রমজানে মায়ের দেওয়া শিক্ষা

এইচ এম গিয়াস উদ্দিন

তখন বয়স কত হবে মনে নেই তবে ইসলামী বিধান মতে রোজা রাখার বয়স হয়েছে। গ্রীষ্মের সময়ের রোজা প্রচণ্ড গরম। মাথার উপর সূর্য যেন শরীরের সব পানি শুষে নেয়। তখনকার সময়ে ঘরে ঘরে ফ্রিজ ছিল না। আর আমাদের ফ্রিজ কেনার মতো সাধ্যই ছিল না। একদিন মাকে বললাম, ওদের (আছে একজন নাম নিলাম না) ঘরে ফ্রিজ আছে। ওদের ফ্রিজে একটি পানির বোতল রেখে আসি। মা বললেন, না দরকার নেই। রোজার সময় আল্লাহ বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নেয়। ওদের ফ্রিজে বোতল রাখতে যাবি আর ওরা যদি না রাখে তাহলে আমাদের মন খারাপ হবে। আর ওরা ইচ্ছা করে পানির বোতল ফ্রিজে না রাখলে ওদের পাপ হতে পারে। তার চেয়ে যেভাবে চলছে চলুক। যেভাবে চলছে চলুক মানে প্রতিদিন ইফতারির পূর্ব মুহূর্তে মেইন রাস্তায় কিছু লোক বরফ পলিথিনে ভরে রাখে এবং ২ টাকা, ৫ টাকা, ১০ টাকা করে বিক্রি করে। আমরা সেখান থেকে প্রতিদিন ২ টাকা বরফ কিনে আনতাম এবং পানির জগে রাখতাম।

গতকাল আমার স্ত্রী আমাকে বলল, আজ গেটের সামনে নেমেছি তখন অপরিচত এক মহিলা বলে আপনাদের বাসায় ফ্রিজে এই মাসে আমার একটি বোতল রাখা যাবে? আমি তাকে বললাম, তুমি কি বলেছো? সে বললো, বলেছি রাখা যাবে। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম ফ্রিজে কি জায়গা আছে? সে বলে জায়গা না থাকলেও সমস্যা নেই। এক বেলা নামিয়ে রাখলে নষ্ট হবে না তেমন জিনিস নামিয়ে রেখে দেব। সন্ধ্যায়তো আবার ফ্রিজে রাখা যাবে। আমি খুব খুশি হলাম। কারণ এর কষ্ট আমি বুঝি।

এবার বলি অন্য ঘটনা। মায়ের নির্দেশ রোজা রাখতে হবে। না রাখলে ঘরে যা আছে তাই খেতে হবে। ঘরে যা আছে মানে পানতা-পানি এই আর কি। রোজা না রাখলে তার জন্য উনুনে হাড়ি উঠবে না। আমাদের বাড়িটা যেখানে ছিল পাশেই ছিল পরিষ্কার বিশুদ্ধ পানির খাল। আজ আর তা খাল নেই ড্রেনে পরিণত হয়েছে। এক সময় সেই খাল দিয়ে বড় দোতলা লঞ্চ, ময়ূরপঙ্খী নৌকা চলতে দেখেছি। রোজা রেখে সেই খালে নেমে বসে থাকতাম। একদিন খালে অনেক লাফালাফি করার কারণে খুব পানির পিপাসা লাগার কারণে ডুব দিয়ে একটু পানি খেলাম। বুঝে গেছি রোজা আর নেই শেষ। কিন্তু কাউকে বলারও সুযোগ নেই। সেই সন্ধ্যা পর্যন্ত না খেয়েই থাকতে হবে। একদিন রাতে খাবার সময় বলি এই তরকারিটুকু রেখে দাও। মা বলে কেন? বললাম কাল দুপুরে এটা দিয়ে ভাত খাব। মা রাগ হয়ে বললেন যা দিয়েছি খেয়ে তাড়াতাড়ি খেয়ে ওঠ। কোনো কিছু রেখে দেওয়া যাবে না। চুপচাপ খেয়ে উঠলাম।

মায়ের আসল উদ্দেশ্য ছিলো রোজা রাখতে হবে। মা বলতেন, এই বয়সে রোজা রাখা না শিখলে বড় হলে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে রোজা রাখা বন্ধ করবি। অনেকেই যেমন বলে রোজাতো রাখতে পারতাম কিন্তু গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় রাখতে পারি না। আল্লাহর রহমতে এবং মায়ের শিক্ষায় আজ পর্যন্ত রোজা রাখা মিস যায়নি। একবার রোজার মধ্যে অনেক জ্বর উঠল। ডাক্তার বলে গায়ে অনেক জ্বর এখনই ঔষধ খেতে হবে কিন্তু কষ্ট করে হলেও রোজা ভাঙিনি। গায়ে মোটা খাতা (কাঁথা) প্যাঁচিয়ে মসজিদে বসে বসে নামাজ পড়েছি। রোজা ভেঙে ঔষধ খেতাম কিভাবে! রোজা ভাঙার কথা মনে হলেই মায়ের শিখানো কথা মনে পড়ে।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও অ্যাডমিন, সাহিত্য তরী

আরও পড়ুন