ছাত্র পেটানোঃ পাপ, অপরাধ নাকি সাওয়াব

ড.আব্দুস সালাম আজাদী

ধর্ম সমূহ মানুষকে ভালোবাসতে শিখায়, তাদের কে ভালোভাবে মানুষ করে গড়ে তুলতে বলে এবং ছাত্রদেরকে মানুষ করতে যারা দ্বায়িত্ব পালন করবে তাদের আলাদা মর্যাদা দান করে।

একজন ছাত্র দ্বীন শিখতে গেলে আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন, ফেরেশতা দিয়ে তাদের স্বাগত জানানোর ব্যবস্থা করে দেন, এবং তাদেরকে সৃষ্টির সেরা ঘোষণা দিয়ে দেন।

পাশাপাশি শিক্ষকতার মর্যদাকে আল্লাহ অনেক উপরে তুলে ধরেছেন। কারা কারা শিক্ষক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করতে পারবে তার একটা রোডম্যাপ ও আল্লাহ কুরআনের মাধ্যমে ইতিহাসের উদাহরণ দিয়ে শিখিয়ে দিয়েছেন। ইবরাহিম, ইয়াকুব, লুকমান, খিদর আলাইহিমুসসালাম গণের শিক্ষকতার পার্ট ও তাদের এপ্রোচ ও এটিচিউডগুলো গভীর ভাবে অধ্যায়ন করলে আমাদের সামনে অনেক অনেক তথ্য ও নির্দেশনা মূর্ত হয়ে ওঠে। বিভিন্ন কারণে যাওয়া জেলের আসামীদের পড়াতেও ইউসুফ (আ) এর মেথড আমাদের পথ দেখায়। অস্থির পথে ছুটে চলা পাপীদের ভালোপথে আনতে নূহ (আ) এর মেথড আমাদের অনেক উপকার করে। বাচ্চাদের কাছে, বুড়োদের কাছে, যুবকদের কাছে তার দীন শেখানোর পদ্ধতি আমাদের অনেক অনেক পথ দেখায়।

সবচেয়ে সুন্দর ও আধুনিক ব্যবস্থা ছিলো আমাদের নবী (সা) এর। তিনি ৮০ বছরের বুড়োদের থেকে শুরু করে ৭/৮ বছরের বাচ্চাদের কাছে ও খুব জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। তিনি নিজেও বলেছেন, “আমাকে শিক্ষক করে পাঠানো হয়েছে। (ইবন মাজাহ, ২২৯) তিনি আরো বলেছেন, আমাকে আল্লাহ রূঢ় করে অথবা কঠোর-প্রাণা করে পাঠাননি, বরং পাঠায়েছেন মুয়াল্লিম তথা শিক্ষক করে এবং সহজ করে। (মুসলিম, ১৪৭৮) মুয়াওয়িয়া ইবনুল হাকাম (রা) বলেন, আমি আমাদের নবীর মত ভালো শিক্ষক তাঁর পূর্বে ও পরে কাওকে দেখিনি। (মুসলিম, ৫৩৭)। এই বর্ণনাটি ইমাম আবু দাঊদ উল্লেখ করেছেন এই ভাবে, “শিক্ষক হিসেবে রাসূল (সা) এর চেয়ে কোমল ও বন্ধুসুলভ আর আমি কোন শিক্ষককে পাইনি। (আবু দাঊদ, ৯৩১)।

তিনি কিভাবে পড়াতেন, তা নিয়ে আরেকদিন হয়তঃ লিখবো আমি। আজ শুধু ছাত্ররা ভুল করলে আমাদের নবী (সা) কি করতেন তার কিছু চিত্র তুলে ধরছি।

আইশা (রা) বলেনঃ রসূলুল্লাহ (সা) কোন জিনিষকে, কোন মহিলাকে, কোন চাকরকে কোনদিন হাত দিয়ে আঘাত করেননি। তবে জিহাদের ময়দানের আঘাতটা ভিন্ন কথা। (মুসলিম, ২৩২৮)।

বড় ভুল করেছিলেন কাআব বিন মালিক। তাবুক যুদ্ধে যেতে চেয়েও যাননি। এত বড় ভুলের পরেও যখন মহানবী (সা) মদীনায় ফিরে আসলেন, কাআব পাশে যেয়ে সালাম দেন। তিনিও মুচকি হেসে তার উত্তর দিলেন, তবে সে হাসিতে কষ্টের রেশ লাগা ছিলো। (বুখারি ৪১৫৬)। একবার এক বেদুইন এসে মসজিদে নবওয়ীতে পেশাব করে দেয়। সাহাবিগণ তাকে ধমকি দিয়ে বাঁধা দিতে গেলে তিনি তাদের নিবৃত্ত করেন, এবং বেদুইনের এই অপকর্মটা শেষ হলে তাকে মসজিদের মর্যদা বুঝিয়ে দেন, এবং যায়গাটা সাহাবিগণকে পানিদিয়ে ধুয়ে দিতে বলেন। (মুসলিম ২৮৫)। তিরমিযির বর্ণনামতে তিনি এরপর সাহবিগণকে বললেন, তোমরা বিভিন্ন বিষয় সহজ লভ্য করে দিতে এসেছো, কঠিন করে দিতে আসোনি (তিরমিযি, ১৪৭)। এক যুবক সাহাবি তাঁর কাছে যেনা করার অনুমতি নিতে আসে। তার কথা শুনে অন্য সাহাবিগণ ক্ষেপে যান। কিন্তু তিনি তাকে বুঝিয়ে এই খারাপ থেকে তাকে বিরত রাখেন। (আহমাদ, ২১৭০৮)।

আমাদের মুরব্বিগণ সালাত না পড়লে ১০বছরের বাচ্চাদের মারার জন্য পরামর্শ দেয়া হাদীসগুলো ছাত্রদের মারা বৈধতার পক্ষে দলীল হিসেবে নিয়ে আসেন। কেও কেও বৌকে মারার কুরআনি আয়াত ও ছাত্রী মারা জায়েযের জন্য কৌট করেন। তারা বুঝেন না, ছেলে মারা ও ছাত্র মারা কত পার্থক্য, জানেন না বৌ মারা ও ছাত্রী মারার মাঝে কত ফারাক্ব! ইসলামের এইদুটো বিষয় কোনদিনই শিক্ষালয়ের চত্তরে নেয়া যায়না। নিতে নেই। যদি নেন, আপনি একটা হাদীস দেখান তো, যাতে প্রমান করা যায় আমাদের নবী (সা) কোন ছাত্র ও ছাত্রীর গায়ে হাত তুলেছেন।

আমি ঢাকার তামিরুল মিল্লাতে পড়েছি। সেখানে ক্লাস ওয়ান থেকে ফাজিল পর্যন্ত ছিলো। সেখানের প্রথম ক্লাসের ছেলে মেয়েদেরকে আমি ফাজিল পাস করার পর পড়িয়েছি। মদীনাহ থেকে পাস করেও মিল্লাতে শিক্ষকতা করেছি। কিশোরদের যেমন পড়াতাম, কামিলেও ক্লাস নিতাম। কোনদিন মারা লাগেনি, অথচ আমার ক্লাসে কোনদিন গলা চড়িয়ে কথা বলাও লাগেনি। ঐখানে দেখিনি কোন ছেলেকে মার খেতে। লন্ডনে এসে ইবলিস সাহেবের সরাসরি তত্বাবধানে থাকা ইউরোপীয় কিশোরদের পড়াতে গলা চড়িয়েই কাজ হয়ে যেতে দেখেছি।

কিন্তু আমার জীবনে কিছু মারাত্মক দৃশ্য দেখেছি, যা আমার জীবনকে অনেক কষ্টে ফেলে ছিলো। জয়নগর মাদ্রাসায় আমি একবার এক ছেলেকে মারতে দেখেছি বিল্ডিং বানানোর জন্য তৈরি করে রাখা তাল গাছ থেকে নেয়া বড় বড় রড দিয়ে। ছেলেটা ছিলো ইউরোপীয়ানদের মত সাদা। আমি যখন তার ভগ্নিপতির বাসায় যেয়ে তার পাশে বসলাম। এবং তার দুলাভাই ছেলেটার শরীর খুলে খুলে মারের যায়গা গুলো দেখাতে থাকলো, আমি আল্লাহর কসম, সেই দৃশ্য দেখে হাও মাও করে কেঁদে ফেলেছিলাম।

ঢাকায় মিরপুরের এক হিফয খানায় একজন হাফিয ছেলেকে মার খেতে দেখেছিলাম। তাকে মারা হচ্ছিলো ৩টা বেত এক সাথে করে তার দিয়ে পেঁচিয়ে বানানো লাঠি দিয়ে। যার এক একটি আঘাত ঐ ছোট্ট ছেলের রেশমের মত শরীরে বসে যাচ্ছিলো, আর ছেলেটা চিৎকার করে উস্তাযের পা ধরে বিড়ালের মুখে থাকা আধমরা ইদুরের মত কাঁদছিলো। আমি দৌঁড়ে তাকে ছাড়াতে গেলে যে আঘাতটা আমার হাতের একপাশে লাগে, শেষ রাতে উঠলে সেটাও আমার অন্য হাতে ঠেকে এখনো। ২বছর আগে সোয়ানসীতে আমাদের একজন ইমাম তার পিঠে বাংলাদেশের এক হাফিয সাহেবের মারের আঘাতের বর্ণনা দিয়ে মুখটা হাতে দিয়ে ঢেকে রেখে ছিলেন কিছুক্ষণ। যিনি এই ২৭ বছরেও ঐ আঘাত ও আঘাতের সময় শিক্ষকের চেহারা ভুলতে পারেননি। আমি এইগুলোকে অপরাধ মনে করি। কবিরাহ গুনাহ মনে করি। ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ মনে করি। যার হাত এইভাবে নোংরা হতে দেখি তাকে আজীবন শিক্ষকতা করার অনুপযুক্ত মনে করি।

আমি গতবছর বাংলাদেশে যাই। দাওয়াত পাওয়া এক মাদ্রাসায় যাই আমি। বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছি , মা শা আল্লাহ, আমার ছোট কালের প্রতিষ্ঠান আজ কত বড় হয়েছে। সামনের ক্লাসে খুব কম বয়সের একজন শিক্ষকের হাতে দেখলাম লাঠি। তার নোংরা হাত দিয়ে সামনের বোরকা পরা এক ছাত্রীকে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে। ঐখানেই আমি চিৎকার দিলাম, থাম এই মাস্টার। সে যখন থামলো, পাশের আরো দুই মেয়ে বললো এই মাস্টার তাদের এমনই মারে প্রতিদিন। আমি প্রিন্সিপ্যালের রূমে ঢুকলাম। ভুলে গেলাম তিনি আমার শিক্ষক ছিলেন এক কালে, ভুলে গেলাম তিনি আমার স্ত্রীর চাচা, ভুলে গেলাম আমি খুব নগণ্য তার সামনে। কিন্তু বললাম, “এক্ষুণি ঐ শিক্ষককে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেন, না হলে আমি এখানে বসবো না”। আমি জানিনা, ঐ শিক্ষক নামের অমানুষটা এখনো সেখানে আছে কিনা। তবে থাকবে এইটাই সতঃসিদ্ধ, কারণ এই সব শিক্ষক ঢুকে রাজনীতির ছত্র ছায়ায়।

আমি লন্ডনে আসার পরে সর্ব প্রথম ভাই আরমান আলী আমাকে পিজিসিই বা পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন এডুকেশান করতে বলেন। ঐ একই ডিগ্রী আমার রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করা আছে ভেবে আমি ডিলেই করি। কিন্তু ৫ বছর পড়ানোর পরে এই ডিগ্রী করতে যেয়ে বুঝি এটা আমাদের মুসলমান শিক্ষকদের কত দরকার। ক্লাসরূম ম্যানেজমেন্ট, বিহাভিয়ার ম্যানেজমেন্ট, চ্যালেঞ্জিং বিহ্যাভিয়ার এড্রেসিংগুলো এতো উপকারী যে, তা আমাদের দেশে এ সব থাকাই উচিৎ।

আপনারা আবার ভাববেন না, আমি খৃস্টানদের সিস্টেম ফলো করতে বলছি। সত্যি একটা কথা আজ বলি। ডঃ আকরাম চিমা নামের এক পাকিস্তানী গবেষক আছেন, যিনি এ দেশের শিক্ষার মান কন্ট্রোলের সাথে যুগযুগ ধরে কাজ করছেন। তিনি মুসলিম শিক্ষকগণের একটা ট্রেইনিং সেশানে বলে ছিলেন, এ দেশের শিক্ষকদের মান নির্ণয়ে যে স্টান্ডার্ড নির্ধারণ করা হয়েছে, তিনি দ্বায়িত্বে থাকতে তার অনেকগুলো যুক্ত করেছিলেন। এবং সবটাই তিনি কুরআন ও হাদীস থেকেই নিয়ে ছিলেন। এইভাবেই অমুসলিমদের কাছে আসে ইসলামের সুমহান শিক্ষাগুলো। আর আমরা ভাবি ঐ গুলো সব খৃস্টানদের বানানো। অথচ ঐ সব মণিমুক্তা দিয়েই আজ ইউরোপ সাজানো হচ্ছে।

আমাদের দেশে সাধারণ শিক্ষকদের এই সব ট্রেইনিং ইদানিং আলহামদুলিল্লাহ অনেক হচ্ছে। কিন্তু ধর্মীয় শিক্ষকগণকে এটাতে সাহায্য খুব বেশি করা হচ্ছে না। ফলে সেখানে রয়ে যাচ্ছে অনেক অন্ধকার, অনেক জাহিলিয়্যাত।

তবে কেও কেও ইদানিং মাদ্রাসাগুলোতেই এই রোগ দেখাতে চাচ্ছেন।আমি বলি হাঁ, সেখানেও আছে, অন্যখানেও আছে। আমার প্রিয় ছাত্র ছাত্রীরা যেখানেই মার খাবে সেখানেই আমার এই গর্জন।

লেখকঃ ইসলামী চিন্তাবিদ ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন