মুসলিম ভাইয়ের জন্য দোয়া করে তাকে পরে জানানো কি দোষনীয় ?

।। জামান শামস ।।

 

আমরা পরষ্পরের কাছে দোয়া চাই। কোন মুসিবতে পড়লে , কেউ অসুস্থ হলে কিংবা কারো পরীক্ষার্থী থাকলে বলি,ভাই একটু দোয়া করবেন।আমি যে ব্যক্তির জন্য গোপনে দোয়া করি তাকে যদি বলি যে, আমি তার জন্য দোয়া করছি এতে কি সওয়াব কমে যাবে? কিংবা কোন ব্যক্তি যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে যে, আপনি কি আমার জন্য দোয়া করেন? আমি যদি বলি: হ্যাঁ এবং আমিও তার কাছে দোয়া চাই? এতে কি দোয়ার সৌন্দর্য হানি হবে ?

 

শরিয়ত মুসলমানদেরকে পরস্পর পরস্পরের জন্য গোপনে দোয়া করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে।
উম্মু দারদা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমার নেতা (স্বামী) আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেছেন, مَنْ دَعَا لأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ قَالَ الْمَلَكُ الْمُوَكَّلُ بِهِ آمِينَ وَلَكَ بِمِثْلٍ যে লোক তার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দু’আ করে, তার জন্য একজন নিয়োজিত ফেরেশতা ‘আমীন’ বলতে থাকে আর বলে, তোমার জন্যও অনুরূপ। (সহীহ মুসলিম ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৬৭৯, ইসলামিক সেন্টার ৬৭৩৩)

 

কাযী ইয়ায (রহঃ) বলেন:”যে দোয়া করেছে সে অধিক পরিমাণ সওয়াব পাবে। কেননা সে অন্যের জন্য দোয়া করার মাধ্যমে দুটো নেক আমল করেছে: ১. খালিসভাবে (একনিষ্ঠভাবে) আল্লাহ্‌কে স্মরণ করা এবং মুখ ও মন দিয়ে আল্লাহ্‌র কাছে ধর্ণা দেয়া। ২. অপর মুসলিম ভাইয়ের কল্যাণ করতে পছন্দ করা ও তার জন্য দোয়া করা। এটি এমন একটি নেক আমল যার জন্য মুসলিমকে সওয়াব দেয়া হয় এবং হাদিসে পরিস্কার ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে এমন দোয়া কবুলযোগ্য।”[ইকমালুল মু’লিম ৮/২২৮ ]
এ হাদিসে এই মর্যাদা গোপনে দোয়ার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছে। তাই কোন মুসলিম যদি তার এ আমলের কথা কাউকে অবহিত করে এর ফলে কি এ ফজিলত ও সওয়াব বাতিল হয়ে যাবে? শরয়ি নীতি হল: নেক আমলগুলো বিবেচিত হয় আমলকারীর উদ্দেশ্য ও নিয়তের ভিত্তিতে।

 

আলক্বামাহ ইবনু ওয়াক্কাস আল-লায়সী (রহ.) হতে বর্ণিত। আমি ‘উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-কে মিম্বারের উপর দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছিঃ আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، কাজ (এর প্রাপ্য হবে) নিয়্যাত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়্যাত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। তাই যার হিজরাত হবে ইহকাল লাভের অথবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশে- তবে তার হিজরাত সে উদ্দেশেই হবে, যে জন্যে, সে হিজরাত করেছে।] [সহীহ বুখারী ১ ও সহীহ মুসলিম ১৯০৭]
এখন যার জন্য দোয়া করা হল তাকে অবহিত করার কয়েকটি উদ্দেশ্য হতে পারে:

 

১.যদি এ অবহিত করণের মাধ্যমে তার উপর অনুকম্পা প্রকাশ করা ও তাকে খোঁটা দেয়ার উদ্দেশ্য করা হয় তাহলে খোঁটা দেয়া একটি কবিরা গুনাহ। খোঁটা দেয়ার মাধ্যমে আমলকারীর আমল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
শাইখ উছাইমীন (রহঃ) বলেন: ইবাদতটি শেষ হয়ে যাওয়ার পর যা কিছুর উদয় হয় এটি ইবাদতের উপর কোন প্রভাব ফেলবে না। তবে ওটার মধ্যে যদি সীমালঙ্ঘন থাকে; যেমন- খোঁটা দেয়া, দান করে কষ্ট দেয়া; তাহলে এই সীমালঙ্ঘনের পাপ দানের সওয়াবের সাথে পাল্টাপাল্টি হয়ে দানকে বাতিল করে দিবে। যেহেতু আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “ওহে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা খোঁটা দেয়া ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের দানগুলোকে নষ্ট করো না।”[আল-কাওলুল মুফিদ (২/১২৬)]

 

২.আবার উদ্দেশ্য ভালো হলে হতে পারে এ অবহিতকরণ নেক আমল হিসেবে গণ্য হবে এবং এর জন্য অবহিতকারীকে সওয়াব দেয়া হবে। উদাহরণতঃ কেউ যদি জানতে চায় তখন তাকে জানানো যে, তার জন্য গোপনে দোয়া করে। এমন জানানোটা কথাবার্তায় সত্যবাদিতা ফুটিয়ে তোলার পর্যায়ভুক্ত। কিংবা যদি যার জন্য দোয়া করা হল তার প্রতি মমত্ব ফুটিয়ে তোলা ও তার মনে আনন্দ প্রবেশ করানোর জন্য হয় এবং উভয়ের মাঝে সম্পর্ক-সম্প্রীতি বৃদ্ধি করার জন্য হয়। যেমনটি হাদিসে এসেছে: “জিজ্ঞেস করা হল: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! আল্লাহ্‌র কাছে সর্বাধিক প্রিয় কে? তিনি বললেন: মানুষের সর্বাধিক উপকারী ব্যক্তি। এবং আল্লাহ্‌র কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল হচ্ছে— কোন মুমিনের অন্তরে খুশি প্রবেশ করানো।…[কাযাউল হাউয়ায়িজ (পৃষ্ঠা-৪৭), শাইখ আলবানী ‘আস্‌-সিলসিলা আস্‌-সাহিহা’ গ্রন্থে (২/৫৭৫) হাদিসটিকে ‘হাসান’ বলেছেন]

 

এ বিষয়ে খতীব আল-বাগদাদী তার ‘তারিখু বাগদাদে (৪/৩২৫) নিজের সনদে ‘খাত্তাব বিন বিশর’ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: “আমি আব্দুল্লাহর পিতা আহমাদ বিন হাম্বলকে প্রশ্ন করছিলাম আর তিনি জবাব দিচ্ছিলেন এবং শাফেয়ির ছেলের দিকে তাকিয়ে বলছিলেন: এটি আমাদেরকে আব্দুল্লাহ্‌র পিতা শিখিয়েছেন। খাত্তাব বলেন: আমি আব্দুল্লাহর পিতা আহমাদ বিন মুহাম্মদ বিন হাম্বলকে ওসমানের পিতার সাথে তার বাবার ব্যাপারে আলোচনা করতে শুনেছি। আহমাদ বলেন: আব্দুল্লাহ্‌র পিতার প্রতি আল্লাহ্‌ রহম করুন। আমি যখনই কোন নামায পড়ি পাঁচজনের জন্য দোয়া করি। তিনি পাঁচজনের একজন।”

 

এ ধরণের উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে অবহিতকরণ নিষিদ্ধ হবে না মর্মে প্রতীয়মান হয়। বরং এ উদ্দেশ্যগুলো নেক কাজ ও ভালো কাজ। এবং এটি গোপন দোয়ার সওয়াবপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোন প্রভাব ফেলবে না এবং দোয়াকারী তার ভাইয়ের জন্য যা যা দোয়া করেছে সেও তা তা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন প্রভাব ফেলবে না মর্মে প্রতীয়মান হয়।
তবে অন্যের জন্য যে দোয়া সে গোপনে করেছে তার কাছে নিজের জন্য অনুরূপ দোয়া করার অনুরোধ করা উচিত নয়। কেননা এটি নেক আমলের জন্য অন্যের কাছ থেকে এক ধরণের বিনিময় ও প্রতিদান চাওয়া হয় বরং অন্য কোন উপলক্ষ্যে দোয়া চাওয়া যেতে পারে অথবা সাধারণভাবে বলা যেতে পারে,”আমরা পরষ্টক পরষ্পরের জন্য আসুন দোয়া করি।”
এক মুসলমান অপর মুসলমান ভাইয়ের জন্য শুধু দোয়াই নয় সে তার প্রয়োজনের সময় সাহায্য করবে।আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত নবীজি সা. ইরশাদ করেছেন, “যে লোক কোন মুসলমানের দুনিয়াবী বিপদাপদের মধ্যে একটি বিপদও দূর করে দেয়, আল্লাহ তাআলা তার পরকালের বিপদাপদের কোন একটি বিপদ দূর করে দেবেন। যে লোক দুনিয়াতে অন্য কারো অভাব দূর করে দেয়, তার দুনিয়া ও আখিরাতের অসুবিধাগুলোকে আল্লাহ তাআলা সহজ করে দিবেন। যে লোক দুনিয়ায় কোনো মুসলমানের দোষক্রটিকে গোপন রাখে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষক্রটি গোপন রাখবেন। যে পর্যন্ত বান্দা তার ভাইয়ের সহযোগিতায় নিয়োজিত থাকে, সে পর্যন্ত আল্লাহ তাআলাও তাঁকে সহযোগিতা করে থাকেন।” (তিরমিজি-১৯৩০)
আরো এগিয়ে দেখুন-

 

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী, “এক মুসলমানের প্রতি অপর মুসলমানের ছয়টি কর্তব্য রয়েছে।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সেই কর্তব্যগুলো কী কী? তিনি বললেন, وَ إذَا دَعَاكَ فَأجِبْهُ، وَ إذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ، وَ إذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللهَ فَشَمِّتْهُ، وَ إذَا مَرِضَ فَعُدْهُ، وَ إذَا مَاتَ فَاتَّبِعْهُ.
(১) তার সাথে তোমার সাক্ষাত হলে সালাম দিবে।
(২) সে তোমাকে দাওয়াত করলে তার দাওয়াত গ্রহণ করবে।
(৩) সে তোমার কাছে পরামর্শ চাইলে তুমি তাকে পরামর্শ দিবে।
(৪) সে হাঁচি দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করলে তুমি তার জবাব দিবে।
(৫) সে অসুস্থ হলে তুমি তাকে দেখতে যাবে।
(৬) সে মারা গেলে তুমি তার জানাযায় ও দাফনে অংশগ্রহণ করবে।” (বুখারি ও মুসলিম)।
সুতরাং দোয়া কিংবা কল্যাণ কামনা এবং মানসিক,আর্থিক ও কায়িক সহযোগীতা যা একজন মুসলমানের উপর অপর মুসলমানের অধিকার বলে বিবেচিত সেখানে অহংবোধের স্থান কোথায় ? আর খোঁচা বা খোঁটা দেয়ার মতো নেতিবাচক বিষয়ের তো প্রশ্নই আসেনা।
আল্লাহ আমাদের তাঁর মকবুল দ্বীনের জন্য কবুল করুন। আমিন।

 

লেখকঃ সাবেক অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড

 

লেখকের আরও লেখা পড়ুন- বাংলাদেশে ঋণমান স্থিরকরনে ঋনের শ্রেনীকরন ও প্রভিশনিং ব্যবস্থা ( দ্বিতীয় পর্ব )

 

মুসলিম ভাইয়ের জন্য দোয়া – মুসলিম ভাইয়ের জন্য দোয়া – মুসলিম ভাইয়ের জন্য দোয়া – মুসলিম ভাইয়ের জন্য দোয়া

আরও পড়ুন