আব্বা হুজুরের দেশে

ডা: আলী জাহান

১. রাজধানীর গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে গতকাল (২৭.০৪.২১) কলেজ পড়ুয়া এক ছাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হয়েছে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। হত্যা-আত্মহত্যার এই দেশে এটি হয়তো কোন খবর নয়। কিন্তু অন্য কারণে তা খবর হয়ে গেছে। আমার এই লেখা পড়ার আগেই হয়তো আপনারা পুরো ঘটনা জেনে গেছেন। কেন পত্রিকার প্রথম পাতায় খবরটি এসেছে তাও নিশ্চয়ই আপনারা ধারণা করতে পারছেন।

২. গুলশানের ফ্ল্যাটে থাকতেন এই তরুণী যিনি একটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখে তাকে খুব স্মার্ট মনে হচ্ছে।
এবার খবরের পরবর্তী অংশটুকু খেয়াল করুন। মারা যাওয়া মেয়েটির নাম মোশারাত জাহান মুনিয়া। তাঁর বাড়ি কুমিল্লা শহরে। তার বাবার নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে মুনিয়ার পরিচয় ছিল এবং তিনি নিয়মিত ওই ফ্ল্যাটে যেতেন। উনি কেন ওই ফ্ল্যাটে যেতেন তা জানার আমার ইচ্ছে নেই। আপাতত আপনারা এখানে থেমে যান। মেয়েটি কীভাবে মারা গেলো তা জানার জন্য আপনাদের আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। টপ টু বটম খবর দেয়ার জন্য পত্রিকা আর টিভি চ্যানেলগুলো ক্যামেরা নিয়ে হামলে পড়বে।

খেয়াল করে দেখুন মেয়েটির বাবার পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে কিন্তু শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

উপরের সংবাদটি দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিকের। তারা পুলিশকে উদ্ধৃত করে খবর ছাপিয়েছে। হয়তোবা বাকি দৈনিকগুলো একই পথ অনুসরণ করবে।

৩. বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের ২২ মার্চের খবর। নারী সহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগে সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার এক নির্বাহীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। খবরটি আবার পড়ুন। সহকারী মহাব্যবস্থাপক এবং উনার নারী সহকর্মীর নাম-পরিচয় কিছুই নেই। সাধু সাধু! কী চমৎকার রিপোর্টিং!

৪.

মুনিয়া আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যা করেছেন। হত্যা আত্মহত্যার দেশে এরকম ঘটনা অহরহ ঘটছে। খবরটি কয়েকদিন পত্রিকার পাতায় থাকবে তারপর স্বাভাবিক উপায়ে হারিয়ে যাবে। কিন্তু আমার প্রশ্ন আছে। মুনিয়ার আত্মহত্যার সাথে তার বাবার সম্পর্ক কী? উনি কি তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছেন? উনার পরিচয় কেন প্রকাশ করা হচ্ছে?

তদুপরি নামের আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা শব্দগুলো জোড়ে দেয়ার মানে কী? মেয়ের আত্মহত্যার সাথে বাবার মুক্তিযুদ্ধের কী সম্পর্ক? একটি সাবালক মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। রাষ্ট্র ও সমাজ কেন সেই মেয়েকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি সে জন্য রাষ্ট্র ও সমাজকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করান। সেখানে পিতৃপরিচয় কেন প্রকাশ করা হবে? এই মেয়েকে জন্ম দিয়ে কি মা-বাবা পাপ করেছেন? তা না হলে সমাজের কাছে কেন তাদেরকে এজন্য অপদস্থ হতে হবে? সাবালক মেয়েকে কেন এবং কীভাবে ফ্ল্যাটে একা রেখেছেন সেটি হল নৈতিকতার প্রশ্ন। সেটি নিয়ে গবেষণা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশ কেন মুনিয়ার মা-বাবার পরিচয় প্রকাশ করবে? খবরের অন্য অংশের দিকে খেয়াল করুন। বিশিষ্ট শিল্পপতি তথাকথিত বন্ধুর (ছেলে বন্ধু) নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। কেন করা হয়নি? কারণ কি বিত্ত বৈভবের লম্বা হাত?

৫. সোনালী ব্যাংকের ঘটনাটি আবার একটু পড়ুন।

অভিযুক্ত কর্মকর্তা এবং তাঁর নারী সহকর্মীর নাম প্রকাশ করা হয়নি। মুনিয়ার মা-বাবা এবং বোনের পরিচয় প্রকাশ করা গেলে সোনালী ব্যাংকের সেই কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশ করা হবে না কেন? একই উত্তর। সমাজের কোন তলায় আপনি অবস্থান করছেন তা নির্ধারণ করবে আপনার প্রাইভেসি রক্ষা হবে কিনা।

৬. বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর সব দেশের আইন অনুসারে বয়স ১৮ বছর হয়ে গেলে ছেলে মেয়ের কাজকর্মের জন্য তারা নিজেরাই দায়ী থাকবে। কোন মা-বাবা সন্তান জন্ম দিয়ে নিশ্চয়ই কোন পাপ করেন নি। যদি তাই হয় তাহলে কেন মা বাবার পরিচয় প্রকাশ করা হচ্ছে? নাটকের অন্য দৃশ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি যাদের ক্ষমতা, বিত্ত বৈভব আছে তাদের নাম অনেক ক্ষেত্রেই প্রকাশ করা হচ্ছে না। কেন করা হচ্ছে না?

৭. উপরের যে প্রশ্নগুলো আমি করলাম তা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে প্র্যাকটিসরত এক ব্যারিস্টার সাহেবকে করেছিলাম। তিনি চমৎকার একটি উত্তর দিয়েছেন। তাঁর সেই উত্তর শুনে আমি আর তাঁর সাথে কথা বাড়াইনি। তাঁর সীমাবদ্ধতা আমি বুঝতে পারছি। তার পরিচয় প্রকাশ করছি না তবে তাঁর সেই উত্তরটি আমি দিচ্ছি।

৮.

বাংলাদেশের বহুল প্রচলিত একটি সংস্কৃতি হচ্ছে যে মা বাবা (আব্বা) বা শিক্ষকদের (হুজুর) সাথে তর্ক করতে নেই। উনাদের ভুল ধরিয়ে দিতে নেই। ভুল হলেও উনারা নির্ভুল। এই আব্বা হুজুর, আম্মি হুজুরদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তাদের শরীরে রোশনাই এসেছে। উনারা এখন পরিবার আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই শুধু নন , এখন রাষ্ট্রের সবখানে আছেন। তাঁদের ভুল ধরিয়ে দিতে গেলে আপনার খবর হয়ে যেতে পারে।

পিটিয়ে আপনার কান গরম করে ফেলবে। হাড্ডি গুড্ডি গুঁড়া করে দিতে পারে। কপাল খারাপ থাকলে মারাও যেতে পারেন। গুম হয়ে যেতে পারেন|পরিবারের ত্যাজ্য সন্তান হয়ে যেতে পারেন। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় আপনার বারোটা বেজে যেতে পারে। আব্বা হুজুরদের হাত অনেক লম্বা। কেউ তাদের স্পর্শ করতে পারছে বলে মনে হয়না । তাই উনারা প্রায়ই দেশের নাগরিকদের হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। আব্বা হুজুরের দেশে বাঁচতে চাইলে আপনাকে একদম নিরব হয়ে থাকতে হবে। এই কারণে আমি এই বিষয়টি আদালতের নজরে আনতে পারি না- ব্যারিস্টার সাহেব বললেন ।

আপডেট -নবাবজাদা নসরুল্লাহর অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাসছে ।তাই পরিচয়টা প্রকাশ করতে কিছু মিডিয়া বাধ্য হচ্ছে

লেখকঃ বৃটেনে কর্মরত বাংলাদেশী চিকিৎসক (কনসালটেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট) এবং সাবেক পুলিশ সার্জন (ব্রিটিশ পুলিশ)

আরও পড়ুন