আমাদের উপাসনালয় হোক সমাজের মানবতার বাতিঘর

মাহবুবা শারমিন

অনেকদিন কাগজ  কলমে লিখালিখি কারিনা। সাহিত্য, রস বা প্রেম-ভালোবাসা এসব নিয়ে লেখার মতো জ্ঞান আমার নেই। কোভিড ১৯(লকডাউন) এর কারণে ফেইসবুকের  বদৌলতে   কিছু সামাজিক  অসঙ্গতি নিয়ে মাঝে মাঝে লিখি সেখানেও কিছু বিধিনিষেধ মানতে হয়। ধর্মীয় কোনো বিষয় নিয়ে লিখা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কে কখন কল্লার দাম হাঁকে অথবা কাফের, মুশরিক ঘোষণা দেয় সেটিও মাথায় রাখতে হয়।

বেশ কিছুদিন আগে খুব ভোর বেলা ফোন বেজে উঠলো। সকাল বেলা ফোন আসলে ভয় পাই, কারণ আম্মা অসুস্থ,এছাড়াও প্রিয় আত্মীয়-স্বজনরাও কোভিড এর আক্রান্ত  অবস্থায় আছেন। দৌড়ে গিয়ে ফোন ধরলাম, ওপাশ থেকে একজন জানতে চেয়েছেন আমি ওমুক কিনা? বললাম হ্যাঁ, তখন  উনি বললেন আপনার আব্বা (মরহুম সামসুদ্দিন আহমেদ)  দানবীর মানুষ, মহান ব্যক্তি। আমাদের মসজিদের জন্য একটা এসি দিতে হবে। আমি আপনার নামে একটা এসি লিখে রেখেছি। আমি অবাক হয়ে বললাম, ভাই, আপনি ভুল মানুষকে ফোন দিয়েছেন, আমি কোনো দানবীর নই। আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমার এতো টাকা-পয়সা নাই। ভাই-বোন বা  মুরুব্বী খালাম্মা, বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে সামাজিক সংস্কার মূলক  সংগঠন করি, ওদের  থেকে কিছু টাকা-পয়সা নিয়ে এলাকায় সামান্য কিছু কাজ করি, এর বেশি কিছু নয়। তখন উনি বিরক্ত হয়ে বললেন মসজিদের বেলায় আপনাদের হাত শক্ত হয়ে যায়, অন্য বেলায় ঠিকই থাকে। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, গ্রামের সুশীতল বায়ু গাছপালা বেষ্টিত মসজিদ সেখানে এসি লাগবে কেন? উত্তরে ভদ্রলোক বললেন ওমুক বাড়ির দড়জায় মসজিদে এসি লাগিয়েছে আমাদের সম্মান রক্ষার্থে হলেও এসি লাগাতে হবে!!!! আমি তখন সরি বলে ফোন রেখে দিলাম। ফোন রেখে ভাবলাম মানুষ সবকিছুর মতো মসজিদ নিয়েও এক অসুস্থ  প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়েছে।

মসজিদ কমিটি নিয়ে বিরোধের ফলে বা ইমাম সাহেব কোনো এক প্রভাবশালীকে সালাম দেন নাই এসব তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে এক মসজিদ থেকে বের হয়ে আরেকটি নতুন মসজিদ তৈরি করেন। মসজিদ সুন্দর করা বা নতুন মসজিদ করা কোনোটিই খারাপ কাজ নয় কিন্ত তা যদি শুধু মাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা হয় ।

মসজিদ নিয়ে বিষেদাগার করার জন্য এই লেখা নয়। আমাদের ছোটবেলায় আমরা দেখতাম মসজিদ কেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা ছিলো। তখন এলাকার মুরব্বি শ্রেণির সম্মানিত লোকজনকে জোর করে মসজিদ কমিটির দায়িত্ব দেয়া হতো। এলাকার কোনো গরীব মেয়ের বিয়ে না হলে মসজিদ কমিটি উদ্যোগ নিয়ে চাঁদা তুলে বিয়ে দিতেন। সমাজের অনিয়ম, অসামাজিক কাজ বা মাদক এসব নিয়ে মসজিদ কমিটি থেকে প্রথম প্রতিবাদ করতো । এখন জোর করে মসজিদ কমিটির দায়িত্ব নেয়া হয়। বেশীরভাগ মসজিদ কমিটিতে কোন ধরনের লোক রয়েছেন তা আমাদের অজানা নয়। অবশ্য কিছু কিছু জায়গায় ভালো লোকও মসজিদ কমিটিতে রয়েছেন।  কিছুদিন আগে পত্রিকায়  দেখলাম উত্তরবঙ্গের একটি মসজিদ কমিটি নিয়ে বিরোধে ৩ জন নিহত হয়েছেন।যেই মসজিদের দোকান আছে, মার্কেট আছে এবং আয় বেশী সেই মসজিদ কমিটি নিয়ে বিরোধও বেশী

মুসলমানদের ঘরের চেয়ে মসজিদ সুন্দর হলে আল্লাহ খুশি হন। এখন ঘর সুন্দর, মসজিদও সুন্দর, সেই সাথে সমাজ কি সুন্দর রয়েছে ? মোটেও না। সুউচ্চ ভবন, দামী টাইলস, সেন্ট্রাল এসি, সবকিছুই  হয়েছে কিন্ত মানুষ কতটুকু মুমিন, মানবিক হয়েছে তা ভাববার বিষয়।

আমি যে বিল্ডিংয়ে  থাকি তার অপজিটে  মসজিদে জুমার নামাজ আদায়  হয় সেই  মসজিদের হুজুর প্রতি জুমায় বয়ান করে (ফ্ল্যাট থেকে শোনা যায়)  মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য টাকা উঠান । মনেহয় সমাজে একমাত্র সমস্যা মসজিদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। জুমার খুতবায় বিশ্বনবী( সঃ)মুসলিম উম্মার সমস্যা নিয়ে কথা বলতেন, সমাজিক সমস্যা নিয়ে কথা বলতেন। এখন আর এসব নিয়ে খুব একটা আলাপ হয়না। একবার দেখলাম হুজুর  ঘোষণা দিলেন ওমুক ইন্জিনিয়ার সাহেব মসজিদে নতুন কার্পেট দিবেন। মাশা-আল্লাহ, মারহাবা, ধ্বনিতে মসজিদ মুখরিত হয়ে উঠলো । কিন্ত আমি তাকিয়ে দেখলাম যে কার্পেটটিতে আমর স্বামী ও ছেলেরা বসে আছে  সেটিও প্রায় নতুন। আমার বড় ছেলে একজনকে জিজ্ঞেস করলো এই কার্পেট গুলো কি করবে? উত্তরে  বললেন, ফেলে দিবে বা কেউ নিয়ে যাবেন। আমি অবাক হলাম, এটি টাকার অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।

অনেকে মসজিদ-মাদ্রাসাকে কালো টাকা সাদা করার মেশিন ভাবেন।আমার ছোট ছেলে জুম্মার নামাজ খুব আনন্দ সহকারে পড়তে যেতে চায়, কারন তার দুই ছোট্ট পকেটে ৫০/১০০খুচরা টাকা দিতে হবেই। না হলে সে সেদিন  খুব মন ক্ষুন্ন হয়।  মসজিদ থেকে নামাজ শেষে  বের হলে ২০-৩০ জন পুরুষ, মহিলা, বৃদ্ধ, পঙ্গু মানুষ, বাবা দুইটা টাকা দেন বলে আহাজারি করছেন। কয়েকজন বৃদ্ধকে দেখলাম বয়সের ভারে মেরুদণ্ড এতো বাঁকা হয়েছে যে, তাঁরা মুখ তুলে দেখতেও  পারছেন না কোন লোকটি তাকে ভিক্ষা দিলেন। মসজিদ প্রাঙ্গনে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবের এই আহাজারি শুধু মসজিদের সৌন্দর্যকে ম্লান করেনি, বিধাতাকেও ব্যাথিত করেছেন।

মার্বেল পাথরে মোড়ানো মসজিদের পাশের বাড়ির কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা যদি অর্থাভাবে মেয়েকে বিয়ে দিতে না পারেন, আর সেই মেয়ে যদি ব্যাভিচারে লিপ্ত হয় এই দায় মসজিদ কমিটি তথা সমাজের প্রতিটি মানুষের।

আমার পরিচিত একজন বৃদ্ধ মহিলা টাকার অভাবে চোখের চাউনি অপারেশন করাতে না পেরে তার নাতিকে পাঠান আমার নিকট সাহায্যের জন্য । আমার মেজ বোন টাকা দিতে রাজি হয়েছেন, কিন্ত বৃদ্ধাকে  ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবতীয় টেস্ট করানোর সময় দেয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যায় নাই। এভাবে একটি বছর মহিলাটি অন্ধত্ব বরণ করে তাঁর মেয়ের সাহায্য নিয়ে চলাফেরা করেছেন। অথচ মহিলার চার ছেলে নাতিপুতি অনেকেই রয়েছেন কেউ এগিয়ে আসেন নাই।বিষয়টি নিয়ে আমার বোন আমাকে ভীষণ রাগ করেছেন।  তিন  বোন,  বড় ভাই এবং আম্মা  মিলিয়ে  মাত্র ১৭০০০/ টাকা ব্যয় করার পর মহিলা এখন দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন, এবাদত বন্দেগি  করছেন। মহিলার চোখের ব্যান্ডেজ খোলার পর ছোটবেলায় দেখা বাংলা সিনেমার মতো আমার ভাই বোনদেরকে  দেখে  যে খুশির কান্না দিয়েছেন যা আমি আমৃত্যু ভুলবনা। অথচ তার বাড়ি থেকে মাত্র ৫০০ গজ দূরে এলাকার প্রভাবশালী ওয়াদুদ ব্যাপারীর বাড়ি সংলগ্ন লাখ টাকা ব্যয় করে প্রতি বছর নূর মসজিদে ওয়াজ মাহফিল হয়। আমি ওয়াজের বিরোধিতা করছি না, শুধু বোঝাতে চাচ্ছি ইসলাম মানবতার ধর্ম, সেই ইসলাম থেকে মানবতাকে বাদ দিয়ে আমরা কেন শুধু ধার্মিক সাজার চেষ্টা করছি!!!!!

বিশ্বনবী হজরত মোহাম্মদ (সঃ) এর জীবনী পড়লে দেখাযায় মানবতার নবী, শুধু মানুষ নয় জীবজন্তুর প্রতিও কতো মায়া করতেন। মাদার তেরেসা বলেছেন, দৃশ্যমান মানুষকে যদি তুমি ভালোবাসতে না পারো তাহলে অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তাকে কীভাবে ভালোবাসবে। অর্থ্যাৎ আল্লাহকে ভালোবাসতে হলে আগে তাঁর সৃষ্ট মানুষকে ভালোবাসতে হবে।

মসজিদ সুন্দর হবে সাথে সমাজের মানুষগুলোকে সুখি এবং সুন্দর করার চেষ্টা থাকতে হবে। স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ফারুক আহমেদের বাড়ির মসজিদের সামনে ওয়াজ মাহফিলে হুজুরকে গাড়ি দিয়ে আনা হয়েছে তা দেখে মিজানুর রহমান (ধনু) সাহেব  বাড়ির মসজিদের ওয়াজে হুজুরকে পাজেরো গাড়ি  দিয়ে আনা হয়েছে। এই প্রতিযোগীতাকে অন্যায় মনে করিনা। যদি এরকম ঘোষণা আসে যে, ফারুকের বাড়ির মসজিদের আশেপাশে যত ভিক্ষুক আছে এখন থেকে সবাইকে খাওয়া-পরার ব্যবস্থা মসজিদ কমিটি বা সমাজ থেকে করা হবে। কেউ ভিক্ষা করতে পারবেনা। তাহলে ধনুর  বাড়ির মসজিদ কমিটিও ঘোষণা করবে এই সমাজে গৃহহীন কোন লোক থাকবেনা, সবাইকে ঘর করে দেয়া হবে। সকল অসুস্থ রোগীর চিকিৎসা করা হবে।

মন্দির কমিটি যদি ঘোষণা করেন এবার দূর্গা পূজোয় মায়ের অর্ছনায় ব্যয় কমিয়ে এলাকায় যত ভিক্ষুক আছে তাদের পুনর্বাসন করা হবে।

আবার আগের মতো মসজিদ, মন্দির, গীর্জা কেন্দ্রীক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। মানুষ ধার্মীক হোক সাথে আরো মানবিক হোক।

আমাদের জাতীয় কবি, মানবতার কবি, কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন,  “আরতির থালা তসবির মালা আসিবেনা কোনো কাজে, মানুষ করিবে মানুষের সেবা আর সবকিছু বাজে।”

আরও পড়ুন