নারীমুক্তি আন্দোলনে আজকের সমাজ এবং ইসলাম

নাদিয়া কানিজ

সাম্প্রতিককালে নারীমুক্তির আন্দোলন একটি পরিচিত স্লোগান। আজকের সমাজে নয় বরং সভ্যতার দ্বার উন্মোচিত হওয়ার সাথে সাথেই এ নিয়ে চলছে বিভিন্নমুখী চিন্তা ও প্রচেষ্টা। অধুনা বাংলাদেশসহ বিশ্বের সর্বত্র নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সকলেই হচ্ছেন সোচ্চার। নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন সংগঠন সম্ভাব্য সকল পর্যায়ের কাজ করে যাচ্ছে। তবে অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এত কিছু করেও নারী নির্যাতনের হার কিছুমাত্র না কমে বরং নিত্যনতুন  বাড়ছে।

প্রাচীন কাল থেকে আজ পর্যন্ত সব যুগেই নারীরা নির্যাতিত এবং অবহেলিত মানবগোষ্ঠীর কাতারে। প্রগতিবাদী ও বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী উভয় মহল দ্বারা নারীর মর্যাদা ও অধিকার খর্ব করা হয়েছে, কখনো কম কখনো বেশি। একবিংশ শতাব্দীর অযাচিত জোয়ার নারী স্বাধীনতা ও নারীর অধিকারের নামে নারীদেরকে ঘর থেকে বের করে তাকে পরিণত করেছে বিজ্ঞাপনের মডেল ও কামুক পুরুষের মনোরঞ্জনের বিষয়ে ।

এ যেন আইয়ামে জাহেলিয়াতের পুনরাবির্ভাব। তখন  অতি পবিত্রতার আশায় বস্ত্র খুলে নারী এবং পুরুষ উলঙ্গ হয়ে কাবা ঘর তাওয়াফ করত আর বর্তমান নারীরা বিকৃত পোশাক পরে তাদের চেয়ে হাজার গুন বেশি ভূলুণ্ঠিত করছে নিজেদের মর্যাদা ও সম্মানকে। আধুনিক নারীসমাজের জীবন এবং তৎকালীন আচারের মধ্যে তেমন পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না। যার ফলে তারা সর্বত্র নিগ্রহ, বঞ্চনা, গঞ্জনা, নিরাপত্তাহীনতা, অসম্মান ও অবহেলার শিকার হচ্ছে।

নারী সমাজের বর্তমান অবস্থার কারণ হতে পারে অনেকগুলো। যার ফলশ্রুতিতে নারীসমাজ একটা গোষ্ঠীর কলের পুতুলে পরিণত হয়েছে। তার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হল:-

• অবহেলা
• অজ্ঞতা
• দ্বীন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব
• পাশ্চাত্য রীতির অনুকরণ
• অনৈসলামিক দর্শনের প্রভাব
• সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ইত্যাদি।

ইসলাম নারীদেরকে অধিষ্ঠিত করেছে সম্মানের আসনে। নারীদেরকে দিয়েছে যোগ্য মর্যাদা, সম্মান, নিরাপত্তা এবং অধিকার। একজন কন্যা হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে এবং মা হিসেবেও নারীর সর্বোচ্চ অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে ইসলামে। আইয়ামে জাহেলিয়াতের সময় যখন কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হচ্ছিল তখন আল্লাহ তার পবিত্র কালামে বলেন- “তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা করে দেন বন্ধ্যা।” – (সূরা শুরা: আয়াত ৪৯-৫০)

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) ছিলেন কন্যা সন্তানের পিতা। তিনি তার কন্যাদেরকে কখনো অবহেলা বা নির্যাতন করেননি বরং ভালোবেসে বড় করেছেন। হাদীসে এসেছে-

‘রাসুল স. বলেন, “যে ব্যক্তি দুইজন কন্যা সন্তানকে লালনপালন ও দেখাশুনা করল (বিয়ের সময় হলে ভালো পাত্রের কাছে বিবাহ দিল) সে এবং আমি জান্নাতে এরূপ একসঙ্গে প্রবেশ করব যেরূপ এ দুটি আঙুল।” তিনি নিজের দুই আঙুল মিলিয়ে দেখালেন। – (জামে আত তিরমিযী, হাদীস ১৯১৪)

তাহলে আমরা অনুধাবন করতে পারি ইসলামে কন্যা সন্তানকে বা সন্তান হিসেবে নারীকে কতটুকু মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। নারীকে জাহেলিয়াতের যুগের মত দুর্ভাগ্য হিসেবে বিবেচনা তো নয়ই বরং তার লালন-পালনকারীকে জান্নাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। পিতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে দিয়েছে অধিকার।

ইসলাম স্বামীর কাছে স্ত্রীর স্বতন্ত্র অধিকার ও মর্যাদার কথা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করে। রাসুল স. চরিত্রবান স্ত্রীদের প্রতি সদয় ব্যক্তিকে পূর্ণ ঈমানদার হিসেবে অভিহিত করেছেন। এক্ষেত্রে আল্লাহ বলেন-“স্ত্রীগণ তোমাদের ভূষণ আর তোমরা (স্বামীগণ) তাদের জন্য ভূষণ।” – (সূরা বাকারা: আয়াত ১৮৭)

যেখানে অন্যান্য ধর্মে স্ত্রীদেরকে শুধুমাত্র কামলালসা ও ভোগের বিষয় বলে মনে করা হতো সেখানে ইসলামে নারীদেকে স্ত্রী হিসেবে অনেক বেশি সম্মান করা হয়েছে। যৌতুক নিয়ে নয় বরং নারীর আত্মমর্যাদার স্বীকৃতিস্বরূপ মোহরানা আদায়ের মাধ্যমে নারীদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি বক্তব্য হলো- স্বামীর পায়ের তলে স্ত্রীর জান্নাত। কিন্তু ইসলাম এটিকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। বরং পুরুষের চারিত্রিক সনদের কর্তৃত্ব তার স্ত্রীর কাছে। রাসুল স. বলেছেন,

“তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি উত্তম যে স্ত্রীদের কাছে উত্তম।” – (জামে আত তিরমিযী, ১১৬২)

আবার মা হিসেবে নারীদেরকে মাতৃত্বের গৌরব ও মর্যাদার স্বীকৃতির নমুনা আমরা অনুধাবন করতে পারি মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত নিশ্চিতের মধ্য দিয়ে। সূরা বনী ইসরাঈলের আল্লাহ বলেন,“আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার করবে।”

সর্বাবস্থায় মায়ের সাথে ভালো ব্যবহারের নির্দেশ পাওয়া যায় সূরা লোকমানে। যেখানে আল্লাহ বলেন,

“মা-বাবা মুশরিক হলেও তাদের সাথে পার্থিব জীবনে সদাচার করবে।” – (সূরা লোকমান: আয়াত ১৫)

রাসূল সা. তাঁর উম্মতদেরকে মায়ের সাথে সদ্ব্যবহারের কথা বলেছেন এবং তাদেরকে বৃদ্ধ বয়সে সেবা-যত্ন করার কথা বলেছেন । এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, লেন-দেন, শিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা এবং সমগ্র জীবনে পুরুষের ন্যায় নারীর অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। উত্তরাধিকারী হিসেবে নারীর ন্যায্য অধিকার দেওয়া হয়েছে। এভাবে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ইসলামে।

কিন্তু দুঃখের বিষয় আজকের নারীসমাজ ইসলাম থেকে সরে এসে, দ্বীনের পথ থেকে সরে এসে তথাকথিত আধুনিকতার নামে নিপতিত হচ্ছে নব্য জাহেলিয়াতে। তবে এর দায় শুধু তাদেরই নয়, যারা ইসলামকে আঁকড়ে ধরেছে, তাদের উপরেও দায় বর্তায়।

ইসলাম একটা মিশনারী ধর্ম, একটা জীবন ব্যবস্থা। অথচ আমাদের সমাজের অধিকাংশ মুসলিম পরিবারে নারীর অধিকার নিশ্চিত করা হয় না। যা ইসলাম গর্হিত অপরাধ। কিন্তু ইসলামী ব্যক্তিত্ব, ইসলামী দাওয়াতে নিযুক্ত সংগঠনগুলো এসব বিষয়ে কোন আলোকপাত করেন না। ফলে গ্রামীণ নারীই হোক অথবা শহুরে, কিংবা স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উঠতি তরুণী সবাই বিভ্রান্ত হচ্ছে। আটকে যাচ্ছে বিভিন্ন মতবাদের জালে।

লেখকঃ কলাম লেখক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন