জো বাইডেনের শপথের মধ্য দিয়ে বিশ্ব রাজনীতি কোন দিকে যাবে?

এম আর রাসেল

জো বাইডেনের শপথের মধ্য দিয়ে বিশ্ব রাজনীতির নতুন এক অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। আমেরিকা ফার্স্ট শ্লোগান তুলে ডোনাল্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছিলেন। এই ৪ বছর নানা কর্মের মধ্য দিয়ে তিনি আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছেন।

সর্বশেষ ক্যাপিটাল হিল হামলায় উসকানি দেয়ায় খলনায়ক হিসেবে বিদায় নিলেন। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ট্রাম্প চলে গেলেও ট্রাম্পিজম থাকবে। ট্রাম্পের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মধ্যে বিভক্তি বেড়েছে। হোয়াইট সুপ্রেমেসিকে তিনি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষাঙ্গদের মধ্যে বৈষম্যে অনেক পূর্ব থেকে থাকলেও ট্রাম্প আমলে তা গতি পেয়েছে। জর্জ ফয়েড মারা যাওয়ার পর ব্ল্যাক লাইভ ম্যাটারস আন্দোলনও নতুন বেগ পেয়েছে। পিউ রিসার্চ ইন্সটিটিউট এর তথ্য মতে, জি-৭ ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বৈষম্যের হার বেশি।

২য় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর নেতা হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিল। ট্রাম্প আমলে সেই নেতামি কিছুটা কমেছিল।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে ট্রাম্প সরে দাঁড়িয়েছে। ইউনেস্কো, হু থেকেও বের হয়ে গেছে। এক সময়ের মিত্র ইউরোপের দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।

ট্রাম্পের নিষেধ সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনের সাথে সম্প্রতি চুক্তি করেছে। ইরানের সাথে করা Joint Comprehesive plan of Action চুক্তি থেকে সরে দাড়িয়েছে ট্রাম্প।

চীনকে চাপে রাখতে ট্রাম্প ইন্দো প্যাসিফিক কৌশল নিয়েছেন। পুরনো মহাদেশীয় তত্ত্ব চালু করে চীনকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনায় ট্রাম্প বেশ সরব ছিলেন। এশিয়া অঞ্চলে ভারতের সাথে বেকা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে কোয়াড গঠন করেছেন। চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধও ছিল ট্রাম্প আমলের আলোচিত ইস্যু।

ট্রাম্প আমলে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো আরব দেশগুলোর ফিলিস্তিন ইস্যুতে ঐক্য বিনষ্ট হওয়া৷ এক সময় আরব দেশগুলো ফিলিস্তিন ইস্যুতে বেশ সরব ছিলেন। এ নিয়ে ইসরাইলের সাথে ৪ টি যুদ্ধও হয়েছে৷ বিদায়ী বছরে ৩ টি মুসলিম দেশ ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে। আরব আমিরাতের পথ ধরে বাহরাইন, মরক্কো অগ্রসর হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের জন্ম দিতে ট্রাম্প জামাতা সফলই হয়েছেন বলা চলে। ইরান-তুরস্ক -কাতার বিরোধী জোট গঠনের কথাও শুনতে পাওয়া যায়।

সর্বশেষ পম্মেও ইয়মেনের হুথি বিদ্রোহীদের সন্ত্রাসী তালিকায় যুক্ত করেছেন। আবার জ্যারেড কুশনার সৌদি-কাতার দ্বন্ধ নিরসনেও ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৭ সালে উপসাগরীয় দেশগুলো কাতারের উপর ১৩ টি শর্ত আরোপ করে অবরোধ আরোপ করেছিল। নতুন চুক্তি হয়েছে কিন্তু কাতার একটি শর্তও মেনে নেয় নি।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে এক নম্বর অর্থনীতির দেশ। পুরো বিশ্ব জুড়েই দেশটি তার প্রভাব বিস্তার করেছে। বিশ্বের ৩৬ টি দেশে তাদের সামরিক ঘাটি রয়েছে।

বিশ্ব নেতার আসন থেকে এখনও যুক্তরাষ্ট্র একেবারেই সরে দাঁড়ায় নি। সামনের দিন গুলোতে অনেক কিছুই ঘটতে পারে। কি ঘটতে পারে বা বাইডেন এর চ্যালেঞ্জগুলো কি হবে সেটাও একটু জেনে নেয়া যাক?

মোটা দাগে যে চ্যালেঞ্জগুলো বাইডেন এর সামনে রয়েছে – তা হল করোনা ভাইরাস ও ট্রাম্পিজম মোকাবিলা, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, বৈশ্বিক নেতৃত্বে ফিরে আসা।

প্রতিটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে বাইডেনকে ভালই বেগ পেতে হবে বলে অনেক বিশ্লেষক মত দিয়েছেন।

নোবলেজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিস সম্প্রতি এক নিবন্ধে লিখেছেন, “যে অবস্থায় ট্রাম্প আমেরিকাকে রেখে যাচ্ছেন, তা কাটিয়ে উঠতে একজন প্রেসিডেন্ট বাইডেন নয়, বরং বেশ কয়েকটি প্রেসিডেনশিয়াল টার্মের প্রয়োজন হবে।” অন্য এক অর্থনীতিবিদ নওরেল রউবিনি বলেছেন, “আমেরিকা বৈশ্বিক অস্থিরতার নতুন কেন্দ্র”।

বিশ্লেষকদের এই তথ্যের সত্য-মিথ্যা নির্ভর করছে বাইডেনের নেতৃত্বের ওপর। জো বাইডেন একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্রের সাথে তার দীর্ঘদিন কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ৮ বছর ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মাত্র ২৯ বছর বয়সে প্রথম সিনেটর নির্বাচিত হন।

১৯৭৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত ডেলাওয়ার রাজ্য থেকে নির্বাচিত সিনেটর ছিলেন। লম্বা সময় সিনেটের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটিতে কাজ করেছেন। চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন। এখন দেখার পালা বাইডেন তার দক্ষতার প্রতিফলন কিভাবে ঘটান?

লেখকঃ আন্তর্জাতিক বিষয়ে কলাম লেখক 

আরও পড়ুন