তিব্বতে চীনের বাঁধঃ নতুন সংকটের পূর্বাভাস

মাহজেবিন  মম

এশিয়ার পানির খনি বলা হয় তিব্বতের মালভূমি কে। সেখানকার নদীগুলোর ৯০% প্রবাহিত হয় চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভারত, নেপাল, ভূটান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সহ মোট ১১ টি দেশে। এসকল দেশগুলোর মিঠাপানি, খাদ্যশস্য ও বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে তিব্বতের নদী গুলো প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে। তিব্বতের আশেপাশের দেশ গুলোর ১৮০ কোটি মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব আছে এখানকার নদী গুলোর।

১৯৫০ সালে চীন তিব্বত দখল করে নেয়। এর ফলে বাকস্বাধীনতা হারায় তিব্বতিরা। চীন তিব্বতের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত কয়েক দশকে চীন একের পর এক বাঁধ নির্মাণ করেছে সেখানে। ভারতের ধর্মশালা ভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্র টিবেট পলিসি ইনস্টিটিউট ফেলো ডেচেব পোলনো বলেন- ‘ চীন গত ৭০ বছরে ৮৭ হাজারেরও বেশি বাঁধ নির্মাণ করেছে৷ এ সকল বাঁধ থেকে উৎপাদিত বার্ষিক বিদ্যুতের পরিমাণ ৩৫২. ২৬ গিগাওয়াট যা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ব্রাজিলের মোট উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ এর পরিমাণের চেয়ে বেশি।

সাংপো বা ব্রহ্মপুত্রে চীনের বাঁধঃ

তিব্বতের একটি নদী ইয়ারলাং সাংপো যা পৃথিবীর উচ্চতম নদী হিসেবে পরিচিত। এটি তিব্বত থেকে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে প্রবেশ করে সিংয় নাম নেয় এবং পরবর্তী তে আসামে ব্রহ্মপুত্র নাম ধারণ করে কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে তিস্তা ব্রহ্মপুত্রে পতিত হয় এবং নিম্ন ব্রহ্মপুত্র যমুনা নাম ধারন করে গোয়ালন্দের নিকট পদ্মার সাথে মিলিত হয়। সাংপো- ব্রহ্মপুত্র- যমুনা বিশ্বের দীর্ঘতম এক নদী।

সম্প্রতি তিব্বতে এই ইয়ারলাং সাংপো নদী তে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষনা দিয়েছে চীন। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে ১৪ তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়( ২০২১-২০২৫) চীন এই ঘোষনা দেয়। এ বিষয়ে পাওয়ার চায়নার সাথে চুক্তিও সম্পন্ন করেছে দেশটি। বর্তমানে চীনের বৃহত্তম বাঁধ ‘থ্রি গর্জেস ‘ যা ইয়াংজি নদীতে অবস্থিত। সাংপো নদীতে নির্মিতব্য বাঁধ টি এই ‘থ্রি গর্জেস’ বাঁধের চেয়েও তিনগুণ বড় এবং পৃথিবীর বৃহত্তম বাঁধ হতে যাচ্ছে। এখানে উৎপন্ন হবে ৬০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ।

ভারত এবং বাংলাদেশের উদ্বেগঃ

চীনের এই ঘোষণার পর থেকে ভারত জুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রে নতুন করে এই মহা বাঁধ নির্মাণের মধ্য দিয়ে জলাধার সৃষ্টি করে পানি অন্যত্র সরিয়ে নিলে ভারতের উত্তর পূর্ব অংশে পানি শূণ্যতা দেখা দিবে। এছাড়া ভারত চীনের সিদ্ধান্তের পাল্টা জবাব হিসেবে অরুণাচলে ব্রহ্মপুত্রের নিচের অংশে আরেকটি বাঁধ এবং জলাধার নির্মাণের ঘোষনা দিয়েছে যেখানে ১০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। বাংলাদেশ ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকা বেশির ভাগ পানি পায় মূলত অরুণাচল প্রদেশের প্রবাহ থেকে। চীনের বাঁধ নির্মাণের ঘোষণার পর ভারতের এমন ঘোষণা বাংলাদেশের জন্য মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভূরাজনৈতিক চাপ এবং পরিবেশগত ক্ষতিঃ

সাংপো নদীতে নির্মিতব্য বাঁধ তিব্বতের মালভূমি এলাকার জীববৈচিত্র্য এবং জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে পরিবেশ বিদগণ ধারণা করছেন। এই বাঁধ তিব্বতের নদীর পানির উপর নির্ভর করা সর্বোচ্চ ধান উৎপাদনকারী ৮ টি দেশের জন্য বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করবে। ফলে খাদ্য শস্য উৎপাদন কমে যাবে। বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর একটি ব্রহ্মপুত্র। এর পানি প্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশের মানুষের জীবননালি শুকিয়ে যাবে।

তাছাড়া চীন এই বাঁধ নির্মানের মধ্য দিয়ে ভাঁটির দেশগুলোকে চাপে রাখতে চেষ্টা করবে। ইতোপূর্বে চীন মেকং নদীতে যে ১১ টি জলকাঠামো তৈরি করেছে, সেসব মিয়ানমার, লাওস, কম্বোডিয়া এবং থাইল্যান্ড ভিয়েতনাম কে চাপে রাখতে ব্যবহার করে। ভারতের সাথে গত বছর চীনের বিরোধ চরমে উঠছিল। সে বিরোধের আপাত সমাধান হলেও যে কোন সময় আবার উসকে উঠতে পারে।

ভারতের আপত্তিকে তোয়াক্কা না করেই চীনের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বলা হয়েছে ‘নিজেদের নদীতে বাঁধ নির্মাণ চীনের বৈধ অধিকার। সাংপো/ব্রহ্মপুত্রের উপর নির্মিতব্য বাঁধ ভারত চীন দ্বন্দ্ব কে আরও একবার উসকে দিবেই বলে ধারণা করা যায়।

শেষকথাঃ

বিশেষজ্ঞদের মতে, তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ হতে পারে পানি নিয়ে এবং জলপথের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে। তিব্বতে চীনের বাঁধ নির্মাণ ভারত -চীন কে যুদ্ধের মুখে ঠেলে না দিলেও পারস্পরিক সম্পর্কের বৈরিতা যে বহুগুণ বাড়িয়ে দিবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। নিজের স্বার্থে নির্মাণ করা চীনের এই বাঁধ যে ভাটির দেশ ভারত এবং বাংলাদেশের জন্য দূর্ভোগ বয়ে নিয়ে আসবে তাও অনুমান করা যায়। নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশ এবং ভারতের উচিত হবে চীনের সাথে আলোচনায় বসে পানিবণ্টন চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের ন্যায্য পানির হিস্যা বুঝে নেওয়া।

লেখকঃ গল্পকার, কলাম লেখক ও ছাত্রী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন