চোরের দশদিন গেরস্তের একদিন

।। শাহীন আক্তার ।।

কথায় আছে “চোরের দশ দিন গেরস্তের এক দিন”। আমরা যারা সাধারণ গেরস্ত মানুষ তারা অসহায়ভাবে চারিদিকের চৌর্যবৃত্তিতে নিজেদের অভ্যস্ত করে নিতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তাই বলে কী চোরের প্রতি আমাদের ঘৃণাও লুপ্ত হতে চলেছে? অবস্থাদৃষ্টে তো তাই মবে হচ্ছে। সম্প্রতি এক আলোচিত মামলার রায় বের হয়েছে। আমাদের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার কথা। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম এই ব্যাপার নিয়ে হা-হুতাশ করার মানুষেরও অভাব নেই। কিমাশ্চর্যম!!!

এসব ভাবতে ভাবতেই প্রাত্যহিক রুটিনের অংশ হিসাবে আম্মুর(প্রবাসী) অনলাইনে কথা বলছিলাম। ফোনের স্ক্রিনের ওপার থেকে কিছুটা ইতস্তত করে আম্মু বললো,

“অনেকদিন থেকে তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেসা করবো ভাবছি, সত্যি করে করে বলোতো, তুমি যে শীতকালে গায়ে পাতলা কাঁথা নিয়ে ঘুমাতে তা কী শুধু তোমার গরম বেশি বলে? এখন আমার কেন যেন মনে হয় তুমি ইচ্ছে করে অন্যদের লেপ নেওয়ার সুযোগ করে দিতে। এই ব্যপারাটা আজকাল আমার খুবই মনোকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে তুমি হয়তো তখন শীতে কষ্ট পেতে”। আমি কি উত্তর দিবো! অবাক হয়ে মনেমনে ভাবছি এটা শুধুমাত্র একজন মায়ের পক্ষেই ভাবা সম্ভব যে, তার সুস্থ-সবল বর্তমানের বয়স্ক বাচ্চাটি একসময় হয়তো শীতে কষ্ট পেয়েছিলো!

বিদুৎ চমকের মতো আমার মনে দু’চার দিন আগে দেখা আবরারের মায়ের একটা সাক্ষাৎকারের কথা মনে পড়ে গেলো। সেখানে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিলো যে এই মা আর কখনোই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না। সম্ভবও নয়। কোনোরকমের দুর্ঘটনায় বা আকস্মিক সহিংসতায় নিহত হলে নিজের মনকে প্রবোধ দেওয়া যায়। কিন্তু নিজের কলিজার টুকরো নয়নের মনি আত্মজকে সারারাত ধরে “সাপপেটা” করে পিটিয়ে মারা কোন মা সহ্য করতে পারবে? যেখানে একজন মা ২০/২৫ বছর আগে তার সন্তান শীতে কষ্ট পেয়েছিলো ভেবে তার বর্তমান নিস্তরঙ্গ প্রবাস জীবনেও স্বস্তি পাচ্ছেন না। সেখানে আরবারের মায়ের মনে কী ঘটতে পারে এই ভেবে আমি ক্ষণে ক্ষণে শিউরে উঠছি।

কেউ কেউ আবার বলতে পারেন যে এই বিশজনের পিতামাতাওতো অনেক কষ্ট পাবে। একজন নিরপরাধ সন্তানের মাতাপিতা হয়েও যদি আবরারের পিতামাতাকে এমন যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় তাহলে কুসন্তান পালন করার জন্য অপরাধীদের পরিবারেরও কিছুটা শাস্তি পাওয়া হয়তোবা নিয়তির অংশ।

অনেকেই যারা আবরারের পিতামাতাকে ক্ষমার মহান দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করার অনুরোধ করছেন তাদের বলি, একবার আবরারের জায়গায় নিজ সন্তান আর তার পিতামাতার জায়গায় নিজেকে দাঁড় করিয়ে বলুন তো! পারবেন? ক্ষমার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে?

অনেকে যারা আবার আফসোস করছেন ২০টি মেধাবী প্রাণের জন্য, তাদের উদ্দেশ্যে বলি – সারারাত ধরে যারা নিজেদের মতোই আরেকটি ছেলেকে একটু একটু করে অত্যাচার করে মেরে ফেলতে পারে, তাদের দ্বারা দেশ ও জাতির কোনো উপকার আশা করা যায় না। কারন তারা কখনো সৎ মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে পারে না। তাদের মেধাকে তারা অসৎ উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করবে।

এখন আবার অনেকে যুক্তি দাড় করাবেন যে, এমন তো কতই অনুচিত হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে! কয়টার সঠিক বিচার হয়েছে? হ্যাঁ, আমরা সবাই জানি এমন অনেক আন্যায়-অবিচারের সঠিক বিচার হয় নি। সঠিক বিচার কেন অনেক ঘটনার কোনো বিচারই হয় নি। আমারা এটাও জানি যে হয়তোবা এই ঘটনার বিচারও শেষপর্যন্ত সঠিকভাবে নাও হতে পারে।
তাই বলে কি আমরা এটাই আমাদের ভবিতব্য মেনে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকবো?

অনেকেই আবার ধুয়ো তুলেছেন যে, এদের পিছনের যে প্রকৃত পরিচালক তাদের ধরতে হবে আগে। পিছনের কলকাঠি নাড়া হাতগুলোকে আগে ভাঙ্গতে হবে।
এখন হাত পর্যন্ত যেতে পারবো না বা পারছি না বলে কি চিরকালই নিজেদের কলকাঠির তলে সঁপে দিতে থাকবো? মানলাম একটি ডাকাতি বা চুরির মুল অপরাধী হচ্ছে ঘটনার পরিকল্পনাকারী। তাই বলে কী যারা তার নির্দেশে ডাকাতি করবে তাদের কোনো দায় নাই? আজ অনেকেই ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন। তারা হয়তো ভুলে গেছেন নিকট অতীতে এদেশের একজন শাসককে এই ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করতে চেয়ে তার জীবনের চরমমূল্য(তার ভাষায়) দিতে হয়েছে।

যাই হোক। আমি সামান্য আদার ব্যপারী, জাহজের খোঁজ আমার প্রয়োজন নাই। বরং ফিরে যাই গেরস্তের কথায়। বলছিলাম আমরা যারা সাধারণ মানুষ, আমরা যারা চোর-ডাকত-পুলিশ খেলায় এখনও দক্ষতা অর্জন করতে পারিনি। তারা প্রবচনের গেরস্তের মতোই আশায় আশায় বুক বাঁধি এই বলে “চোরের দশদিন গেরস্তের একদিন”। আর সেই চোর ধরার একটা সুযোগ যদি একবার আমাদের হাতে এসেই যায় তবে আমরা মনেপ্রাণে চাই তার সর্বোচ্চ শাস্তি হোক। দশদিন চোর ধরতে পারিনি বলে এগারো নম্বর চোরকে ছাড় দেওয়ার মতো অর্বাচীন হয়ে আমরা আর থাকতে চাই না। তবুও যাদের মনে অর্বাচীন হওয়ার সাধ আছে, তারা যতখুশি সাধ মেটান। আমরা চাই “চোরের দশ দিন গেরস্তের একদিন” প্রবচনটি অন্তত এবারের জন্য সত্যি হোক!

লেখকঃ কলাম লেখক 

লেখকের আরও লেখা পড়ুন- রিযিক বৃদ্ধির ৬ টি ঐশী উপায়

আরও পড়ুন