করোনা ও আমাদের ভোতা অনুভূতি

রফিকুল ইসলাম

কোভিড-১৯ এর ভয়াবহ ছোবলে আজ পৃথিবীর সুপার পাওয়ার খ্যাত খোদ আমেরিকায় ২০০০০ এর অধিক মানুষ মৃত্যু বরণ করেছে। ব্রিটিশ সরকার অনুনয়ের স্বরে বলছে “প্রিয়জনদের বিদায় দেবার প্রস্তুতি নিন”। স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি যেন মৃত্যু পুরিতে পরিণত হয়েছে। এভারেস্টর চূড়ায় লাল সবুজের পতাকা উড়ানো ওয়াসফিয়া নাজরীন বলছেন, এভারেস্ট জয় করার চেয়েও এ করোনাকে জয় করা অনেকবেশি কষ্টকর। কোন লকডাউন, শাটডাউন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। সবুজের এ চত্ত্বরে এখন কেউ অন্য কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেও যেন এ পৃথিবীর গ্লানি থেকে মুক্তি পেয়ে কবরের গহীন ঘরে সহসাই প্রবেশ করতে পারছেন না। কারণ এলাকাবাসীর সন্দেহ উনি করোনায় মারা গিয়েছেন। শুধু এলাকাবাসী কেন? নিজ গর্ভের সন্তানও করোনা আতঙ্কে বৃদ্ধা মাকে গহীন বনে রেখে পালিয়ে বাঁচতে চাইছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে মুহুর্তেই সকল তথ্য আমরা পেয়ে যাচ্ছি। ফেসবুক একদিকে ( একশ্রেণির?) বাঙালির সুখের ও সখের আশ্রম অন্যদিকে মানবিকতাবোধ, রুচি – ব্যক্তিত্ত্বের বহিঃপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যমে পরিণত হয়েছে৷ কোন এক লেখক বলেছিলেন ” তুমি আমাকে এই জাতির পড়াশোনা ব্যাপারে বল, তাহলে তাদের সার্বিক অবস্থা( কেমন মুসলিম) আমি বলে দেব। উনার সাথে সুর মিলিয়ে বলতে ইচ্ছে করে ” তুমি আমাকে “ক” এর ফেসবুক আইডিটা দাও আমি বলে দেন উনার হৃদয়ের একান্ত অনুভূতি, ব্যক্তিগত আর পারিবারিক জীবন কেমন।

গোটা পৃথিবী যখন এক ভাইরাসের আতংকে স্থবির তখন আমরা করোনার আক্রমনের আগে কক্সবাজারের সুমদ্র সৈকতে প্রিয়জনের সাথে কাটানো প্রিয় মুহুর্তের ছবি পোস্ট করে বলছি, “করোনার আগে উঠানো তাই এত সুন্দর হাসি”। ৩০-৩৫ বছর বয়সী কোন প্রিয় ভাই বাড়ির পাশে গোসল করতে গিয়ে ফিরে গিয়েছেন ৫ বছর বয়সে যেখানে ড্যাশ ছাড়াই গোসল করেছিলেন।
যখন ড. তুহিন মালিক বলছেন কোয়ারেন্টাইম কে কোরআন টাইম বানিয়ে নেন তখন কেউবা অর্ধনগ্ন পিক পোষ্ট করে বলছেন “কাজ নেই, কোয়ারেন্টাইন, খালি খাওন আর খাওন”। যখন একমাত্র উপার্জনক্ষম দিনমজুর পিতা কোথাও কাজ করার সুযোগ না পেয়ে চাল ডাল ছাড়াই ঘরে প্রবেশ করে ভাবে ” এ করোনা হয়ত পুরো পরিবারকে কবরে নিয়ে ছাড়বে” তখন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত কোন যুবক পোস্ট দেয় কত বছর পর
তার বিয়ে হবে”।
যে সময় সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে না পারার ভয়ে অভিভাবক আত্মহত্যার চিন্তা করছে, করোনার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে তখন আমরা কোন এপস এর মাধ্যমে জরিপ করছি ” কতজন আমাকে পছন্দ করে আর কতজন ঘৃণা করে”। তা আবার গর্বভরে ফেসবুকে প্রচার করছি। একদল মানুষ যখন চিন্তা করছেন, লিখছেন করোনা কি শিখিয়ে গেল/ যাচ্ছে তখন আমরা ফেসবুকে পোস্ট করছি ” যদি 3 k কমেন্ট পড়ে তাহলে ন্যাড়া সমিতির সদস্য হব। তারা আবার হাজারো কমেন্ট পাচ্ছেন!! আর যুবক সম্প্রদায় তো ” ন্যাড়া সমিতির সভাপতি থেকে শুরু করে সকল কর্মীদের নিয়ে গ্রুপ ছবি দিচ্ছেন। এরকম হাজারো মানবিক! পোস্টের উদাহরণ দেয়া যাবে। বিশ্ব যখন ভয়াবহ মন্দার আশংকা করছে তখন আমার দেশের প্রিয় নেতৃবৃন্দ অন্যদেশকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবার জন্য(?)দেশের করোনায় আক্রান্তের সংখ্যাকে হার মানিয়ে চাল চোরের খাতায় নাম লিখানোর প্রতিযোগিতায় কোমরবেঁধে নেমেছেন।

আসলে এগুলো কিসের লক্ষন? প্রিয় মাতৃভূমিতে মাত্র ৪০ দিনের মত সময়ে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ১০০০ এর অধিক হয়ে গেছে , পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। একের পর এক নতুন জেলায় আক্রান্তের খবর আসছে। করোনার উপসর্গ নিয়ে বিনা টেস্টে, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর হার বাড়ছে। এ সময়ে আমাদের হৃদয়ের বহিঃপ্রকাশ গুলো দেখে সত্যিই অবাক হয়েও শেষ করা যায় না। মনের কোনে প্রশ্ন জানে নিজেদের অজান্তেই কি লাইফটাকে Eat, Drink and be Merry বানিয়ে নিইনি তো?! চারিদিকে এত হাহাকার, ভয়াবহতা, আশংকা কেন আমাদের হৃদয়কে স্পর্শ করছেনা। যখন আমাদের প্রিয় কোন ভাই বাজার করে বাড়িতে ফিরে ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে ভাবছে” ব্যাগটার সাথে ঐ ভাইরাস আনলাম না তো?” তখন কি করে আমি লাইক কমেন্ট আর মজায় পড়ে থাকি? ( আমি নিজেও তাদের একজন)

তাহলে বিশ্বাসী হয়েও কি আমাদের অন্তকরণ তালাবদ্ধ? আমাদের অনুভূতি কি এতটাই ভোতা হয়ে গেল? যে করোনায় গোটা দুনিয়ায় আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যার সাথে আমাদের নিজেদের ছবিটাও সংযুক্ত করে দিতে হবে আত্মপ্রচারের জন্য? আমরা কি মনে করছি আমি কখনই আক্রন্ত হব না, কবরের মাটি আমাকে স্পর্শ করবে না?

আসুন আমাদের অনুভূতি আর অন্তকরণ কে শানিত করি, এ মহামারি ও আসন্ন ভয়াবহ বিপদে আর ঔদ্ধত্য দেখিয়ে না বলে বেড়ায় যে এটা নিছক প্রকৃতির ক্রোধ, এই অসহায় অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য সিজদায় আবনত হই, কাটিয়ে দেই নির্ঘুম রাত, লোনা পানিতে সিক্ত করি কপোল, ঐশীবানীর চর্চায় দীর্ঘদিনের জমানো মরিচা তুলে হৃদয়কে করে তুলি ঝকঝকে, তকতকে। যে হৃদয়ে ধ্বনিত হবে পীড়িত, ক্ষুধার্ত, নির্যাতিত, বঞ্চিত আর অসহায়ের হাহাকার। ছুটে চলবে অপার সুখ আর স্থায়ী প্রশান্তির পাণে, জলাঞ্জলি দেবে নিজের সুখ, সমৃদ্ধি, ঐশ্বর্য আর বিত্তবৈভব। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমিন

লেখক:শিক্ষক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন