পাহাড়ের কান্না

গতমাসে আমি এক ট্যুর গ্রুপের সাথে মহেশখালী দ্বীপ এ গিয়েছিলাম। বেশ মনোরম পরিবেশ ।
আর ওখানকার মানুষগুলোও বেশ সহজ-সরল।

ওখানে পৌঁছার পর যে যার মতো ঘুরতে লাগলাম।
আমিও ঘুরতে ঘুরতে আদিনাথের মন্দির থেকে কিছুটা দূরে দুটো দোকান দেখে দাঁড়ালাম।
উপজাতিদের দোকান।
ওখান থেকে একটা পানি আর কিছু খাবার কিনে দোকানের বেঞ্চিতে বসেই খাচ্ছিলাম
আর দোকানদারের সাথে কথা বলছিলাম।

আমার পাশের বেঞ্চেই আরও একজন ভদ্রমহিলা বসা (উনিও উপজাতি’ই)।
ওনার কাপড় চোপড়ে ময়লা,চুলগুলো এলোমেলো।
দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো হয়তো মানসিক বিকারগস্ত।

আমার খাবারের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ,
ওনাকে জিজ্ঞেস করলাম ‘খাবেন…?’
তারপর একটা কেক দিতে অনায়াসেই সেটা নিয়ে নিলো।
দোকানদার এটা দেখে ওনাকে তাড়িয়ে দিলেন।
যাওয়ার সময় বিশ্রী অঙ্গভঙ্গি করে অস্পষ্টভাবে একটা শব্দ বলে গেলেন ‘বেঈমান’

একটু আগ্রহ নিয়েই দোকানদার ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম ‘এনাকে আপনি চিনেন ?’

উনি বললেন,
– হ্যাঁ,ও তো মুমুঁ। এই এলাকার ই মেয়ে।
তিন-চার বছর থেকে এমন পাগলামি করে।
মাঝেমধ্যে ঠিক হয়,আবার কিছুদিন পর এমন পাগলামি শুরু করে।

– ও আচ্ছা;

– তো ওনাকে মানসিক ডাক্তার মানে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখান না কেনো ?

– কে দেখাবে, আছেই বা কে ওর ?

ওর বাপটাও গত বছর মারা গেলো।
এবছর আবার ওর ভাই হিমেল সাগরে গিয়ে আর ফেরেনি।
তাই এমনেই ঘুরে ফিরে।
কেউ কিছু দিলে খায় আর নয়তো না।

– ওহ।

চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করা আর ফরেনসিক মেডিসিনে সামান্য জ্ঞান থাকায় আমার আবার খুঁতখুঁতে স্বভাবটা একটু বেশি।
সবকিছুতেই কারণ খোঁজার চেষ্টা করি।
আর নিজের লব্ধ জ্ঞানের সাথে মেলানোর চেষ্টা করি।
আসার আগে দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম,ওনার কি জন্য এমন মাথাখারাপ হয়েছে বলতে পারেন ?

এবার ভদ্রলোক বললেন,
সে অনেক বড় কাহিনি।

আমি আগ্রহ দেখালে উনি বলা শুরু করলেন,
তা তো অনেক আগেকার ঘটনা।
আট কি ন’বছর এমন হবে।
মেয়েটার বিয়েও ঠিক হয়ে গিয়েছিল।

একদিন বিকেলে ওর মা-বাবা মন্দিরে গিয়েছিল প্রার্থনা করতে।
ও বাড়িতে একা ছিলো।
ঘন্টাদেড়েক পর ওনারা বাড়িতে এসে দেখেন
মেয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছেন।
পড়নের কাপর চোপড়ও ঠিকঠাক নেই।
আমরা ওর চোখমুখে জল ছিটিয়ে দিলাম।
হাসপাতালে নিলাম।
এরপর ওর হুঁশ ফিরলে জানতে পারি,
স্থানীয় তিনটা বাঙালী বখাটে ছেলে ওইদিন বিকেলবেলা ওদের বাড়িতে এসে ঘরের দরজা বন্ধ করে হাত-পা বেঁধে ওকে ধর্ষণ করে।
ওদের মধ্যের একজন নাকি কিছুদিন আগে থেকেই ওকে রাস্তাঘাটে দেখলেই উলটা পালটা কথা বলতো।
এরপর ওই বিয়েটাও বাতিল হয়ে যায়।
আসলে এই ঘটনার পরে ওকে আর কেউই বিয়ে করতে রাজি হয়নি।

আমি লক্ষ করছিলাম কথাগুলো বলতে গিয়ে ভদ্রলোকের কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে।

কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম।

তারপর আবার জিজ্ঞেস করলাম,
ওদের কোনো বিচার হয়নি ?

মুখে পান নিয়ে হাসতে হাসতে দোকানি ভদ্রলোক বললেন,
– বিচার;
কে করবে বিচার ?
একমাত্র সৃষ্টিকর্তা যদি কিছু করেন….!

ওহ,মাসখানেক পর শুনেছিলাম কারা যেন ওদের বাড়িতে দশ হাজার টাকা দিয়ে গেছে।
আর বলে গেছে এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে বার্মা পাঠিয়ে দেবে।

– আপনারা তো চাইলে সবাই এটার প্রতিবাদ করতে পারতেন !

– সবারই জানের মায়া আছে বাবা।
এটা নিয়ে দু’চার কথা বলে আবার বিপদে পড়তে চাইনা।
আপনি তো দূরের মানুষ তাই আপনাকে বললাম।

ততক্ষণে মোবাইলের রিংটোন বেজে উঠলো
‘কোথায় আছিস, ঘাটে চলে আয়।
যাওয়ার সময় হয়েছে।

পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল,
বছর দুয়েক আগে একবার একটা পাহাড়ি মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল।
পাহাড়ের সবাই মোমবাতি জ্বালিয়ে বিচার চাইছিল।

কিছুদিন পর সেটা ঠিকই ধামাচাপা পড়ে যায়।

ওই যে একটা লাইন আছে না,
‘চিৎকার কর মেয়ে দেখি কতদূর গলা যায়,
আমাদের শুধু মোমবাতি হাতে নিরব থাকার দায়”

আর পাহাড়ের খবর শহর অব্দি তো আসেও না।
ওদের দুঃখগুলো একান্তই নিজস্ব।

এর ঘন্টাদুয়েক পর হোটেলে ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম।
হঠাৎ ই মুমুঁ’র উচ্চারিত ওই অস্পষ্ট শব্দটা মনে পড়লো ‘বেঈমান’

ওইদিন বিকেল,রাত এমনকি এরপর থেকে এখনও পর্যন্ত ওই শব্দটা আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।
মুমুঁর সাথে যে ঘটনাটি ঘটেছিলো,সেখানের অপরাধীগুলোও আমার মতোই বাঙালি।
বিচারের নামে ভয় দেখিয়ে যারা দশ হাজার টাকায়
কিনে নিতে চেয়েছিল একটা নিরপরাধ মেয়ের জীবন।
তারাও আমার মতোই বাঙালি।
তাই দায়টা আমারও।
আচ্ছা,একটা মেয়ের জীবনের মূল্য কি এতই নগন্য ?
একজন মানুষের জীবনকে,তার সমস্ত স্বপ্নকে শেষ করে দিয়ে দশ হাজার টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়া।
এর থেকে বেশি পরিতাপের,পরিহাসের কিছু কি আদৌ হতে পারে…?

[] লেখকঃ হাসিবুর রহমান ভাসানী,কবি,সাহিত্যিক ও মেডিকেল স্টুডেন্ট।

আরও পড়ুন