কোভিড ১৯ পরিস্থিতি এবং আমরা

মোস্তফা মাসুম তৌফিক

সারা বিশ্বে যখন ভয়ংকর করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ এলো তখন বাংলাদেশের অবস্থা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক ছিল। আমরা বিগত শীতে সামান্য চিন্তিত থাকলেও, শীত কমার সাথে সাথে আমাদের সচেতনতা, সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থবিধি মেনে চলা, বাহুল্য বর্জন করা, সবকিছু থেকে আমরা যেন হাত পা গুটিয়ে নিয়েছি।

আমরা দিন দিন সাহসী হতে হতে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে মাত্রাতিরিক্ত দুঃসাহসী আচরণ শুরু করি। সারা বিশ্বে, বিশেষ করে উন্নত বিশ্ব এবং আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের সাথে তুলনা করে আমাদের অবস্থান বিবেচনায় একধরনের অহেতুক আত্মতুষ্টিতে ভুগতে শুরু করি। আমাদের ইমিউনিটি অনেকগুণ বেশি ঐসব দেশগুলোর চেয়ে, আমাদের উপর আল্লাহর রাহমাত আছে, বলতে বলতে কেউ কেউ আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাত উপরোক্ত দেশগুলোর চেয়েও শক্তিশালী এবং কার্যকর বলেও অলৌকিকে ভ্রান্তিবিলাসে আচ্ছন্ন হয়ে যাই।

কিন্তু আমাদের চিন্তা ভাবনা এবং বাস্তবতার মাঝে শেষ পর্যন্ত বিরাট ফারাক ধরা পড়েছে। শনাক্তকরণের শতকরা হার ২% কিংবা ৩% এ নেমে যাবার যে আত্মতুষ্টি, তা মাত্র কয়েকদিনেই ধূলিসাৎ হয়ে উল্টো বিরামবিহীন ভাবে ২০% এর উপর উঠে বসে আছে, এমনকি মাঝে মাঝেই তা ২৫%, ৩০% মাত্রাও স্পর্শ করে। যা, যে কোন দৃষ্টিকোণ থেকেই ভয়ংকর।

এছাড়া, আমরা সবাই বাস্তব চিত্রটা জানি, এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে করোনা টেস্টের সংখ্যাগতভাবে ভয়াবহ ধরনের অপ্রতুল। (এটাও আমাদের দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা, এমনকি শতকরা হারেও খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যপক প্রভাব ফেলে)। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমাদের দেশে শনাক্তকরণের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার সাথে সাথে টেস্টের সংখ্যাও অজানা কারণে কমতে শুরু করেছিল। এরপর আবার গত কিছুদিনের শনাক্তকরণ মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যাওয়ায় টেস্টের সংখ্যা শেষ পর্যন্ত আমাদের এযাবতকালের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে, এতে একটা বড় ধরনের লাভ হলো, আমরা বুঝতে পারলাম, করোনা নিয়ে আমাদের আকাশকুসুম কল্পনা এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস নির্ভর সামগ্রিক অসচেতনতার কোন জায়গা নেই। বেঁচে থাকতে হলে, টিকে থাকতে হলে, আমাদের সচেতনভাবে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলতে হবে।

করোনার বিরুদ্ধে যে প্রতিরোধ যুদ্ধ চলছে বিশ্বব্যাপী, তার অন্যতম সুফল কোভিড ১৯ এর ভ্যাক্সিনও চলে এসেছে অনেকের হাতের নাগালে। আমাদের দেশের অনেকেই প্রথম ডোজ টিকা নিয়ে দ্বিতীয় ডোজ নেবার অপেক্ষায় আছি এবং দ্বিতীয় ডোজ টিকাও কেউ কেউ ইতিমধ্যেই পেয়ে গেছে। অক্সফোর্ড আবিস্কৃত যে ভ্যাক্সিন আমরা গ্রহণ করছি, তার সম্ভাব্য কার্যকারিতা ৭০% এর কাছাকাছি হলেও, এই কার্যকারিতা শুরু হতে পারে দ্বিতীয় ডোজ নেবারও কমপক্ষে দুই সপ্তাহ পরে। এর আগে পর্যন্ত টিকার কোন কার্যকারিতা আশা করা নিছক বোকার স্বর্গে বাস করা। বরং দুই টিকা গ্রহণের মধ্যবর্তী সময়টা শরীরের স্বাভাবিক ইমিউনিটি নষ্ট করে দিলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আমরা অবশ্যই ভাগ্যবান যে, আমরা ইতিমধ্যেই করোনার টিকা নেয়া শুরু করেছি। একইসাথে এটাও মাথায় রাখতেই হবে, দ্বিতীয় ডোজ নেবার আগে কোন আশা করা বাতুলতা মাত্র।

গত বছরের জুন থেকে যখন প্রথম লকডাউন শিথিল করা শুরু হলো, তখন থেকেই আমরা যেন স্বাস্থবিধি, সামাজিক দূরত্ব, সচেতনতা, সবকিছুই বিসর্জন দিয়ে বসে আছি। এমনকি আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত কিংবা উচ্চ ও মধ্যবিত্ত অংশের মধ্যেই এই বিসর্জনের হার বেশি ছিল। কেনাকাটা, ঘোরাঘুরি, বাইরে গিয়ে ভূড়িভোজন, বিলাসী প্রমোদভ্রমণ এবং সামাজিক মাধ্যমে এগুলো সচিত্র কিংবা লাইভ তুলে ধরার ব্যাপকতা দেখলে এতটুকুই নিশ্চিত হওয়া যায়, আমরা কেউই করোনা পরিস্থিতি থেকে কোন শিক্ষাই নিতে পারিনি।

যে ভয়ংকর মৃত্যুর মিছিল এবং অর্থনৈতিক ধ্বস বিশ্বব্যাপী হয়েছে বিগত এক বছরের বেশি সময় ধরে, তাকে বিন্দুমাত্র আমলে না এনে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছি। অনিবার্য ভাবেই আমরা এই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের মাশুল গোনার মুখোমুখি। আবার আমরা লাগাতার সাধারণ ছুটি কিংবা বেনামে ভাতাবিহীন লকডাউনের সামনে দাঁড়িয়ে। এখন আমাদের সংযত হওয়া ছাড়া কোন উপায়ই আর অবশিষ্ট নেই।

এখনো সময় আছে রুদ্র প্রকৃতি এবং করোনার বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে, এ দেশকে, এ বিশ্বকে বাঁচাতে, আমাদের সবারই একেবারে ব্যক্তিগত ভাবেই সংযত, সচেতন হতে হবে। একই সাথে ব্যাক্তিগত কিংবা পারিবারিক ভাবেই আমাদেরকে যথাযথ স্বাস্থবিধি মেনে চলে বাহুল্য বর্জন করে মানবিক আচরণ করতে হবে।

মাত্র কিছুদিন আগেও আমাদের কাছে মনে হচ্ছিল আমরা বোধ হয় কোন দৈববলে কিংবা অলৌকিক কারিশমায় করোনার বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্তি পেয়ে গেছি। কিন্তু হঠাৎ করেই আমাদের অতি আপনজন, ঘরের মানুষ, মা-বাবা, ভাই বোন, বন্ধু বান্ধব, আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, এমন মানুষেরা যখন নিয়মিতভাবে আক্রান্ত হতে শুরু করেছে, তখন যেন আমাদের টনক নড়ে উঠলো। আমরা আসলে বাধ্যতামূলক না করলে বোধ হয় সচেতন হবারও চেষ্টা করি না। এখন পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে, সবাই হঠাৎ করেই যেন আবারও পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা করছে। যে সচেতনতা আমরা একটু একটু আয়ত্ত করতে একসময় চেষ্টা করেছিলাম, বর্তমান বাস্তবতায় তার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে গেছে।

করোনার সরাসরি কিছু ক্ষতিকর প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর মিছিল, অকল্পনীয় আক্রান্তের সংখ্যা, ভয়ংকর সংক্রমণ প্রবণতা তো আছেই, সাথে সাথে নিদারুণ অর্থনৈতিক সংকটও দৃশ্যমান। করোনায় ধনী-গরিব পার্থক্য আরও পরিস্কারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে, শিক্ষাখাতে বাংলাদেশে এই পার্থক্য সবচেয়ে প্রকট করে তুলে ধরেছে। অনলাইনে ক্লাস করার জন্য যে এন্ড্রয়েড মোবাইল সেট প্রয়োজন, তা শতকরা কত ভাগ ছাত্রের আছে আমাদের দেশে, তা চিন্তা করলেই ধনী দরিদ্র ব্যবধান বাড়ার একটা প্রকট দিক পরিস্কার হবে। তেমনিভাবে, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা অন্যান্য খাতেও ধনী দরিদ্র পার্থক্য চরম নেতিবাচকভাবে ফুটে উঠেছে। করোনা প্রতিরোধে আমাদের যে যুথবদ্ধ প্রচেষ্টা, তা খুবই নগন্য। প্রণোদনার কোন সুফল বৃহত্তর জনগোষ্ঠী পায়নি। প্রণোদনা ঋণের শর্তে শুধু জামানত বাধ্যতামূলক করাতেই তা পুরোপুরি অর্থহীন হয়ে যায়, বরং প্রণোদনার জন্য বরাদ্দ সরকারি সহায়তা ঘুরে ফিরে শেষ পর্যন্ত ক্ষুদ্রতম ধনিক শ্রেণীর কাছেই গিয়েছে।

এর মধ্যে নতুন করে সৃষ্ট বেকারত্ব, এবং ধারাবাহিক উপার্জন হ্রাসকরণ, এমনকি উপার্জনহীনতা গভীরভাবে সামগ্রিক অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। আমাদের সম্মিলিত অসচেতনতা এবং অসংযত আচরণের কারণে যখন আবারও আমরা লকডাউন কিংবা বাধ্যতামূলক উপার্জনহীতার মুখোমুখি, তখন তা গভীরভাবে ভেবে দেখার বিষয়ই বটে।

আর আমাদের সবারই এখানে কিছু হলেও করণীয়। এহেন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের এবং মানবিকভাবে টিকে থাকার জন্য আমাদেরকে আন্তরিকভাবে, সম্মিলিত ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। একান্ত ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক ভাবেই আমাদেরকে শুরুটা করতে হবে। আর এটাই হবে করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে আমাদের সঠিক অবস্থান। আমাদেরই সচেতন হয়ে স্বাস্থবিধি মেনে করোনার হাত থেকে নিজেকে, পরিবারকে, সমাজ ও দেশকে এবং এভাবে পুরো বিশ্বকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা সবাই যেহেতু নিজেদের মানুষ মনে করি, তাই চেষ্টা করলেই আমাদের পক্ষে সম্ভব করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ লড়াইয়ে টিকে থাকার এবং জয়ী হবার। মানুষ কখনো হেরে যেতে পারে না।

লেখকঃ কলাম লেখক

আরও পড়ুন