‘হাসির ছলেও মিথ্যা নয়!’

ড. সাজেদা হোমায়রা

বন্ধুদের সাথে আড্ডায় অথবা অফিসে কলিগদের সাথে কতো রকমের গল্পেই না মেতে উঠি! আর এই আড্ডাকে আরো আনন্দময় ও প্রাণবন্ত করে তুলতে অনেকসময়ই আমরা মিথ্যা কিছু কথাও সেই সাথে এ্যাড করি। এই যে…কাউকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলছি এই কাজটি যে মারাত্মক গুনাহ, তা কি আমরা জানি?

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মানুষ হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে তার জন্য ধ্বংস! তার জন্য ধ্বংস! তার জন্য ধ্বংস!’ (তিরমিজি ও আবু দাউদ)

ইসলামে হাসি, আনন্দ ও বিনোদনকে উৎসাহ দেয়া হয়েছে। কিন্তু মিথ্যা বলাকে হালাল করা হয়নি। রাসূলুল্লাহ সা. মাঝেমাঝেই রসিকতা করতেন, কিন্তু মিথ্যা পরিহার করতেন। এমন অনেক ঘটনা হাদিসে আছে।

একবার রাসূল সা. এক বৃদ্ধাকে বললেন, ‘কোনো বুড়ো মানুষ তো জান্নাতে যাবে না। এতে বেচারী কান্নাকাটি শুরু করে। তখন তিনি বলেন, বুড়োবুড়িকে আল্লাহ জোয়ান বানিয়ে জান্নাতে দিবেন। বৃদ্ধা তখন হেসে দিলেন!

আরেককবার এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে সফরের জন্য একটি উট চান। তিনি বলেন, তোমাকে আমি একটি উটনীর বাচ্চা দিব। লোকটি হতাশ হয়ে বলে, বাচ্চাতে আমার কি হবে? তিনি বলেন, ‘সকল উটই তো উটনীর বাচ্চা।’

রাসূল সা. এভাবেই মজা করতেন, তবে মিথ্যা বর্জন করতেন।

রাসূল সা. বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তাই বলে বেড়ায়।’ (মুসলিম: ৫)

অথচ আমরা কান দিয়ে শোনা তো দূরের কথা অনুমান করেই কত কথা বলে বেড়াই। এখন তো সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মিথ্যা বলাটা আরো সহজ হয়ে গেছে! সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন খবর দেখা মাত্রই সত্যতা যাচাই না করে আমরা তা শেয়ার করি। অথচ সামান্যতম মিথ্যার ব্যাপারেও রাসুল সা. কতো সিরিয়াস ছিলেন!

আল্লামা ইবনে কাইয়্যিম (রহ.) কল্পনা কেন্দ্রীক উদাহরণ দেয়াকেও নিরুৎসাহিত করেছেন। যেন মানুষ তার অজান্তে ভিত্তিহীন বিষয়ের প্রতি আসক্ত হয়ে না যায়। তিনি জ্ঞানচর্চায় কল্পচিত্রের পরিবর্তে বাস্তবচিত্র ব্যবহারে উৎসাহিত করেছেন।

মিথ্যা ইসলামের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও হারাম গোনাহগুলোর অন্যতম। মিথ্যা কথা বলে কিছু কেনা বেচা করাকে বিভিন্ন হাদিসে কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

অনেক সময় আমরা মন ভুলানোর জন্য শিশুদের সাথেও মিথ্যা বলি। অথচ এরূপ মিথ্যাও মিথ্যা এবং গুনাহর কাজ। শুধু তাই নয়, এভাবে মিথ্যার মাধ্যমে আমরা শিশুদেরকে মিথ্যায় অভ্যস্ত করে তুলি এবং মিথ্যার প্রতি তাদের ঘৃণাকে নষ্ট করে দেই।

এরকম মিথ্যা শুনতে শুনতে বাচ্চারা কনফিউজড হয়ে যায়। তারা বুঝতে পারে না, কোন কথাটা সত্যি, আর কোন কথাটা মিথ্যা! একটা সময় তারা যিনি মিথ্যা বলেছেন, তার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। শুধু তাই না, সে নিজেও মনে করতে শুরু করে যে, মিথ্যা বলাটা খুব একটা দোষের কিছু না। ধীরে ধীরে একসময় সেও মিথ্যার চর্চা শুরু করে।

কিশোর সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আমির বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ সা. আমাদের বাড়িতে বসাছিলেন, এমতাবস্থায় আমার মা আমাকে ডেকে বলেন, এসো তোমাকে একটি জিনিস দিব। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, তুমি তাকে কি দিতে চাও? তিনি বলেন, আমি তাকে একটি খেজুর দিতে চাই। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘তুমি যদি তাকে কিছু না দিতে- তবে তোমার নামে একটি মিথ্যার গুনাহ লেখা হতো। ’ –আবু দাউদ

রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন ‘আমি তার জান্নাতের নিশ্চয়তা প্রদান করবো। যে মিথ্যা বলা পরিহার করবে এমনকি হাসির ছলে বলাটাও।’ সুনানে আবু দাউদ : ৪৮০

আল্লাহ মুনাফিকদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলেছেন ‘তারা মিথ্যাবাদী’। এই বৈশিষ্ট্যটি আমাদের মাঝে আছে কি না, আত্নপর্যালোচনা খুব প্রয়োজন।
যদি থেকেই থাকে তবে তা পরিহার করার নিয়্যত করে ফেলি এখনই!

লেখকঃ সাহিত্যিক, গবেষক এবং  সেরা মানুষ ছিলেন যাঁরা  বইয়ের লেখক

আরও পড়ুন