বাবার মেয়েদের জন্য বাংলাদেশ হউক নিরাপদ

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ

আজ আমি একজন মেয়ের বাবা। এটা কেমন সুখের পরশ মাখা পরিচয় তা বুঝানো যাবে না।আল্লাহ এর কাছে আমি যদি খুব গভীর ভাবে কিছু চেয়ে থাকি তা হলো আমার মেয়েকে।আমি সবসময় বলতাম আমি শুধু একটা মেয়ের বাবা হতে চাই।আমাদের সৃষ্টিকর্তা অসীম দয়ালু,কেউ খুব গভীর ভাবে কিছু চাইলে তিনি নিরাশ করেন না।

আমি আমার মেয়েকে ভালবাসি।কতটা ভালবাসি তার পরিমাপ করার যন্ত্র পৃথিবীতে আবিস্কার হয়নি।
সন্তান হলো মায়া।আর মেয়ে সন্তান সেই মায়ার সমুদ্র।হয়তবা আমি কিছুটা স্বার্থবাদী মানুষ সেজন্যই মেয়েকে চেয়ে নেওয়া আল্লাহ এর কাছ থেকে।

মেয়েদের চেয়ে এত গভীরভাবে বাবাদের কেউ ভালবাসে না।আমরা বাবারা খুব সাধারণ।আমাদের অনুভূতি অনেক সময় রুক্ষতায় ভরা থাকে।
আমাদেরকে আমরা বুঝাতে পারি না অনেক সময়।

কিন্ত আমি দেখেছি মেয়েরা ঠিক বুঝে বাবাদের গোপন বিষাদ।“Behind every great daughter is a truly amazing dad.”বাবারা হলেন মেয়েদের সাহস ও শক্তি।মেয়েরা বাবাকে স্ট্যান্ডার্ড ধরেই পৃথিবীর সকল পুরুষ কে বিবেচনা করতে শিখে।সব কিছুতেই মেয়েরা বাবার ছায়া খুঁজে।একজন বাবাই একটা মেয়ের জীবনের প্রথম পুরুষ এবং সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী পুরুষ।

একটা কথা আছে “Angels are often disguised as daughters.”

আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প হৈমন্তী পড়েছি।হৈমন্তীর বাবার বন্ধু ছিলেন বনমালী বাবু।তিনি যখন হৈমন্তীর বাবাকে বলিলেন,সংসারে তো একটি মেয়ে ছাড়া তোমার আর কেউ নেই।এখন মেয়ের শ্বশুর বাড়ির কাছে একটা বাড়ি করে থাকো।
তখন হৈমন্তীর বাবা বলেছিলেন, ” যাহা দিলাম তাহা উজাড় করিয়াই দিলাম।এখন ফিরিয়া তাকাইতে গেলে দুঃখ পাইতে হবে। অধিকার ছাড়িয়া দিয়া অধিকার রাখিতে যাইবার মত এমন বিড়ম্বনা আর নাই।”

বাবারা মেয়েদের কাছে কিছু প্রত্যাশা করেন না।।মেয়েদের প্রতি উজাড় করা ভালবাসা পৃথিবীতে আর কেউ দেখাতে পারে না।মেয়েরাও বাবার ন্যাওটা।
এই বাবা মেয়ের পবিত্র সম্পর্ক ও তার অনুভূতি প্রকাশ করার মত জ্ঞান ও শব্দ আমার ভান্ডারে নাই।

আমি একজন ডাক্তার মেয়েকে চিনি।সে বিবাহিত কিন্ত সেপারেটেড।তার স্বামীর সাথে তার কয়েক বছর যোগাযোগ নাই।তার বাবা বলছেন, আমার বংশে ডিভোর্স বা দ্বিতীয় বিয়ে নাই।।সুতরাং তুমি এই বিবাহিত সম্পর্ক থেকে বের হতে পারবে না।আমি জানি এটা অকার্যকর একটা সম্পর্ক।
এটা থেকে বের হলেই মেয়েটার মুক্তি।
কিন্ত সে তার বাবাকে এত বেশি ভালবাসে যে বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধ সে নিজ সুখ নিয়ে ভাব্বে না।মেয়েটার বিষাদ আছে, নিশ্চয়ই সেও গভীর রাতে একা কবিতা শুনে, অশ্রুসিক্ত হয়, তার ভেতরে অব্যক্ত হাহাকার কাউকে বুঝতে দেয়না।আমি তার বাবাকে দোষ দিতে পারি কিন্ত বাবার প্রতি মেয়েটার সম্মান ও ভালবাসা নিঃসন্দেহে আমাকে আপ্লুত করে।

গত বছর রাজশাহী ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষায় এক ছবি ফেসবুকে ছড়িয়েছিলো।মেয়ে পরীক্ষা দিচ্ছে।।ক্লান্ত শ্রান্ত বাবা গাছের নীছে ঘাসের উপর শুয়ে আছেন।সেই ছবিটা আমাকে এত গভীর ভাবে স্পর্শ করেছে, তা বলে বুঝাতে পারবো না।।

আমার কাছে কত রুগী আসে।আমি তাদের চিকিৎসা দেবার পাশাপাশি তাদের জীবনের গল্প শুনি।বাবারা অসুস্থ হলে মেয়েদের হাহাকার ও আহাজারি আমি যেভাবে দেখেছি,ছেলেদের মাঝে তেমন দেখিনি।

আরেকজন মেয়ে ডাক্তার কে জানি আমি।তার বাবা অসুস্থ।অনেক রোগে ভুগছেন।কোভিড ১৯ এর এই সময়ে সেই চিকিৎসক একজন ফ্রন্টলাইন ফাইটার।বাবা আক্রান্ত হবেন সেজন্য মেয়েটি বাবার বাসার সামনে আলাদা বাসা ভাড়া করে থাকে।বাবাকে কোনভাবেই সে রিস্কে ফেলতে চায়না।
কোন ছেলে এমন করে বাবাকে নিয়ে ভাবে আমার জানা নেই।

আমাদের বাসায় অঘোষিত ডন হলো আমাদের গোল্ডেন সিস্টার আফসানা।সে আমার থেকে ১৯ বছর এর ছোট।আমরা বাবার ভয়ে তটস্ত থাকি এখনো কিন্ত আব্বা তার ভয়ে অস্থির থাকেন সারাক্ষণ।আমি খুব আনন্দ চিত্তে আমার বাবার আর ছোট বোনের খুনসুটি দেখি।।সে বাবাকে শাসন করে,বকা দেয় আবার বাবাকে নিয়ে অন্য ভাইবোন কিছু বললে সেই বেশি রিয়েক্ট করে।।

কাটেনা সময় যখন আর কিছুতে
বন্ধুর টেলিফোনে মন বসেনা
জানালার গ্রীলটাতে ঠেকাই মাথা
মনে হয় বাবার মত কেউ বলে না
আয় খুকো আয়
আয় খুকো আয়।।

সিনেমা যখন চোখে জ্বালা ধরায়,গরম কফির মজা যখন জুড়িয়ে যায়, কবিতার বই গুলো ছুঁড়ে ফেলে মেয়েটি অপেক্ষা করে বাবার ডাকের।

আজকের পৃথিবীতে মেয়েদের পথ চলা এখনো কন্টকহীন নয়।।পথে পথে বিপদ।আমাদের সমাজটা অসুস্থ।
মানুষ বিকারগ্রস্ত।এমন সমাজে একজন মেয়েকে মানবিক ও আত্মমর্যাদাশীল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তুলতে বাবাদের নিতে হবে অনেক দায়িত্ব।।

আমার মেয়ের বয়সী পৃথিবীর সব মেয়েই আমার মেয়ে।আমার মেয়েকে আমি যেমন ভালবাসি,স্নেহ করি,তেমন ভালবাসা ও স্নেহময় চোখ যদি অন্যের মেয়ের প্রতি দেওয়া যায় তবে মেয়েদের জন্য আগামী হবে সুন্দর ও সুখকর।।

পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে কিন্ত একজন খারাপ বাবাও নেই।ব্যতিক্রম উদাহরণ আমি জানি।।
সেই উদাহরণ টেনে আমি পৃথিবীর ভালো বাবাদের বিব্রত করতে চাই না।।

বাবারা বটবৃক্ষ, দায়িত্ব এড়াতে জানেনা বাবারা।বাবাদের ছায়ায় নিরাপদ হউক আমাদের সন্তানদের জীবন।

লেখকঃ কলামিস্ট ও ডাক্তার

 

আরও পড়ুন