কুরবানী ঈদ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি

আশরাফ আল দীন

ইদানিং দেখা যাচ্ছে ‘কুরবানীর ঈদ’ নিয়ে বেশ ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে এবং তর্ক বিতর্ক শুরু হয়েছে। একথা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, ‘কুরবানী’ বা সেক্রিফাইস (Sacrifice) মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অত্যন্ত প্রিয় এবং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা অন্য উম্মতের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। প্রত্যেক জিলহজ মাসে হজ পালন এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে পশু কুরবানী করা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিছু পশু-প্রেমিক, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এবং ইসলামবিরোধী চক্র এই দু’টি ইবাদতকে “অর্থের অপচয়” এবং “অনর্থক পশু-হত্যা” হিসেবে ব্যাখ্যা দিয়ে এর বিরোধিতা করে থাকে! তাদের এই অপচেষ্টাকে কঠোরভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে।

‘আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী’ করার অনেকগুলো বর্ণনা পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত আছে। এই কোরবানি নানা মাত্রার, যেমনঃ ‘আর্থিক কুরবানী’, ‘পশু কুরবানী’, এমনকি প্রয়োজনে ‘নিজের জীবন কুরবানী’ ইত্যাদি। আমরা এখানে আলোচনা করছি জিলহজ্ব মাসের দশ তারিখে, আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তি (সাহেবে নিসাব) যাঁরা হজ পালন করছেন না, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তাঁদের, পশু কোরবানি সম্পর্কে। এটাকেই আমরা ‘কুরবানীর ঈদ’ বলছি।

কুরবানী ঈদের ‘পশু কুরবানীকে মহান আল্লাহ্ ‘ফরজ’ করেননি। আল্লাহর রাসূলের দঃ বিভিন্ন বর্ণনা এবং তাঁর কাজগুলোকে বিশ্লেষণ করে ফিকাহ শাস্ত্রবীদগণ কেউ একে ‘ওয়াজিব’ বলেছেন, কেউ বলেছেন ‘সুন্নাত’ বা ‘ইবরাহীমের সুন্নাত,’ আবার কেউ বলেছেন ‘মুস্তাহাব’। কিন্তু, ‘ফরজ’ নয়। ফরজ নিতান্তই ‘আল্লাহর হক’ এবং বান্দাহর উপর তা ‘অলঙ্ঘনীয় আদেশ’! এই আদেশ অমান্য করার কোন অধিকার বান্দাহর নেই। যদি কোন কারণে বান্দাহ ‘ফরয’ আদায় করতে না পারে তাহলে তাকে ‘কাযা’ আদায় করে দিতে হবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
এই কথাটা ওয়াজিব, সুন্নাত অথবা অন্য কোন নফলের ব্যাপারে প্রযোজ্য নয়‌। এ কারণেই এগুলোর কোনো ‘কাযা’ হয় না।

মূলত হাদিস সম্মতভাবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ইসলামে ইবাদত দুই প্রকারঃ ফরজ ও নফল। নফল ইবাদত গুলোকে ফিকাহ শাস্ত্রবীদগণ এর গুরুত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেছেন। যেমনঃ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো ওয়াজিব, তারপর গুরুত্বপূর্ণ হলো সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, আরেকটু কম গুরুত্বপূর্ণ হলো সুন্নাতে যায়েদা বা সুন্নতে গায়ের-মুয়াক্কাদা এবং সাধারন নফল। কিন্তু এগুলোর কোনটাই ফরজ নয় বা ‘অলঙ্ঘনীয় আদেশ’ নয়। বৃহত্তর বিভাজনে এগুলো ফরজের মধ্যে পড়ে না, ‘নফল’-এর মধ্যেই পড়ে। ‘ফরজ’ অবশ্যই পালন করতে হবে আর ‘নফলে’র ব্যাপারে কথা হলোঃ “এটা করলে সওয়াব আছে, কিন্তু না করলে গুনাহ নাই”। কিন্তু ‘নফল’কে বলা হয়েছে “আল্লাহর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির উপায়”। ‘নফল’ পালন না করলে, বা করতে না পারলে বান্দাহ সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে কিন্তু এতে কোন গুনাহ নাই। এটাও সঠিক যে, ‘নফল’কে ইনকার বা হেয় করা যাবে না। তবে, কোনভাবেই ‘নফল ইবাদত’কে ফরজ করে নেওয়া যাবে না, বা ফরজ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। নফল ইবাদতকে বান্দাহর সক্ষমতা ও ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সক্ষমতা থাকার পরও যদি কোন বান্দা নফল ইবাদত পালনের ইচ্ছে পোষণ না করেন এতে তাঁর ঈমানের কোন ক্ষতি হবে না।

কুরবানী ঈদের ‘পশু কুরবানী’কে কোন ইমাম বলেছেন মুস্তাহাব (যেমন, ইমাম মুসলিম) আর প্রখ্যাত চার ইমামের তিন জনই বলেছেন এটি সুন্নত এবং ইমাম আবু হানিফা রহ বলেছেন এটা ওয়াজিব। অর্থাৎ ইমাম আবু হানিফা একে সুন্নতের চেয়ে খানিকটা বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু তাতে এটা ফরজ হয়ে যায়নি। ইমামদের কেউই এটাকে ফরজ বলেননি। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কখনো বলেননি, যারা ‘সাহেবে নিসাব’ তাদের প্রত্যেককে অবশ্যই পশু কোরবানি দিতে হবে। তিনি পশু কোরবানিকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন এবং এ কথাও বলেছেন, যারা পশু কুরবানী দেবে না তারা যেন ঈদের জামাতে না আসে। কিন্তু তিনি বলেন নি ‘তারা আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়’ অথবা ‘তারা জাহান্নামী হবে’ ইত্যাদি তিনি বলেন নি। তিনি বরং পশু কোরবানি দেওয়াটাকে উম্মতের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা ‘যারা কুরবানী দেওয়ার ইচ্ছা করো’ তারা যেন চুল ও নখ না কাটে (জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন)।

আবার দেখা যাচ্ছে, হযরত আবু বকর (রাঃ) হযরত ওমর(রাঃ) নিজেরা কুরবানী দেননি। তাঁদের কি অভাব ছিল? না। তাঁরা তখন ক্ষমতায় ছিলেন! কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কুরবানী দেননি এই কথা বোঝানোর জন্য যে, এটা উম্মতের উপর ফরজ নয়। ইসলামের ইতিহাস থেকে দেখা যাচ্ছে যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) তাদের মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহাবীও কখনো কখনো কুরবানী করা বাদ দিয়েছেন। এটা অভাবের জন্য নয়, বরং এটা এই কথা বোঝানোর জন্য যে দশই জিলহজের পশু কুরবানী উম্মতের জন্য ফরজ নয় অর্থাৎ অবশ্য পালনীয় নয়। আবার, আল্লাহর রাসূল দঃ তাঁর সমগ্র পরিবারের পক্ষ থেকে (তাঁর পরিবারের সদস্য সংখ্যা বরাবরই ৭ -এর উপরে ছিল) কখনও একটি দুম্বা আর কখনও একটি গরু কুরবানী দিয়েছেন। প্রত্যেকের নাম হিসাব করে মোট কত নাম হলো এবং এই নাম গুলোর বিপরীতে কয়টি পশু কোরবানি দিতে হবে এভাবে উনি কুরবানী দেননি। (এভাবে নাম হিসাব করা হয় তখন যখন হাজী সাহেবানরা হজে গিয়ে পশু কুরবানী দেন তখন।) আল্লাহর রাসূল দঃ তাঁর নিজের এবং তাঁর সমগ্র পরিবারের পক্ষ থেকে একটি পশু কোরবানি দিয়েছেন। সেটা বকরী/ দুম্বা হোক বা গরু/উট হোক। কিন্তু আমাদের এই উপমহাদেশে নামে নামে কোরবানি দেওয়ার যে প্রচলন দীর্ঘদিন ধরে চালু আছে এবং এ ধরনের ধারণা প্রচলিত আছে যে পশু কুরবানী দেওয়া ফরজ এর কাছাকাছি অথবা প্রায়-ফরজ! আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়েছে এই ক্ষেত্রে আমরা একটু বাড়াবাড়িই করছি।

এবার বর্তমান দুঃসময়ের প্রসঙ্গে আসি।আমি ব্যক্তিগতভাবে বিগত অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে, প্রথমে পিতার পরিবারে তারপর আমার নিজের পরিবারে, প্রতি বছর কুরবানী দিয়ে এসেছি। ইনশাআল্লাহ, ইচ্ছা আছে আগামী বছরগুলোতেও, যদি বেঁচে থাকি, কুরবানী দেবো। কিন্তু বর্তমানের করোনা মহামারী আক্রান্ত দেশের নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এ বছর কুরবানী দেবো না। আমি চাই অন্যরাও কুরবানী না দিয়ে সেই অর্থটাকে মানুষের কল্যাণে মানুষকে সাহায্য করার জন্য ব্যয় করুন।

এতে কি আমার গুনাহ হবে? উপরের আলোচনা থেকে আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে, আমার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমি কুরবানী না দিলে আমার কোন গুনাহ হবে না। তাছাড়া, বর্তমান বিশ্বের অনেক বড় বড় আলেম ও মুফতি ফতোয়া দিয়েছেন যে, অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেউ কুরবানী না দিলে তার গুনাহ হবে না। মিসরের সাবেক গ্রান্ড মুফতি ড, আলী জুময়াহ, সউদী আরবের শায়খ উসাইমীন ও শায়খ সালেহ আল ফাওযান ফতোয়া দিয়েছেন যে, সামর্থ্য থাকার পরও কুরবানী না দিলে গুনাহ হবে না।

তাহলে ‘এ বছর কুরবানী না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা শুনে’ আমাদের মধ্যে অনেকেই শঙ্কিত হয়ে পড়ছে কেন? শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এ কারণে যে, একটি ইসলামবিদ্বেষী মহল তাদের তথাকথিত ‘পশু হত্যা বন্ধ হয়েছে’ এবং ‘তাদের হজ ও কুরবানীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে তারা বিজয়ী হয়েছে’ এই ধরনের ভাব দেখিয়ে লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে! এদের মধ্যে টেলিভিশনের কিছু বাচাল প্রকৃতির উপস্থাপক/ উপস্থাপিকার ভূমিকা ও বক্তব্য বড্ড দৃষ্টিকটু! এমনকি হিন্দুধর্মাবলম্বী কিছু ব্যক্তিও আছে যারা না বুঝে অনর্থক মন্তব্য করে সরলপ্রাণ মুসলমানদের মনে কষ্ট দেয়। এতে মুসলমানদের মনে এক ধরনের জেদ কাজ করে যে, “নাহ, আমরা কোরবানি অবশ্যই করবো এবং তারপর দান-খয়রাত করবো।” এক্ষেত্রে আমি বলবো, অপাংক্তেয় কিছু ব্যক্তির অযাচিত মন্তব্যের প্রেক্ষিতে আমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করা উচিত নয়। আমরা ইসলামের শত্রুদের ব্যাপারে সজাগ থাকবো, কিন্তু মানবিক কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে যেন আমরা ভুল না করি।

এখন যদি কেউ আমাকে প্রশ্ন করে, কুরবানীর বদলে স্থায়ীভাবে কুরবানীর টাকা দান করে দিলে সেটা গ্রহণযোগ্য হবে কি না? আমি এই ধরনের প্রশ্ন ও প্রস্তাবের কঠোর বিরোধিতা করবো। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কুরবানীকে স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়ার অথবা অন্য যে কোনো ভালো কাজ দিয়ে তাকে স্থায়ীভাবে প্রতিস্থাপন করার কোন প্রশ্নই উঠে না। কারণ, কুরবানী আল্লাহর উদ্দেশ্যে করা হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এর মধ্যে অনেক মঙ্গল নিহিত আছে। কুরবানী মুসলমানদের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবাদত এবং এই এবাদতকে বাতিল বা স্থগিত করা যাবে না। কারণ, এইভাবে যদি ইসলামের আহকামকে বদলে দেওয়ার সুযোগ দেয়া হয় তাহলে ক’দিন পরে ইসলাম আর ইসলাম থাকবে না।

সুতরাং আমি এখানে ইসলামবিরোধী যারা তাদের উদ্দেশ্যে বলবোঃ “বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র এবারের জন্য কুরবানীর অর্থ মানুষের কল্যাণে ব্যয় করার যে সিদ্ধান্ত কিছু মুসলমান নিয়েছেন এটাকে আপনারা সাধুবাদ জানান, কিন্তু আপনাদের দাবি অনুযায়ী ‘পশু হত্যা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে’ এই ধরনের অযথা আনন্দে বগল বাজাবেন না।” অযথা খোঁচাখুঁচি করবেন না। ইসলামের শত্রুরা সুন্দর ভাষায় কথা বলে কীভাবে ইসলামের বিপক্ষে ষড়যন্ত্র করে সে ব্যাপারে আমরা সচেতন আছি।” আমি আমার মুসলমান ভাইদের বলবোঃ “বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় এ বছরের জন্য কোরবানির সিদ্ধান্ত বাদ দিলে আমাদের কোন ক্ষতি হবে না। কিন্তু যেটা লাভ হবে সেটা হলো অনেক অর্থাভাবে পতিত নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার উপকৃত হবে। আপনি চিন্তা করে দেখুন এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিন।” আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার তৌফিক দান করুন। ওমা তৌফিক ইল্লা বিল্লাহ।

মিরপুর ঢাকা ০৭/০৭/২০২০

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং উপদেষ্টা, পলিসি রিসার্স সেন্টার

 

আরও পড়ুন