তুরস্ক ও ইরানঃ কোভিড-১৯ বশে আনার কাহিনী

আশরাফ আল দীন

এ বছরের (২০২০) শুরুর দিকে কোভিড-১৯ নামের করোনা ভাইরাস মহামারী আকারে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর সমগ্র বিশ্ব যেন থমকে গেছে! অচল হয়ে গেছে অর্থনীতির চাকা, গৃহবন্দী হয়ে গেছে প্রতিটি মানুষ! এতো মূল্যবান এবং আধুনিক মারণাস্ত্র অর্থহীন হয়ে গেছে, জাহাজ-উড়োজাহাজ কিছুই চলছে না, মিল ফ্যাক্টরি বন্ধ, স্কুল-কলেজ অফিস-আদালত বন্ধ! মানুষ বুঝতে পারছে না প্রতিকারের উপায় কি! এই অদৃশ্য শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য এক এক রাষ্ট্র একেকভাবে প্রতিষেধক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

কেউ কেউ শুরু থেকেই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং সুফল লাভ করেছে। কেউ কেউ এই মহামারীকে রাজনীতিকীকরণ করতে গিয়ে আরো বেসামাল অবস্থায় পড়ে গেছে। কোন কোন রাষ্ট্র নিজেদের স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতাকে আরো বাড়িয়ে নিয়েছে কিন্তু রোগ প্রতিরোধের কাজ তেমন কিছুই করতে পারে নি। কোন কোন রাষ্ট্র সুচিন্তিতভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং তারা এখনো ভালো অবস্থানেই আছে। এ ধরনের দু’টি রাষ্ট্রের উদাহরণ আমি দেবো। তা হচ্ছে, তুরস্ক এবং ইরান।

এই দু’টি রাষ্ট্রকেই শুরুতে প্রচন্ড সংক্রমনের ধাক্কা সামলাতে হয় এবং তাদের মৃতের সংখ্যাও ছিল উদ্বেগজনক কিন্তু এই দুইটি রাষ্ট্রীয়ভাবে সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে কল্যাণমূলক চিকিৎসাব্যবস্থা সৃষ্টি করে এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে এখন তারা এই মহামারীর সাথে বসবাস করছে নিঃশঙ্কচিত্তে। তুরস্কে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার খুবই নীচে চলে এসেছে। দুটি দেশই সফলভাবে সচল রেখেছে অর্থনীতির চাকা।

তুরস্ক
তুরস্কে মহামারীর শুরুর দিনগুলোতে সংক্রমনের হার ছিল অনেক বেশি এবং মৃত্যুর হারও ছিল উল্লেখযোগ্য। ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে তারা যেন চীন এবং ইরানকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছিল! এইসব খবর ব্যাপকভাবে পশ্চিমা মিডিয়ায় প্রচারিত হয়েছে, আমরা দেখতে পেয়েছি। কিন্তু তুরস্ক সরকার অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে এবং ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলায় এগিয়ে গেছে। তুরস্ক শুরু থেকেই ঘোষণা করেছে যে, ৬০ বছরের উর্ধ্ব-বয়স্ক এবং ২০ বছরের নীচে যাদের বয়স তারা কেউ ঘর থেকে বেরোবে না। অন্যরা ঘর থেকে বের হবে নিজেদের সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করে। তুরস্কে মাত্র হাতেগোনা কয়েক দিনের জন্য ‘লকডাউন’ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাতে অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বিবেচনা করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান চাইলেন অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে। মহামারী বিরুদ্ধে তিনি চিকিৎসার মানকে উন্নত এবং বিস্তৃত করলেন। দ্রুত গতিতে অত্যন্ত উন্নত মানের হাসপাতাল গড়ে তুললেন এবং তাতে বেডের সংখ্যা বাড়িয়ে দিলেন। অন্যদিকে, জনগণকে অনুরোধ জানানো হয় সতর্কতার সাথে কাজকর্ম করার, মেলামেশা করার এবং প্রতিরোধমূলক নির্দেশনাগুলো মেনে চলার।

তুরস্কের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। শুরুতেই সরকার একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘বিশেষজ্ঞ টেকনিক্যাল কমিটি’ গঠন করে। তাদের উপর দায়িত্ব দেয়া হয়ঃ এই মহামারী প্রতিরোধে, এবং অদূর ভবিষ্যতে দেশের হেলথ সেক্টরকে উন্নত করে দেশটিকে ‘মেডিকেল ট্যুরিজমে’র জন্য আকর্ষনীয় করে গড়ে তোলার, প্রয়োজনীয় স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে এবং একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে। সরকার সর্বতোভাবে এই কমিটির মূল্যায়নকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং তাদের পরামর্শ মোতাবেক কাজ করেছে।

যেহেতু এই যুদ্ধের শত্রু অদৃশ্য এবং এর বিপক্ষে কোনো প্রতিষেধক ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হয়নি, তাই তুরস্ক কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ কমাতে প্রতিরোধমূলক জিনিসগুলো নিজেরাই উৎপাদন করা শুরু করে।
মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় তুরস্কের বিজ্ঞানীরা নিজেদের দেশে ভেন্টিলেটর আবিষ্কার করে ফেলে এবং সেটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ব্যাপকহারে প্রস্তুত করা শুরু করে। অল্প কয়দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রের প্রয়োজন মিটিয়ে এই ভেন্টিলেটর ইউরোপ এবং আফ্রিকার অনেকগুলো দেশে রপ্তানি করা শুরু করে।
​কোভিড-১৯ এর প্রতিরক্ষামূলক যে সকল জিনিসপত্র, যেমনঃ পিপিই, ফেস মাস্ক, স্যানিটাইজার ইত্যাদি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রস্তুত করা শুরু হয় এবং তা জনগণের মধ্যে বিনা পয়সায় বিতরণ করার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এবং বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোতে উপহার হিসেবে এই সব সামগ্রী পাঠানো হয়। অনেকগুলো দেশে তুরস্ক এইসব সামগ্রী রপ্তানি শুরু করে।
​হাসপাতালের মানকে উন্নত এবং হাসপাতালের বেড সংখ্যা এমনভাবে বাড়ানো হয় যে, কখনোই কোন সংক্রমিত রোগীর চিকিৎসার ঘাটতি হয়নি। একই সময়ে তুরস্ক চিকিৎসকসহ মেডিকেল এইড পাঠায় ইউএসএ, ইউকে, ইতালি, স্পেনসহ অনেকগুলো মারাত্মকভাবে করোনা-আক্রান্ত দেশে।
এখন তুরস্কের লক্ষ্য হচ্ছে, সমগ্র পৃথিবীতে মেডিকেল ট্যুরিজম-এর ক্ষেত্রে সর্ব প্রধান দেশ হওয়ার লক্ষ্য অর্জন করা। বর্তমানে মেডিকেল ট্যুরিজমের পাঁচটি প্রখ্যাত দেশের মধ্যে তুরস্ক একটি।

বর্তমানে, তুরস্কে কোভিড-১৯ মহামারীর অবস্থা হচ্ছে এই যে, তাদের সংক্রমণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে এবং মৃত্যুহার অত্যন্ত নগণ্য পর্যায়ে নেমে এসেছে। করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের জন্য যেসব হাসপাতাল-বেড তৈরি করা হয়েছিল তার শতকরা ৮০ ভাগ এখন খালি পড়ে আছে। লকডাউন না দেয়ার কারণে অর্থনীতির চাকা পুরোপুরি সচল রয়েছে। এসব সম্ভব হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বাত্তক ও সাহসী পরিকল্পনা, সক্রিয় সহযোগিতা এবং মানুষের সচেতনতার কারণে। তুরস্কের এই অসাধারণ সাফল্যের কথা ইদানীংকালের কোন মিডিয়ায় খুব একটা আসেনি।

ইরান
এই বছরের (২০২০) শুরুর দিকে করোনা মহামারীর প্রারম্ভকালে ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে ইরানের অবস্থান ছিল চীনের পরপরই। সংক্রমণ সংখ্যা মারাত্মকভাবে বেড়ে গিয়েছিল, এবং মৃতের সংখ্যাও। অনেক উচ্চ মানের নেতারাও মৃত্যুবরণ করেছিলেন। এইসব খবর আমরা মিডিয়ায় জেনেছি। কিন্তু ইরান সরকার অত্যন্ত ধৈর্য ও সাহসের সাথে এই ক্ষয়ক্ষতিও মারাত্মক পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছে। বর্তমানে ইরান পুরো পরিস্থিতিকে সামলে নিয়েছে এবং বলতে গেলে এখন ইরানে কোন করোনা আতঙ্ক নেই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণীবিতান, অফিস-আদালত সবকিছু খুলে দেওয়ায় ইরানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছিল। যদিও দেশটিতে পুরোপুরি লকডাউন ছিল মাত্র এক সপ্তাহ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুরোপুরিভাবে সচল রয়েছে দেশটিতে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লেও মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে থাকায় মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে কোনো ধরনের আতঙ্ক নেই।আতঙ্ক না থাকার পেছনে আরও কিছু কারণ আছে। কারণগুলো হচ্ছেঃ

এখানে বেশিরভাগ হাসপাতাল-ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে করোনা ইউনিট আছে।
​ডাক্তার-নার্সরা পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী পান। স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনায় মারা গেলে পান শহীদের মর্যাদা আর তাদের পরিবার পায় বিশেষ সুবিধা। সে কারণে ডাক্তার-নার্সরা করোনা রোগীদের এড়িয়ে চলেন না।

ইরানে মাস্ক, গ্লাভস, হ্যান্ড সেনিটাইজার সহজলভ্য। সবখানে তা পাওয়া যায়।
​ইরানের সেনাবাহিনী অসংখ্য অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরি করেছে। কিছুদিন আগে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, করোনা রোগীদের জন্য যে পরিমাণ শয্যা তৈরি করা হয়েছে তার মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগই খালি পড়ে আছে।

গুরুতর করোনা রোগীদের জন্য প্রয়োজন ভেন্টিলেশন সুবিধা সম্বলিত পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ। ইরানে করোনার সংক্রমণ শুরুর পর থেকে প্রতিদিন ৩০টি করে ভেন্টিলেটর তৈরি করা হতো। ফলে ভেন্টিলেটরের অভাবে কোনো রোগী মারা যায়নি।

ইরানের প্রায় সব এলাকায় করোনা টেস্ট কেন্দ্র আছে। আছে ভ্রাম্যমান গাড়িতে টেস্টের সুবিধা। লক্ষণ থাকুক বা না থাকুক যে কেউ চাইলে টেস্ট করাতে পারেন। এখানে আরটি-পিসিআর পদ্ধতির পাশাপাশি র‍্যাপিড টেস্ট কিটও ব্যবহার করা হয়। সেইসাথে সিটি স্ক্যানের মাধ্যমেও করোনা শনাক্ত করা হয়। টেস্টের পর করোনা শনাক্ত হলে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রতিদিন ২২ হাজারের বেশি টেস্ট করা হয়।

যেহেতু চিকিৎসা সুবিধা আছে, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম আছে, মৃতদের পরিবারের পাশে সরকার আছে তাই মানুষের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই। মানুষ যদি পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে তাহলে ইরান একদিন করোনা মুক্ত হবেই ইনশাআল্লাহ।

উপসংহার।
পৃথিবীতে যুগে যুগে মহামারী এসেছে বারবার এবং সংহার করেছে অসংখ্য মানব সন্তানকে। এবারের মহামারীও ভিন্ন কিছু নয়, তবে সংক্রমনের দিক থেকে এর ব্যাপকতা অত্যন্ত বেশি। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এই মহামারী সারাবিশ্বের প্রত্যেকটি জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে। সমগ্র মানব সভ্যতা স্তব্ধ হয়ে গেছে, কারণ মানুষ এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো গড়ে তুলতে পারেনি। সুতরাং মানুষকে সচেতন হতে হবে, রাষ্ট্রশক্তিকে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে এবং যোগ্যতার সাথে সচল রাখতে হবে অর্থনীতির চাকা। কৃষকদেরকে উৎসাহ ও প্রণোদনা দানের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। সরকার যেন সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ না হয়।

মানুষকে নৈতিক হতে হবে। ঘৃণা এবং বিদ্বেষ বাদ দিয়ে ভালোবাসা ও উন্নত চিন্তায় মগ্ন হতে হবে। প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের অনিষ্ট করা থেকে মানুষকে বিরত থাকতে হবে। ঐক্যবদ্ধভাবে মানুষ এগিয়ে যাবে জীবনের পথ ধরে।

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং উপদেষ্টা, পলিসি রিসার্স সেন্টার

মিরপুর ঢাকা ০১. ০৭. ২০২০

 

আরও পড়ুন