একুশের চেতনা জাগিয়ে রাখতে বলি

এম আর রাসেল

শুনলে অবাক হবেন হয়ত, এরপরও বলি বাঙালি জাতি বরাবরই লড়াকু। এই জাতির ভিতরে সর্বদা তেজের আগুন লকলকিয়ে জ্বলে। সর্বদা এর প্রকাশ ঘটে না এটা সত্য। তবে এই আগুন যখন ভিতর থেকে বাইরে আসে, তখন এর ভয়াবহ তাণ্ডবলীলা সবকিছু ছারখার করে দেয়। এর প্রমাণ ইতিহাসে রয়েছে।

বাংলার এই অঞ্চলেই কৈবর্তের বিদ্রোহ হয়েছিল। বিদ্রোহের তেজ বাঙালি জাতির ললাটে বিজুলির ন্যায় চমকিত হতো। এজন্য এই অঞ্চলের গায়ে বুলগাকপুর তকমাও লেগে আছে। জাদরেল মোঘল সেনাপতিদেরও নাস্তানাবুদ হতে হয়েছিল। তারা খুব সহজেই এই অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।

বাশের কেল্লার প্রতিবাদী সুর, ফরায়েজী আন্দোলনের গান, সন্ন্যাসী বিদ্রোহের হুংকার, ফকির বিদ্রোহের তান, নীল বিদ্রোহের নীলিমা, সিপাহী বিদ্রোহের তেজোদীপ্ত চেতনা প্রভৃতির মাঝেই বাঙালির আসল রূপ ঠিকরে ঠিকরে পড়ে। প্রকৃত রূপ কখনও কখনও সরলতার আবরণে আড়াল হয়েছে, কিন্তু চিরতরে হারিয়ে যায়নি।

সময়ের প্রয়োজনে প্রকৃত রূপ খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। রূপের আগুন চারিদিক ঝলসিয়ে দিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের মাঝেই বারবার সজীব প্রাণের জাগরণ ঘটেছে। সৈয়দ শাসসুল হকের কবিতার পঙক্তি স্মরণ করিয়ে দেই,

‘পরিচয়ে আমি বাঙালি, আমার আছে ইতিহাস গর্বের-
কখনোই ভয় করিনাকো আমি উদ্যত কোনো খড়গের।
শত্রুর সাথে লড়াই করেছি, স্বপ্নের সাথে বাস;
অস্ত্রেও শান দিয়েছি যেমন শস্য করেছি চাষ;
একই হাসিমুখে বাজায়েছি বাঁশি, গলায় পরেছি ফাঁস;
আপোষ করিনি কখনোই আমি- এই হ’লো ইতিহাস।’

 সৈয়দ শামসুল হক 

বাঙালির ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস। আহমদ ছফার সুরেই একটি প্রশ্ন রেখে যাই,

‘এমনি কত বিদ্রোহ, বিক্ষোভ, বিপ্লব, উপবিল্পব, বাংলাদেশে আদিকাল থেকে ঘটে আসছে, ইতিহাস কি রক্ত-মাংসে সবগুলো ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে?’

আহমদ ছফা 

বিশেষ একটি দিনে আচার সর্বস্ব আয়োজনে মেতে উঠলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। যুগে যুগে এই অঞ্চলের বীর সন্তানেরা যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন তা জানতে হবে, জানাতে হবে। আমরা কি সেই কাজ করি, না লোক দেখানো আবেগে কণ্ঠ কাঁপাই তা ভেবে দেখতে বলি?

একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের পথে, স্বাধীনতা অর্জনের পথে রক্তলাল তোরণদ্বার। ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল তমদ্দুন মজলিস নামক সাংস্কৃতিক সংগঠনের হাতে। এরপর এর সাথে রাজনৈতিক সংস্কৃতি যুক্ত হয়ে বিশাল মহীরুহ রুপে আবির্ভূত হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক ইতিহাস আলাপের সাথে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকাকেও পাশে রাখতে বলি।

বাংলা ভাষাকে ফুলে ফলে সুশোভিত করতে যাদের অবদান আছে তাদেরকেও জানতে বলি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে সালাম, রফিক, বরকত সহ অনেকে বুকের রক্ত দিয়েছেন। তারা আমাদেরকে ঋণী করে গেছেন। এই ঋণ আমরা পরিশোধ করতে পারব না জানি, কিছুটা কমানোর উদ্যোগ নিতে তো দোষ নেই।

বাংলা ভাষাকে যারা কটাক্ষ করেছেন তাদেরও চিনে রাখা উচিত। মাতৃভাষার অপরিসীম শক্তিতে বলীয়ান হতে হবে। বাংলা ভাষার রূপ-লাবণ্য বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে সবাইকে অবাক করে দিতে হবে। এমন কোনো কাজ হয়েছে কি? হয়ে থাকলে তা প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে। আর না হয়ে থাকলে এর জন্য আমাদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কথার ফুলঝুরিতে ভাষা নিয়ে আবেগিক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করার মধ্যেই যেন আমরা আটকে না থাকি। বিষয়টি ভেবে দেখতে বলি।

বাংলা ভাষাকে উচ্চতর সাহিত্যের আসনে উন্নীত করতে কারা মূল ভূমিকা রেখেছিল? এই প্রশ্নের উত্তরও জানতে বলি। এ প্রসঙ্গে দীনেশচন্দ্র সেন-এর একটি কথার কিয়দংশ স্মরণ করিয়ে দেই। তিনি লিখেছেন,

‘পূর্বে বঙ্গভাষা কোনো কৃষক রমণীর মতো দীনহীন বেশে পল্লী কুটিরে বাস করিতেছিল।’

দীনেশচন্দ্র সেন

তিনি আমাদের আরো জানিয়েছেন বঙ্গভাষাকে পণ্ডিতমণ্ডলী ইতরের ভাষা বলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতেন। ইতরের ভাষার শ্রী বৃদ্ধিতে কাদের ভূমিকা অগ্রগণ্য ছিল? বাংলা ভাষাকে সাহিত্যিক রূপদানে কাদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল? তৎকালীন রাজদরাবারে বাংলা ভাষার প্রবেশ কাদের মাধ্যমে ঘটেছিল প্রভৃতি বিষয়েও জানতে হবে, জানাতে হবে। বিষয়গুলো আমরা জানি কি??????

পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষাকে হিন্দু ভাষা বলেছেন। কিছু হিন্দু পণ্ডিত এই ভাষাকে ইতরের ভাষা বলেছেন। অবশ্য অনেক হিন্দু পণ্ডিত বাংলা ভাষার সমৃদ্ধিতেও অপরিসীম অবদান রেখেছেন। বাংলা ভাষা হিন্দু-মুসলমান সহ এই অঞ্চলের অন্য সব জাতির মিলিত প্রবাহে গতিময় থেকেছে। বিশেষ কোন জাতি বা ধর্মের একক সম্পদ বাংলা নয়। কি কারণে বাংলাকে হিন্দু ভাষার তকমা পেতে হল – বিষয়টি নিয়েও ভাবতে বলি। ইতিহাসের সূত্র বলছে বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্যে গৌরবময় অধ্যায় রচনায় মুসলিমদের অবদান রয়েছে। দীনেশচন্দ্র সেন লিখেছেন,

‘হীরা কয়লার খনির মধ্যে থাকিয়া যেমন জহুরীর অপেক্ষা করিয়া থাকে, বঙ্গভাষা তেমনই কোনো শুভদিন, শুভক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিল। মুসলমান বিজয় বাঙ্গালা ভাষার সেই শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল। বঙ্গ-সাহিত্যকে একরুপ মুসলমানের সৃষ্টি বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না।’

দীনেশচন্দ্র সেন 

শুধু দীনেশচন্দ্র সেনই নন প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন, ‘বাংলা সাহিত্যের জন্ম মুসলিম যুগে’। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর নাম শুনেছেন নিশ্চয়। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নির্দশন চর্যাপদ আবিষ্কার ও প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন,

‘আমাদের বাংলা বিভক্তি ‘রা’ ও ‘দের’ মুসলমানদের কাছ হইতে লওয়া। তা ছাড়া, আমরা কী করে ভুলে যাই, চতুর্দশ শতাব্দীর মুসলমান সুলতান এবং রাজপুরুষদের কথা, যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্যে এক গৌরবময় অধ্যায় রচিত হয়।’

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী

আবার অনেকেই বলে থাকেন বাংলা ভাষা সংস্কৃতের দুহিতা। এ মন্তব্যের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়।  তাই পাকিস্তানিদের এই অভিযোগ যে ভিত্তিহীন ছিল  আজ দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। অবশ্য এই অভিযোগের পিছনে বিশেষ কারণ ছিল যা একটু পরেই আমি বলব।

এখানে একটি দিক বলে রাখি, ঔপনিবেশিক শক্তিও বাংলা ভাষাকে মুছে দিতে পারেনি। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দিকে তাকালে দেখতে পাই ঐ অঞ্চলের স্থানীয় ভাষা হাওয়ায় মিলে গেছে। আজ ঐ অঞ্চলে ফরাসি, পতুর্গীজ, স্প্যানিশ ও ইংরেজি ভাষার প্রাধান্য লক্ষণীয়। বাংলা কিন্তু এখনও টিকে আছে?

পাকিস্তানিরা বিশেষ করে পাঞ্জাবিরা আমাদের ভাষার উপর আঘাত হেনেছিল। বাংলা ভাষাকে ঢেলে সাজাতে উদ্যোগী হয়েছিল। বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে চেয়েছিল। এর পিছনের উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিকে তাদের দাসে পরিণত করা। কারণ সংস্কৃতি হত্যা করে যে-কোনো জাতিকে দাস জাতিতে পরিণত করা যায়। আমাদের জাতির বীর সন্তানেরা আমাদেরকে দাস হওয়া থেকে রক্ষা করেছে এজন্য আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার মতো বাংলা ভাষাকে বিলীন করে দিতেই পাকিস্তানিরা নীল নকশা করেছিল।

আর একটি বিষয় বলে রাখি, চিরকাল সাধারণ মানু্ষেরাই বিদ্রোহের আগুন জ্বেলেছে। ভাষা শহীদদের নামের তালিকা দেখলেও সেটা স্পষ্ট হয়। বুদ্ধিজীবী শেণীর মানু্ষেরা চিরকালই সুবিবাবাধের আরাধনা করেছে। পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষাকে ঢেলে সাজাবার উদ্যোগ নিলে সেই সময়ে ঢাবির শিক্ষকেরা নীরব ভূমিকাই পালন করেছেন। হুমায়ূন আহমেদ- এর মাতাল হাওয়া বই-এ এই বিষয়ে উল্লেখ আছে।

ভাষা আন্দোলনের সাথে আমাদের জাতীয় মুক্তির প্রশ্নটিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। এতো বছর পর এসে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাটাও প্রয়োজনীয় মনে করি। এর উত্তর সবাইকে খুঁজে দেখতে বলি।

ভাষা শহীদদের রক্তের অক্ষরে লেখা বর্ণমালা কি আমাদের হৃদয়ে আছে না হারিয়ে গেছে সেই প্রশ্নও জাগিয়ে রাখতে বলি। বাংলা ভাষার করুণ দশা কি আমাদের মনে দু:খের জোয়ার উতলে দেয়? বাংলা ভাষার সমৃদ্ধিতে আমাদের অবদান কি? সচেতন নাগরিক হিসেবে এসব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকা জরুরী।

আজকের এই দিনে ভাষা শহীদদের বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।।।

তথ্যসূত্রঃ

১. ইতিহাসের ধুলোকালি-পিনাকী ভট্টাচার্য,

২. বাঙালি মুসলমানের মন – আহমদ ছফা

৩. জাগ্রত বাংলাদেশ – আহমদ ছফা

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন