নারীর জয়গান….

-মো ইব্রাহীম খলিল

নারীদের নিয়ে যে দিবস, তাকেই নারী দিবস বলে। প্রতি বছরই নারী দিবস আসে,দিনটিকে নিয়ে সবাই সোচ্চার হোন।দেশের নারীবাদী কলামিস্টরা এই দিবসকে নিয়ে সভা সেমিনার করে থাকে। দিবসটিকে কেন্দ্র করেই মহিয়সী কিছু নারীকে ফুলেল সংবর্ধনা দেওয়া হয়। নারীকে নিয়ে শ্রদ্ধার কথা মালার ফুলজুড়ি ফুটে সবার মুখে মুখে। এক সময় দিনটা শেষ হয়ে যায়।পরের দিন ফুল গুলি শুকিয়ে যায়। উদ্যাপনকারীরা ভাবে,বেশ ভালোই কাটলো দিবসটি।সত্যি বলতে কিছুই পরিবর্তন হয়না। আগে যেমনটি ছিলো,তেমনটিই আছে। এবং এই ধারাবাহিকগা চলতেই থাকবে।
আমাদের এই তরুন প্রজন্মের অনেক টিনএজ ছেলে মেয়েরাই জানিনা,নারী দিবসের আদি সূচনার উৎপত্তি কোথা থেকে?
সেই ১৮৫৭সাল থেকেই মজুরি বৈষম্য,নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা আর কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে প্রথমবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় নামলেন একঝাক নারী কর্মজীবিরা।তাদের এই আন্দোলনের জের ধরেই ১৯১১সাল থেকেই নারীদের সম অধিকার আদায়ের লক্ষে এই দিনটি পালিত হয়।

নারী দিবস নিয়ে কতো মত,কতো তর্ক, কতো বিতর্ক সভা সেমিনারে আলোচিত এবং সমালোচিত। কিন্তু তবুও থেমে থাকেনি নারী দিবসের শ্লোগান।

“প্রজন্ম হোক সমতার/সকল নারীদের অধিকার। “

সত্যি বলতে শ্লোগান গুলো সবই মৌখিক শব্দচয়ন। এগুলো গোল টেবিলে বসে মুখ আউরিয়ে নারীদের স্বপক্ষে একটু স্বজনপ্রীতি গুনগান ছাড়া আর কিছুই নয়।
নারীদের শান,মান,তাদের ত্যাগ এবং সংগ্রামী কাব্যগাঁথা গুলো আর সেইরকম ভাবে উপস্থাপন হয়না। এগুলো এখন হয়ে গেছে একচেটিয়া। বিশেষ করে আমাদের দেশেই নারী দিবসটা একটি পোশাকি হিসাবে ভাবা যেতে পারে। একটি দিন কিছু আনুষ্ঠানিকতা,সভা আর বক্তব্য দিয়েই সেরে ফেলা হয় সকল দায় দায়িত্ব। যেসব বক্তব্যে নারীদের স্বপ্ন দেখালেও বাস্তবতায় মাকাল ফল ছাড়া আর কিছুই নয়। এসব বক্তব্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনেনা। এগুলো শুধু শ্রবনই করে যেতে হয়। নারী দিবস যেই ভাবনা আর সংগ্রাম থেকে উথ্যাপিত হয়ে আসছে,তার জৌলুস আর এখন মোটেও দেখা যাচ্ছেনা। কারন, একদিনের আনুষ্ঠিকতা শেষে পরের দিন আর কিছুই করা সম্ভব নয়।
নারীরা এখন আর গৃহ বন্দিও নয়। তারা আজ বিশ্ব জয়ও করতে সক্ষম হয়েছে। এটা একটি বড় সাফল্যও বটে। একটি চক্র মনে করে, নারীদের গৃহে আবদ্ধ করে রাখা ঠিক নয়,আরেক দল ভাবে,অবশ্যই তারা গৃহের কোণেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তারা পুরুষের সমতালে বহিঃবিশ্ব পরিভ্রমন করতে পারবে না। এরা পতি সেবা আর ধর্মের ভেড়াজালেই আবদ্ধ থাকবে। ধর্মকে ইস্যু করে এই নারীদেরও একদল দমিয়ে রাখার শ্লোগান তৈরি করে। আর এটা নিয়েই চলে আরেক প্রতিপাদ্য বাণী। এক সময় উভয় দলের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে নারী উন্নয়নের ভীত্ গুলো পিষ্ট হয়ে যায়। সংকুচিত হয় নারী উন্নয়নের সমস্ত স্বপ্ন এবং সফলতা গুলো।
বহিঃবিশ্বের দিকে তাকালে আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি,উন্নয়নশীল দেশের নারীরা আজ কতো উচঁতে পদার্পন করছে। তারা শুধুই শিক্ষিত নন,বরং বিজ্ঞান মনস্ক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে-“আমরা নারীরাও পারি “।
তাদের চলার পথে সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি বাঁধা হয়ে দাড়ায়নি বলেই আজ তারা আন্তজার্তিক মহলে গোল্ড মডেল হিসাবে বিবেচিত।

আমাদের বাংলাদেশ একটি নারী ক্ষমতাসীন দেশ হলেও এখানে অনেক মিশ্র প্রভাব কাজ করে,যার ফলে নারী উন্নয়নের পথে অনেক কন্টক অতিক্রম করতে হয়।
আমাদের দেশের নারীরা স্বপ্ন গুলো তাদের মতো করে বুনন করতে অক্ষম। নারীরা মনে করে  পুরুষের বাহুবলেই সব। কিন্তু তারা এটা ভুলে গেছে,নারীর ক্ষমতায়ন পুরুষের হাত ধরে কখনোই হয় না। সেক্ষেত্রে তা পুরুষের শর্তানুযায়ী হয়। ফলে প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথ  রুদ্ধ হয়ে যায়। নারীর নিজেকেই এগিয়ে আসতে হবে নিজের ক্ষমতায়নের জন্য।
মারীকে নিয়ে ব্যবসা নয়। এটা নারী অধিকার এবং সম্মান রক্ষায় আদৌ কোনো ফল আসে না। যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নারীকে  ভোগ্য পণ্য হিসাবে দেখে ও দেখায়,তারাই দেখা যায় বড় করে একটি দিন নারী দিবস পালন করছে। কিন্তু আমাদের দেশে নারীকে সবসময় সম্মানিত দৃষ্টিতে দেখা হয়। শুধু পশ্চিমা সংষ্কৃতির আগ্রাসনে এদেশে নারী নির্যাতনের প্রভাবটা বেড়েছে।

তাই এক দিনের জন্য নারী দিবসের আনুষ্ঠানিকতা নয়,প্রয়োজন সারা বছর নারীকে সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় যথেষ্ঠ ভূমিকা রাখা।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক। 

আরও পড়ুন