করোনায় করণীয়

রফিকুল্লাহ্ কালবী
ছ’মাস অতিক্রান্ত হলো।  ভাইরাস আতঙ্কে বিশ্ব নিজেকে শামুকের মত গুটিয়ে রেখেছে নিজের মধ্যে। ভাইরাস বিস্তারের শুরুতেই যে সকল দেশ সতর্কতা অবলম্বন করেছিলো তারা মুটামুটি ধকল কাটিয়ে উঠতে পেরেছে বলে মনে করা হচ্ছে। আর যে সময় সতর্ক হওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যারা হম্বি তম্বি করে হুঙ্কার ছেড়েছিলো তারা আজ গেঁড়াকলে আটকা পড়ে বড়শি গেলা মাছের মত ছটফট করছে। যেমন- আমেরিকা, ভারত, বাংলাদেশ। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটাকে চিনের প্রোডাক্ট বলে রাজনীতির রঙ চড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি খানিকটা রঙ্গরস সৃষ্টি করলেও মার্কেট দখল করতে পারে নি। উপরন্তু করোনাভাইরাসকে তাচ্ছিল্য করার কারণে তার দেশ ওভারট্রাম্পের শিকার হয়। ফলে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যায় দেশটি এখন পর্যন্ত সগৌরবে শীর্ষ স্থানটি দখল করে আছে। পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলো তখন এই পাগলাটে প্রেসিডেন্ট পরাজিত সৈনিকের মত একখানি আপোষের কথা শোনালেন, “আমরা প্রথমে মনে করেছিলাম করোনাভাইরাসকে মোকাবেলা করা যাবে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এটা স্ত্রীর মত। এর সাথে সমঝোতা করে চলা ছাড়া কোন উপায় নেই”। ট্রাম্পের এই কথাটি ঠিকই মার্কেট পেয়ে গেলো।

এবার আসা যাক বাংলাদেশ প্রসঙ্গে। চীনের উহানে যখন প্রথম করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় তখনই বাংলাদেশের আগাম সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী ছিলো বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। চীনের একমাস পরে ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে ছড়িয়ে পড়ে মারণব্যাধি করোনা এবং ইউরোপ থেকে বানের পানির মতন দেশে ফিরতে থাকেন আমাদের রেমিটেন্স যোদ্ধারা। তখনও কর্তাব্যক্তিদের গা ঢালা সতর্কতা ও নানা রকম তাচ্ছিল্যমূলক কথাবার্তার ফুলঝুড়ি শোনা গেছে। সম্মান রেখেই বলছি, একটি শতবর্ষ পালনের তোড়জোর তখন তুঙ্গে। আমাদের কর্তাব্যক্তিদের নিকট থেকে তখন করোনা নিয়ে নানা রকম রসাত্মক কথা শোনা যাচ্ছিলো, যা দুঃখের সাগরে সামান্য বিনোদনের উদ্রেক করেছিলো বৈকি। কেউ বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধার কাছে করোনা কিছু না। কেউ বললেন এটা সর্দি-কাশির মত একটা ব্যাপার। কেউ আবার আরেকটু এগিয়ে বললেন, তারা নাকি করোনার চেয়ে শক্তিশালী।

এর পরের ইতিহাস সকলেরই জানা। নারায়নগঞ্জ, ঢাকা ও শরীয়তপুরে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হলো। ঢাকা ও নারায়নগঞ্জকে লকডাউন করার পরিবর্তে সেখান থেকে সমস্ত লোককে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হলো। ঢাকা, নারায়নগঞ্জের লোকদেরকে দেশময় ছড়িয়ে দেয়ার কয়েকদিন পর আবার ডাকা হলো গার্মেন্ট শ্রমিকদের। মানে, সব মিলে খিচুরী রান্নার পূর্বে সুদক্ষ রাঁধুনি যেনো চাল ডাল মসলা তেল জল এক সাথে মিশিয়ে নিলেন। তারপর দফায় দফায় সারাদেশ লকডাউন। ত্রাণ চুরির মহোৎসব। আরও আরও অনেক কিছু, যা এই নিবন্ধে আলোকপাত করতে বসলে প্রবন্ধের কলেবরই শুধু বৃদ্ধি পাবে না, পাঠকের ধৈর্যের বাঁধও ভেঙ্গে যেতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা চরম হতাশা ব্যাঞ্জক- এটা বলাই বাহুল্য। সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকেও প্রতিদিন এই হতাশা ব্যক্ত করা হচ্ছে। লাখ লাখ প্রবাসী দেশে ফিরেছেন। কোটিখানেক মূলবেকারের সাথে যুক্ত হয়েছেন নতুন করে চাকুরী ও ব্যবসা হারানো প্রায় দেড় কোটি বেকার। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক পাঁজর সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে। করোনার প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি জোন ভিত্তিতে চলছে লকডাউন। এই ছোট্ট ভূখণ্ডে এত বেশি লোকের বসবাস বিশ্বে আর কোথাও নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লকডাউন এখন কল্যাণের চেয়ে অকল্যাণ বয়ে আনবে বেশি। প্রান্তিক মানুষগুলো যারা দিন আনে দিন খায়, তাদের দাবী হলো– অনাহারে লকডাউন করার চেয়ে পেটে কিছু দিয়ে মরে য়াওয়াই ভালো।

তেরো বিলিয়ন বছর পৃথিবীর বয়স। “বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস” নামে একটা দিবস আছে আমাদের। অথচ অবাক করা বিষয় হলো আমরা এত দিনেও হাত কীভাবে ধুতে হয় তা জানতাম না। করোনা নামের এককোষী ভাইরাস যা আমাদের মাত্র বাহাত্তর ঘন্টায় শিখিয়েছে। আমারা শিক্ষিত অশিক্ষিত সকলেই এখন হাত ধুতে জানি। মুখে মাস্ক ও হ্যান্ডগ্লোভস ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে শিখেছি। এই জন্য করোনাকে স্যালুট জানানো দরকার। পাশাপাশি ট্রাম্পের সুরে সুর মিলিয়ে আমরাও শপথ নিতে পারি করোনার সাথে সমঝোতা করে চলার। কারন, এই মারণ ভাইরাস কখনো পৃথিবী থেকে নির্মূল হবে তা বলার উপায় নেই। ভাইরাসটি ধীরে ধীরে দুর্বল হবে, আবিষ্কার হবে ভ্যাকসিন- এটাই যা আশার কথা। পাশাপাশি বাড়াতে হবে সচেতনতা, চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতুলতা। ভয়ভীতি না ছড়িয়ে নাগরিকের বুকে বুনতে হবে সাহসের বীজ। আর নয় লকডাউন, স্বাভাবিক কাজকর্ম ও চলাফেরার জন্য মানুষের সকল বন্ধ দুয়ার খুলে দাও। আর সর্বোপরি আকাশের মালিকের কাছে দাও ধর্ণা।

লেখক : সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন