এমন তো হবার কথা ছিল না!

জিয়াউল হক 

আল কুরআনের সামজিক, অর্থনৈতিক, আইন (প্রাশাসনিক) ও রাজনৈতিক শিক্ষা এবং দর্শনের প্রতিফলন মুসলিম দেশসমুহের সমাজে কিংবা প্রশাসন মাঠে ঘাটে বাজারে সব ক্ষেত্রেই দেখা যাবে, এটাই তো প্রত্যাশিত।
কিন্তু দু:খজনক হলো, বিশ্বের ৭৬ টি মুসলিম দেশসমুহের মধ্যে একটিও এমন নেই, যাদের সমাজ কিংবা রাষ্ট্র, ব্যবসা কিংবা প্রশাসন, রাজনীতি কিংবা অর্থনীতি কোথাও ইসলামের সুবিচার ও ইনসাফ প্রতিফলিত হচ্ছে। এমন একটা দেশও নেই, যেখানে ইসলামে বর্ণিত সার্বজনিন মানবিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। অথচ প্রত্যেক মুসলিম দেশের সরকার ও সুশিল সমাজই নিজেদেরকে ইসলামের খাদেম হিসেবে জাহির করে চলেছেন।
আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক বিশ্বের ২০৮টি দেশের সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সরকার, রাজনীতি, প্রশাসন ও আইন-কানুন ঘেঁটে একটা চমকপ্রদ এবং বিশ্ব মুসলমানদের জন্য চরম লজ্জাজনক বিষয় তুলে এনেছেন।

তাদের গবেষণা মতে, আল কুরআনে বর্ণিত সামাজিক সাম্য, শোষণমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও রাজনৈতিক বিধি-বিধান মেনে চলা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বের প্রথম দশটি দেশের মধ্যে একটাও মুসলিম দেশ নেই। প্রথম দশটি দেশ হলো যথাক্রমে;
Ireland, Denmark, Luxembourg, Sweden, the United Kingdom, New Zealand, Singapore, Finland, Norway এবং Belgium.
প্রথম দশটিই বা বলি কেন, প্রকৃত অর্থে প্রথম ৩২ টি দেশের মধ্যে একট্ওা মুসলিম দেশ নেই। একাধারে বত্রিশটি অমুসলিম দেশ বিশ্বের ৭৬টি মুসলিম দেশকে পেছনে ফেলেছে মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক বৈষম্য নিরোধ, অর্থনৈতিক শোষণ বিমোচন, আঈনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা বিষয়ক কুরআনের শিক্ষাকে বাস্তবায়নে।

তালিকায় থাকা ২০৮টি দেশের মধ্যে ৩৩ নম্বরে প্রথম একটি মুসলিম দেশ অন্তর্ভূক্ত হয়, সেটা মালয়েশিয়া। প্রথম পঞ্চাশটি দেশের মধ্যে মাত্র দু‘টি মুসলিম দেশ রয়েছে, মালয়েশিয়া আর কুয়েত। কাবার দেশ, মসজিদে নববির দেশ, প্রিয় নবীজীর দেশ; সউদি আরব তালিকার ৯১ নম্বর স্থানে সগৌরবে (!) স্থান পেয়েছে। ফেরআউনের মিশর আছে ১৮৯ নম্বরে। কুয়েত ৪৮ এবং আরব আমিরাত ৬৪ নম্বরে। (সুত্র:The Telegraph, 10 Jun 2014)
জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির উক্ত গবেষণার ব্যাপারে অনেক মুসলমান হয়তো ইনিয়ে বিনেয়ে নানা কথা, নানা ওজর-আপত্তি তুলবার চেষ্টা করবেন। বিধর্মীদের, তথা আমেরিকানদের জরিপ, সেটা কতোটা নির্ভরযোগ্য বা সেরকম কিছু। উত্তরে বলি, প্রায় কয়েক লক্ষ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মুসলমান আমরা ইউরোপ আমেরিকা অষ্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে এ সমাজে মানবাধিকার, আঈনের শাসন, সামাাজিক সাম্য এসব তো নিজেদের চোখেই দেখছি।

ইসলাম কেবল মুসলমানদের সম্পত্তি, এমনটা ভাবলে আমরা ভুল করবো। ইসলাম পুরো বিশ্বের সম্পত্তি। ওরা ঈমান গ্রহণের ঘোষণা দেয় নি, সত্য। কে জানে, কাল হয়তো দিতেও পারে! আর খৃষ্টধর্ম ছেড়ে ইসলাম গ্রহণের হারও আজ সে সব দেশেই সবচেয়ে বেশি।
তাই আমাদের উচিৎ উক্ত জরিপের যথার্থতা নিয়ে আপত্তি তুলবার আগে নিজেদের দিকে লক্ষ্য করা। আমাদের মা-বোন, জায়া জননীদের ক্ষেত্রে কি আমরা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি? বোনদের সম্পত্তি দেবার ক্ষেত্রে কিংবা আত্মীয়-স্বজন আর পাড়া-প্রতিবেশিদের সাথে সদ্ভাব রক্ষার ক্ষেত্রে কি সাম্য ও ইনসাফ বজায় রেখেছি? বাসা বাড়িতে গৃহকর্মীদের কথা তো বাদই দিলাম। আমরা হাসতে হাসতে জুলুম করি, জুলুমকে প্রশ্রয় দেই আর জালিমের সহযোগী হই, তার গূণকীর্তণ করি সামান্য কিছু খুঁদকুঁড়ো পেলেই!

ক‘দিন আগে পাবনা থেকে ঢাকা যাবার পথে সিরাজগঞ্জে যাত্রবিরতিতে দেখলাম পাশের সিটের দম্পতি নেমে গেলেন, কিশোরি কাজের মেয়েকে বাসের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে বাচ্চা ছেলেটা’সহ ঢুকলেন ফুড-ভিলেজে। সেখানে মুরগীর মাংশ ও তন্দুরি রুটি দিয়ে উদরপূর্তি করে আসার সময় ছেলেটার হাতে একটা ইগলু আইসক্রীম ধরিয়ে দিলেও বাসের কাছে প্রায় আধা ঘন্টা প্রচন্ড গরমে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরী কাজের মেয়েটার জন্য কিছুই আনলেন না। পান চিবুতে চিবুতে গিয়ে বাসের সিটে বসলেন! দম্পতিযুগলের মরদের পরণে পায়জামা পাঞ্জাবি আর ভদ্রমহিলার মাথায় সুন্দর হেজাব!
এটা কোন ব্যতিক্রম ঘটনা নয় বাংলাদেশে। দেশে থাকাকালীন বেশ কিছু সরকরি বা বেসরকারি অফিসে যেতে হয়েছিল ব্যক্তিগত কাজে। সেখানে যে ব্যবহার পেয়েছি আর  দুর্নীতির যে চিত্র দেখেছি, তা বর্ণনাতীত।

মনে পড়ে ২০১৬ সালের অক্টোবরে এক কাজে নর্দান আয়ারল্যান্ডে যেতে হয়েছিল। বেলফাস্ট এয়ারপোর্ট থেকে Whiteabbey এবং সেখান থেকে আবার সম্পূর্ণ উল্টো দিকে Crawfordsburn হয়ে বেলফাস্টে ফেরত এসেছিলাম। সাথে ছিলেন Tim Trevor এবং Alison Bowman। সারাদিন ওদের আচার-আচরণ, ভদ্রতা, ওয়াদা রক্ষায় আন্তরিকতা, আমার নামাজের জায়গা ব্যবস্থা করে দেয়া, হালাল খাবার জোগাড়ের জন্য তাদের ব্যাগ্রতা আজও স্মৃতিতে ভাস্বর। মন বলে সুযোগ পেলেই আবার তাদের কাছে ছুটে যাই।
আর এর বিপরীতে, বাংলাদেশে থাকাকালীন সময়ে দূর্ভাগ্যবশত আমাকে যে সব অফিসে যেতে হয়েছিল, তাদের সামনে আবার যাবার কথা মনে হলেই মনে মনে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। এমন তো হবার কথা ছিল না!

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও  ইংল্যান্ডের বেসরকারি মেডিকেলের এমডি , ব্রিটেন

আরও পড়ুন