিধান।
বন বনানী সবুজ ঘাসে
সুবাস ছড়ায় মৌ।

রাসূল নামের খুশবু ধ্বনি
সজিব করে বন,
তাঁর নামেতে দুরুদ পড়ে
ভরাই হৃদয় মন।
আল্লাহ তায়ালার হাবীব তিনি
প্রেম সাগরের ঢেউ।
আমরা জানি রাসূল প্রেম ঈমানের পরিপূর্ণতার জন্য খুবই জরুরী। ঈমানের দাবিদার সকলের জন্যই এই প্রেম অর্জন বাধ্যতামূলক।

আমাদের প্রিয় রাসূলের জীবন চরিত্র ছিল ফুলের চেয়েও পবিত্র এবং সুমহান আদর্শে পরিপূর্ণ। এই ফুল যখন মক্কা নগরীতে ফুটে সুগন্ধের সুবাস ছড়িয়ে দিলেন, আকাশ জুড়ে তারার মেলায় ভাসিয়ে দিলেন তাঁর আলোকিত ভেলা, পাখির সুললিত কন্ঠের সুরে গেয়ে উঠলেন গান, বৃক্ষলতার সবুজাভাবে মরুর বুকে খুশির জোয়ার যেমন ভেসে ওঠে ঠিক তেমনি যেন তাঁর আগমনে ধরায় খুশির বান ডেকেছিল। আঁধারের নিকষ কালোয় যখন এই জগত ছিল আচ্ছাদিত ঠিক তখনই দ্বীনের বাতি জ্বালালেন তিনি। আলো ঝলমম বসুন্ধরা হয়ে উঠলো জাহেলিয়াতের দুনিয়া। আমাদের আজকের কবি যেন সে সময়ের চিত্র দেখেছেন পাশে থেকে, রাসূলের আদর্শে নিজেকে রাঙিয়ে। আমরা কবির নাতে রাসূলে এমনটিই অনুভব করি। কবির ভাষায়-

ফুলের মতো ফুল হতে চাই
ফুলের মতো ফুল,
যে ফুল পেলো নবীর পরশ
গন্ধ যার অতুল।

ফুটলো যে ফুল মরুর বুকে
মক্কা মদীনাতে,
মুক্তি সুবাস ছড়িয়ে দিলো
কাবার পথে পথে।
বিশ্ব মানুষ মাতোয়ারা
নেই যে তাহার তুল।

আকাশ জুড়ে তারার মেলা
পাখির কন্ঠে সুরের খেলা
বৃক্ষ তরু সালাম জানায়
বিশ্ব জুড়ে খুশির মেলা।

সকল শিশুর বন্ধু তিনি
গরীব দুখির সাথী,
দুজাহানের নেতা তিনি
আঁধার ধরায় বাতি।
চিনতে তারে বনের পশুও
করেনি তো ভুল।

কী আবেগ মাখানো কথা। কী সুরের ঝংকার গানের কথামালায়। কবির আবেগ যেন ঝরে ঝরে পড়ে গানের মালা হয়ে।

দুনিয়ার মানুষ যখন পথহারা, সুন্দরের ছোঁয়া যখন সুদূর পরাহত, আলেয়ার পিছে হতাশ ছিল যারা, ঈমানের আলো থেকে দূরে সরে পরে ঘোর অমানিশায় আমল সর্বহারা যখন বিশ্বমানবতা, ঠিক তখনই পিপাসিত হৃদয়ের দহন জ্বালা মিটাতে ঈমানের জমজমের পানি পান করালেন আমার প্রিয় রাসূল। হতাশার কোপানলে পুড়ছিলো যারা তাদের শুকনো পাতার জীবন জমিনের গাছ গাছালিতে ফাগুনের আগুন জ্বালিয়ে দিলেন। তাঁর পরশে এসে জীবনের দাম বুঝে পেলেন মানুষেরা। কবির ভাষায়-

বিশ্বজুড়ে মধুর সুরে প্রিয় নবীর নাম
যারে গেয়ে মন ভোমরা, গা রে অবিরাম।

জীবন রাহে চলতে গিয়ে
এই নামেরই মধু পিয়ে
খুশি মনে ফেলরে ও মন
বুকের যত ঘাম।

আলেয়ার পিছে হতাশ যারা
ঈমান আমল সর্বহারা
নয়ন যুগল আয়রে মেলে
পুরবে মনোস্কাম।

আয় হতাশায় আগুন জ্বালি
শুকনো শাখায় ফাগুন ঢালি
তাঁর পরশে পাবি রে তুই
এই জীবনের দাম।

সত্যিই আমরা যদি আমাদের এই জীবনের সত্যিকারের দাম পেতে চাই তাহলে রাসূলের রেখে যাওয়া জীবনাদর্শ অনুসরণ করা খুবই জরুরী। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে রাসূলের আদর্শে চলার তাওফিক দিন।

রাসূল ছিলেন চাঁদের চেয়ে সুন্দর, আকাশের চেয়ে উদার ছিল তাঁর হৃদয় জমিন এবং তাঁর চেয়ে ভালো বন্ধু জগতে আর দ্বিতীয় কেউ ছিল বলে ইতিহাস প্রমাণ করে না। পবিত্র আল কুরআনের আলোর ছোঁয়ায়, কন্ঠের মধুর কোরাস গানে দুনিয়ার সবাই মাতিয়ে উঠেছিল, জাহেলিয়াতের দুনিয়ায় দুঃখের আঁধার কেটে সবুজ বনের পাখির সুরের মাতমে বাতাসের নাচনে ফুল কাননে শুরু হয়েছিল আলোর মাতামাতি। রাসূলের পরশে মরুর বালিও ব্যাকুল হতো, যুদ্ধ খেলা নেশার যুগেও প্রেমের ফুলের ডালি ছড়াতো তাঁর পাশে। এমনই একজন প্রিয় মানুষ ছিলেন আমাদের প্রিয় নবীজী। কবি মাহফুজুর রহমান আখন্দের ভাষায়-

চাঁদের চেয়ে সুন্দর তুমি
আকাশ তোমার বুক,
বন্ধুর চেয়ে বন্ধু তুমি
তোমার পরশেই সুখ।

আঁধার ধরায় আনলে আলো
কুরআন নামের নূর,
কন্ঠে তোমার মধুর কোরাস
মুক্তি গানের সুর।
সেই সে সুরে মাতলো ধরা
কাটলো আঁধার দুঃখ।

সবুজ বনের মুক্ত পাখি
তুলছে মাতম তোমায় ডাকি
তোমার সুরে বাতাস নাচে
ফুল কাননে মাতামাতি।

তোমার পায়ের পরশ পেতে
ব্যাকুল আজও মরুর বালি,
যুদ্ধ খেলা নেশার যুগেও
প্রেম ছড়ালে ফুলের ডালি।
সেই সে সুখের ফুলেল সুবাস
চাই সে সোনার যুগ।

কবি তার গানের সুরে সুরে যে সোনার যুগের আশায় পাগলপাড়া আমরাও এমন একটি যুগের স্বপ্ন দেখি। রাসূলের সেই সোনার মদীনার সোনালী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হোক দুনিয়াময় সেই প্রত্যাশায় বুকবাধি। আশাকরি একদিন এমন একটি সমাজের বাসিন্দা হবে দুনিয়ার সকল মাজলুম মানবজাতি।

রাসূলের জমানায় গোটা দুনিয়ার বুকে ছিল জাহেলিয়াতের আঁধারের নিকষ কালোর জগত। মানুষে মানুষে চলত হানাহানি, বাদ্যের তালে তালে উকাজের মেলায় যেন মানুষের হাটে পশুদের খেলা চলত, যুদ্ধের মাতামাতিতে কালোর জগতে পরিনত হয়েছিল দুনিয়ার মাটি, সমাজের ভিত নড়েচড়ে উঠতো জাহেলিয়াতের নিকষ কালোর ছোঁয়ায়। কান্নার ঢেউ উছলে বেজে উঠতো করুণার বীণ! এমনই এক সময় পাহাড়ের কোল ঘেষে উঠে আসে নূরের ঝলকানি, মানুষের মুখে মুখে বেজে উঠে তাওহীদি সুরের মূর্ছনা, মুছে যায় হানাহানি শুরু হয় ভালোবাসার জানাজানি। তমসা পালিয়ে ধুসর বালিতে জমে পলিল মাটি। এমনই এক সময়ের চিত্র এঁকেছেন প্রিয় কবি। কবি মাহফুজুর রহমান আখন্দের ভাষায়-

আগুনের ঝড় বয় রোদেলা দুপুর
ভুট্টার খই ফোটে তপ্ত বালিতে,
বাদ্যের তালে তালে ঘুঙুর নূপুর
ধুসর বর্ণ যেন কৃষ্ণ কালিতে।

রঙিন উকাজ আর নওরোজ মেলা
মানুষের হাটে দেখি পশুদের খেলা
যুদ্ধ মদ্য নারী
শক্তির বাড়াবাড়ি
অপরাধ ছেয়ে আছে অলিতে গলিতে।

কান্নার ঢেউ ওঠে পাহাড়ের গায়
সমাজের ভিত নড়ে হালকা হাওয়ায়
নিকষ আঁধার থেকে করুণ এক বীণ
চারিদিকে তমসা রাত কিবা দিন।

পাহাড়ের কোল ঘেষে উঠে আসে নূর
মানুষের মুখে মুখে তাওহীদি সুর
মুছে গেল হানাহানি
ভালোবাসা জানাজানি
তমসা পালিয়ে গেল ধুসর বালিতে।

উকাজ আর নওরোজ মেলায় মানুষের হাটে পশুদের হানাহানির খেলা বন্ধ হোক, কান্নার ঢেউ থেমে গিয়ে হাসির ফোয়ারা প্রস্ফুটিত হোক দুনিয়ার সর্বত্র, হানাহানি বন্ধ হয়ে ভালোবাসার জানাজানিতে শুরু হোক কানাকানি, ঘোর অমানিসার কালোর জগতে হাওহীদি গানের সুর বেজে উঠুক আপনার করে সেই আশায় বুকবাধি আমিও।

আমি রাসূল প্রেমিক একজন ক্ষুধে মানুষ। রাহমাতুল্লিল আলামিন, সাইয়্যিদুল মুরসালিন, খাতামুন্নাবিয়্যুন রাসূল (সা:) হচ্ছেন প্রিয় কামলিওয়ালা। তিনি দুঃখিজনের গলের মালা, তিনি পাপিতাপি মুমিনজনদের তুলে নেবেন নিজ তরীতে। অথৈ জলের নদীতে পাপের পা আমাদের, ক্ষমার আশা ক্ষীন তবুও ভুলিনি প্রিয় নবীকে। গোলাপ, বেলী আর জুঁই চামেলীর পরশে আমরা যেমন পুলকিত হই, ভুলে যাই সকল দুঃখ জ্বালা, মরুভূমির বিরান মাঠে খুঁজে পাই ফুল কাননের সুবাসিত রূপ তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হই প্রিয় নবীর আদর্শে। নবী প্রেমের আবেগ খুঁজে পাই আমাদের কবির গানে গানে। এমনই একটি গান-

মন মদীনা কান্দে আমার হৃদয় দুয়ার খুলে
ওগো আমার পরান প্রিয়
স্বপ্নে হলেও দেখা দিও
তোমায় পেলে মনের কাবা ভরবে রঙিন ফুলে।

তুমি হাবীব সবার আপন রাহমাতাল্লিল আল আমিন
নবীর নবী সবার সেরা সাইয়্যিদুল মুরসালিন
তুমি প্রিয় কামলিওয়ালা
দুঃখি জনে সুখের মালা
আমরা পাপি উম্মত তোমার তরীতে নাও তুলে।

হাসনা হেনা গোলাপ বেলী
শিমুল পলাশ জুঁই চামেলী
ফুলের সেরা ফুল যে তুমি
তুমি বিনে মনের বাগান হয় যে মরুভূমি।

ভুলের পথে পা রেখেছি অথৈ পাপের নদী
তবু থাকি ক্ষমার আশায় তোমায় পাইগো যদি
মওলা যখন হিসেব নিবে
তোমার হাতে কাউসার দিবে
দয়ার চোখে দেখো তুমি যেওনা কো ভুলে।

আমাদের প্রিয় নবী ছিলেন দয়ার সাগর। রহমতের নবী তিনি ছিলেন নবীদের নবী। আখিরাতের কঠিন দিনে প্রতিটি নবীই নিজের জীবনের হিসেব নিয়ে ব্যস্ত থাকবেন যখন ঠিক তখনও আমাদের প্রিয় নবী ইয়া হাবলী উম্মাতী বলে কাঁদবেন আমাদের জন্য। তাঁর উম্মাতের জন্য। যে নবীর আগমনে দুনিয়ার সবাই ধন্য হয়েছিল, আঁধারের দুনিয়ার বুকে আলোকের দ্যূতির ঝলকানি ফুটে উঠেছিল আজকে আমরা তাঁকেই ভুলে গেছি অবলিলায়। আমরা যেন আমাদের হৃদয়ের সবটুকু দরদ আর ভালোবাসা দিয়ে রাসূলের পথে চলতে পারি সেজন্য প্রস্তুত হতে হবে এখনহ। রাসূলের আদর্শকে যেন আমাদের জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি সেজন্য আজই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আত্মার শিহরণের পরতে পরতে তাঁর ভালোবাসার বীজ বপন করতে হবে। রাসূলের ভালোবাসায় আমাদের জীবন গড়ে উঠুক সেই আশা রইলো।

লেখকঃ কবি, সাহিত্যিক ও বিভাগীয় প্রতিনিধি, মহীয়সী।

আরও পড়ুন