বাল্যবিবাহ বিরোধ এবং অতঃপর

রুকাইয়া সুলতানা মুন 

আমি যদি আজকের দিনে দাড়িয়ে বাল্য বিবাহের পক্ষে কথা বলি তাহলে সবাই রে রে করে উঠবে।কেউ মারমুখি হয়ে তেড়ে এলেও অবাক হব না।এখন আধুনিক যুগ। মানুষ বাসা বেঁধেছে মহাকাশের অসীম শূন্যে । পৃথিবী এগিয়ে গিয়েছে জ্ঞান বিজ্ঞানে, চিকিৎসায়, শিক্ষায়।কিন্তু কতদূর যেতে পারি আমরা?আমারা প্রাকৃতির নিয়ম কি ডিঙিয়ে যেতে পারি?না তাতে মঙ্গল আছে?

তাহলে একটা গল্প শুনুন। তারাবানু আর ফুলবানু দুই বোন ছিল। একজনের বয়স নয় এবং অন্যজনের বয়স সাত।বাবার মৃত্যুর পর ভাইয়েরা বড় বোনের জন্য বিয়ে ঠিক করল।ওদিকে ছোট বোনের জন্যও পাশের গ্রামের ভালো গৃহস্তঘর থেকে বিয়ের পয়গম আসল।অভিবাবকেরা সানন্দে রাজী হয়ে গেল।দুই বোনের একই দিনে মাঝারি অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিয়ে হয়ে গেল। পালকি চড়ে তারা যার যার শ্বশুরবাড়ি চলে গেল।
বড় বোন বিয়ের ব্যাপারটা কিছুটা বোঝে।কিন্তু ছোটবোন তো একেবারেই নাবুঝ। পুতুল খেলার বয়সে সে স্বামী সংসারের কি আর বুঝবে?
ফুলবানু বিয়ের দিনেই ঘটালো এক কান্ড! বাসর ঘর থেকে নতুন বৌ লাপাত্তা।সারাবাড়ি খুঁজেও তার হদিস পাওয়া গেল না।পরদিন সকালে তাকে খুঁজে পাওয়া গেল পাশের বাড়ির ঢেঁকি ঘরে আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে।

গায়ে পেঁচানো জড়ির শাড়ি, সোনা রূপার গহনা আর স্বামীর বাড়ির নতুন পরিবেশ, সব মিলিয়ে তার ফাঁপর লাগছিল। ইচ্ছে করছিল তার নিজের বাড়ি চলে যেতে।বুবুর গলা জড়িয়ে ঘুমাতে।কিন্তু বুবুতো তার শ্বশুর বাড়ি চলে গেছে। তাছাড়া কাউকে কিছু না বলে বাড়ি চলে এসেছে শুনলে ভাইয়েরা বকবে।তাই সে বকার ভয়ে বাড়ি না গিয়ে বুবুর প্রতি বুকভরা অভিমান নিয়ে প্রতিবেশীর ঢেঁকি ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে। সকাল বেলা স্বামী আর শ্বাশুরী খুঁজে পেয়ে তাকে বাড়ি নিয়ে গেল।ভাইয়েরা শুনে খুব বকাঝকা করল।কিন্তু স্বামী স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলল, তোমার যখন বাপের বাড়ি যেতে ইচ্ছে করবে যাবে।কিন্তু আমাকে বলে যেও।

এরপর ফুলবানুকে তার স্বামী প্রায়ই বাপের বাড়ি বেড়ানোর জন্য রেখে আসত।কবর কবিতার দাদুর মত সে তার বালিকা বধূর জন্য পুঁতির মালা, বাতাসা , জিলাপি, কাচের চুড়ি কিনে আনত হাটের দিনে।ফুলবানুও ধীরে ধীরে সংসারে মনোযোগী হয়ে ওঠে।তবুও সে মাঝেমধ্যে উনুনে রান্না ফেলে বাড়ির অন্য ছেলেপুলের সাথে খেলতে চলে যেত।পুকুর ঘাটে নাইতে এসে সাঁতরে সারাগায়ে কাদার প্রলেপ নিয়ে বাড়ি ফিরত।কখনো শ্বাশুড়ি বকা দিতেন আবার কখনো ছেলেমানুষ ভেবে পাটের আঁশের মত লালচে চুলগুলোকে তেল দিয়ে আঁচড়ে লাল ফিতে বেঁধে দিতেন।
তারপর?তারপর সময়ের ব্যবধানে অন্যদের মতো ফুলবানুও স্বামী সন্তান নিয়ে ভরা সংসারের দায়িত্ব মাথায় তুলে এগিয়ে গেছেন জীবনের পথে।

যে গল্পটি বললাম, সেটি গল্প মনে হলেও আসলে এটি সত্য ঘটনা। আমার মায়ের দুই ফুপুর ঠিক এমনি করেই বিয়ে হয়েছিল।যাদের দাদি নানি বেঁচে আছে, জিজ্ঞেস করলে জানবেন তাদেরও সবার পুতুল খেলার বয়সেই বিয়ে হয়েছিল।কয়েকযুগ পেছনে গেলে দেখবেন এটাই ছিল তখনকার স্বাভাবিক বাস্তবতা।

কিন্তু এইদিনে এসব চলবে না।মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত হতে হবে, আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।তারপর বয়স তিরিশ পেরিয়ে গেলে বিয়ের ভাবনা ভাবতে হবে।আবার একটা ছেলেকে পড়াশোনা শেষ করে ভালো চাকুরি করতে হবে অন্তত পাঁচ বছর।অতঃপর ছত্রিশ কিংবা আটত্রিশ বছর বয়স হলে তার বিয়ের জন্য পাত্রী দেখা শুরু হয়।খুঁজতে খুঁজতে আরও দুই তিন বছর পেরিয়ে যায়।পড়াশোনা অবস্হায় একটা ছেলের বিয়ের কথা তো ভাবাই অনুচিত।তথাকথিত আধুনিকতা এটা আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু আমার প্রশ্ন হল জোয়ারের পানি কি বাঁধ দিয়ে আটকানো যায়? আমাদের দেশে একটা ছেলে কিংবা মেয়ে ঠিক কোন বয়সে যৌবন প্রাপ্ত হয়? আর আমরা কোন বয়সে তাদের বিয়ের উপযুক্ত মনে করি? যৌবনের পড়ন্ত বেলায় আমরা তাদের বিয়ের অনুমতি দেই।কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছি কি, অস্তমিত যৌবনে বিয়ে করে দাম্পত্য জীবনে তারা কতটুকু সুখী? প্রথম যৌবনের সেই টাল-মাটাল সময়টা তারা কিভাবে পারকরে? কিভাবে নিজেদের সংযত রাখে?কোন গোপন পাপে তারা লিপ্ত হচ্ছে না তো?

এসব আমরা ভাবি না। শুধু সাফল্য আর আধুনিকতার নামে মরিচীকার পেছনে ছুটছি আমারা। আঠারো বিশ বছরের একটি ছেলে বিয়ে করতে চাইলে তাকে আমরা ছি ছি করি।অথচ এটাই বিয়ের সঠিক সময়। আপনি যখন আপনার ছেলে কিংবা মেয়েটিকে নেহায়তই বাচ্চা ভাবছেন, ঠিক তখনই সে শরীরের ভেতর জেগে ওঠা আরেকটি শরীরের তাপে জ্বলেপুড়ে মরছে নি:সঙ্গ।অথচ সে কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারছে না।

চলুন বর্তমান সমাজ বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি দেই।আমি যে ঘটনার কথা বলব এরকম নিশ্চই হরহামেশা আপনারাও আপনাদের চারপাশে দেখতে পান।
কিছুদিন আগে একটা প্রোগ্রামে জয়েন করার জন্য মেয়েকে নিয়ে বের হয়েছিলাম।মোহাম্মদপুর পর্যন্ত গিয়ে খবর শুনি প্রোগ্রামের ভেন্যু পরিবর্তন হয়েছে সংসদ ভবন থেকে নীলক্ষেত। আমি জ্যাম ঠেলে নীলক্ষেত যেতে যেতে কর্ম কাভার হয়ে যাবে।অগত্যা অভিমান নিয়ে বাসায় ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু মেয়ে বাসায় আসবে না , ঘোরাঘুরি করবে।তাই তাকে নিয়ে গেলাম মধু সিটির ফুড ক্যাফেতে।তখন চারটা বাজে, রোদ পড়তে শুরু করেনি। আইসক্রিম অর্ডার করে ছাউনি দেওয়া একটা টেবিল খুঁজে বসলাম।

পাশের টেবিল থেকে কিছু বেমানান সাউন্ড আর হাসাহাসির শব্দ কানে আসছিল।চেয়ে দেখি দুটো কিশোর ছেলে এবং একটি কিশোরী মেয়ে। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে সবার বয়স বারো কি তেরোর কাছাকাছি হবে। কথোপকথনে বুঝলাম এদের তিনজনের মধ্যে একজন মেয়েটির প্রেমিক এবং অন্যজন প্রেমিকের বন্ধু। মেয়েটির পড়নে গোলাপী রঙের নেটের স্কার্ট।গায়ে ওড়না নেই। অবশ্য তার ওড়নার কোন প্রয়োজনও ছিল না।কারণ তার যৌবনের কলি এখনো ফুটতে শুরুই করেনি।

বয়ফ্রেন্ড প্রাণীটির পরনে ছেড়া ফাঁটা জিন্স আর টিশার্ট। দাড়ি গোঁফ গজায়নি এখনো।মাথার চুলগুলো দূর্বাঘাসের মত সবুজ রং করা।হয়তো বান্ধবীর কাছে নিজেকে ইউনিক প্রমাণ করতে সে চুলের কালার হিসেবে এই রং বেছে নিয়েছে।

তারা ডেটে আসছিল।যেহেতু এখন প্রায় বিকেল হয়ে আসছে, ক্যাফেতে ভিরভাট্টা বাড়বে, তাই তারা চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।মেয়েটি তার বয়ফ্রেন্ডকে রেপিং পেপারে মোড়ানো একটি গিফট প্যাকেট দিল।ছেলেটির উচ্ছ্বাস আর কথাবার্তায় বুঝলাম ভিতরে মোবাইল ফোন আছে।ছেলেটি তার বান্ধবীর কাঁধে হাত রেখে টকাস টকাস করে চুমু খাবার মত শব্দ করল।তারপর হাত ধরে হাসতে হাসতে তারা বেরিয়ে চলে গেল।

আমি তাজ্জব হয়ে লক্ষ্য করলাম পাবলিক প্লেসে এরকম অশালীন আচরণ করতে ঐ পুঁচকে ছেলেমেয়েদের একটুও লজ্জা করল না। সামাজিক অবক্ষয় কোথায় গিয়ে ঠেকেছে!

ওদের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে আমার মাথায় অনেক গুলো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।মেয়েটি মোবাইল কেনার মত এতগুলো টাকা কোথায় পেল? নিশ্চই বাসায় নয়ছয় বুঝিয়ে আদায় করেছে নয়তো চুরি করেছে।এরা কোথায় যাচ্ছে ,কি করছে?তাদের অভিবাবকেরা কী খোঁজ রাখেন?
আমি নিশ্চিত যদি ওই ছেলে মেয়েদের বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানো হয়, তাহলে তাদের অভিবাবকেরা বলবে আমাদের ছেলে মেয়ে ছোট।তাদের বিয়ের বয়স হয়নি।অথচ তারা খবরই রাখে না যে তাদের মাসুম বাচ্চারা সিংকিং সিংকিং ড্রিঙ্কিং ওয়াটার।

আমরা সুশীল সমাজও সবকিছু দেখে শুনে চোখে কানে তুলো গুজে রাখি।যা খুশি করুক, আমাদের কি? কিন্তু ওই বাচ্চা মেয়েটি যদি গনধর্ষনের স্বীকার হয় তখন আমরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে হায় হায় করব।কিংবা যদি বয়ফ্রেন্ডকে খুশি করতে গিয়ে প্রেগন্যান্ট হয়ে পরে তখন ছি ছি করব।তবুও আমাদের যত আপত্তি সব বাল্যবিয়েতে!

বাল্য বিবাহের বিপরীতে প্রচলিত অনেক যুক্তি আছে।তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হল-
* মেয়েরা শারীরিক ও মানসিকভাবে সন্তান ধারণের জন্য সক্ষম হয়ে ওঠে না।
* ছেলেদের পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার নষ্ট হবে।জীবনে ভালো কিছু করতে পারবে না।
* বিয়ে করে খাওয়াবে কি?

এসব যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে আমরা ক্রমশ বিয়েকে কঠিন করে অবৈধ প্রেম ভালোবাসা, জেনা-ব্যভিচারকে সহজ করে ফেলেছি।এর ফলাফল কি দাড়িয়েছে নিচের জরিপগুলো দেখলে কিছুটা অনুধাবন করা যাবে।

বলা হয়ে থাকে অল্পবয়সে মা হলে মাতৃত্বকালীন মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।কিন্তু পরিসংখ্যান কি বলে?

* বাংলাদেশে ” জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ( নিপোর্ট) এর ২০১৬ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বার্ষিক মাতৃ মৃত্যুর সংখ্যা ১৯৬ জন।

* এদিকে ২০০৮ সালে ঔষধ কোম্পানীর তরফ থেকে তৈরি এক হিসাবে বলা হয়েছে যে বছরে প্রায় ৬ লাখ গর্ভপাতের ঘটনা ঘটে।

* বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে সারা বিশ্বে প্রতিবছর ২৬ মিলিয়ন বৈধ ও ২০ মিলিয়ন অবৈধ গর্ভপাত ঘটে।

* বাংলাদেশ মানবাধিকার নেটওয়ার্কের তথ্য মতে প্রতিবছর বাংলাদেশে ৭৮ হাজার অবৈধ গর্ভপাত ঘটে।এর মধ্যে গর্ভপাতের কারনে ৮ হাজার নারী মৃত্যুবরন করে।

* আইসিডিডিআরবি এর তথ্য মতে বাংলাদেশে হাজারে ১৮টি অবৈধ গর্ভপাত ঘটানো হয়।এসব নারীদের বয়স ১৫-৪৪ বছরের মধ্যে এবং ৩.৩ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কারনে।

ভেবে দেখতে বলি; যেখানে বার্ষিক মাতৃ মৃত্যুর সংখ্যা ১৯৬ জন, সেখানে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের কারনে অবৈধ গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছে ৮ হাজার নারী।কোন সংখ্যাটি বেশি আশংকাজনক বিবেচনা করে দেখেছেন কি? এই বিপুল সংখ্যক নারী আমাদের কারো না কারো বোন অথবা মেয়ে। বয়:প্রাপ্ত হওয়ার সাথে সাথে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করলে নিশ্চই প্রেমের সম্পর্কের ফাঁদে পড়ে অবৈধ গর্ভপাত করতে তারা গিয়ে মৃত্যু মুখে পতিত হত না।

ছেলেদের বেলায় বলা হয়, অল্পবয়সে বিয়ে করলে জীবনে উন্নতি করতে পারবে না। ক্যারিয়ারের বারোটা বেজে যাবে।আচ্ছা শেখ মুজিবুর রহমান, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখেরা কোন বয়সে বিয়ে করেছিল? তারা কি চল্লিশ বছর বয়সে বিয়ে করেছিল?
না করেননি।তার সকলেই বেশ অল্প বয়সেই বিয়ে করেছিলেন।বরং তখন এটাই ছিল স্বাভাবিক।কই বিয়ে তো তাদের ক্যারিয়ারের জন্য বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি।বরং তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেছেন নির্বিঘ্নে।

মানুষের নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আসক্তি বেশি।সে অজানাকে জানতে চায়, অধরা কে পেতে চায়। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ মানুষের সহজাত। সাধারণত বয়সন্ধি কাল থেকেই মানুষের এই কৌতূহল শুরু হয়।আমরা সেই কৌতুহল নিবৃত্ত করার ব্যবস্থা না করে তাদের সামাজিকতার দোহাই দিয়ে আধুনিকতার নামে বিয়ের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করি।তখন তারা বৈধ উপায়ে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে না পেরে বেছে নেয় অন্যায়ের পথ।

চলুন, দেখি জরিপ কি বলে-

* বাংলাদেশ পুলিশের হিসাব বলছে গত বছর ৫৪০০ নারী ও ৮১৫ টি শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ধর্ষণের শিকার হয়ে মারা ১২ শিশু ও ২৬ নারী।

* আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৯ সালে ১৪১৩ নারী ও শিশু ধর্ষিত হয়েছে।

* বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম ২০১৯ প্রতিবেদনে বলা হয় গড়ে প্রতিমাসে ৮৪ শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ১৩৮৩ জন শিশু।

শুধু এই জরিপগুলো যোগ করলে যে সংখ্যা পাওয়া যাবে একজন বিবেকবান মানুষের আঁৎকে ওঠার জন্য যথেষ্ট। ভেবে দেখুন যদি রেকর্ডকৃত ঘটনা হয় এতগুলো,তাহলে যেসব ঘটনা থানা পুলিশ পর্যন্ত পৌঁছায় না সেগুলো যোগ করলে মোট সংখ্যা কত দাঁড়াবে? আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ইভটিজিং, যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মত ঘটনাগুলো সাধারনত ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। অধিকাংশ ভুক্তভোগী নারীর অভিবাবকেরা বিচার চাওয়ার বদলে মান সম্মানের ভয়ে নিজেরাই ব্যাপারটিকে গোপন করতে চায়।আবার অনেক সময় বিপরীত পক্ষের অর্থ ও ক্ষমতার নিচে নালিশ গুলো চাপা পড়ে যায়!
এই বিপুল পরিমাণ বিকৃত ও পথভ্রষ্ট ইভটিজার ,ধর্ষক আমাদের আশেপাশের কোন পরিবারেরই ভাই কিংবা ছেলে।চিন্তা করে দেখেছেন কি?

যদি যৌবন প্রাপ্ত হওয়ার সাথে সাথে বিয়ের মাধ্যমে নারীর শরীরের প্রতি তাদের কৌতুহল, লোভ, কামনা, বাসনা দমন করা যেত তাহলে কি এত নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটত? যারা এসব দূর্ঘটনায় একবার জড়িত হয়ে পড়ে তারা ক্যারিয়ারে কতটা উন্নতি করতে পারে? বরং প্রেম ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়ে অনেক ছেলের জীবনে বড় কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে।মেয়েদের পিছনে ঘুরে ঘুরে অনেক ছাত্রের জীবনের মূল্যবান সময় ও অর্থ বিনষ্ট হয়ে যায়।শেষ পর্যন্ত মাদকের ছোবলে হারিয়ে যায় অন্ধকার জীবনে।
অথচ বালেগ হওয়ার পর যাদের দ্রুত বিয়ে করানো হয় তারা ডানে বামে মনোনিবেশ না করে সোজা জীবনের লক্ষ্য পানে এগিয়ে চলতে পারে।যখন তার কাঁধে স্ত্রীর ভার এসে পড়ে তখন সে অধিক দায়িত্ব সচেতন হয়ে ওঠে।
একবার ভেবে দেখতে বলি, বিয়ে ক্যারিয়ার গঠনের পক্ষে প্রতিবন্ধকতা নাকি সহায়ক?

শেষকথা হল, বিয়ে করে খাওয়াবে কি?
এখন আমাদের দেশে অধিকাংশ পরিবারই ছোট পরিবার।ধরুন আপনার পরিবারের সদস্য সংখ্যা চার/পাঁচ জন।স্বামী,স্ত্রী আর দুই বা তিনটি সন্তান। আপনার ইন্টারমিডিয়েট পড়ুয়া ছেলেটিকে বিয়ে করিয়ে একজন পুত্রবধূকে খাওয়াতে পারবেন না? আচ্ছা,আপনার নিজের যদি আরেকটি সন্তান থাকত তবে তার ভরণ পোষণের দায়িত্ব আপনি নিতেন না?একটা মানুষ কত খায়?

অপরদিকে কন্যার পিতাদেরও বলি, আপনারা মেয়ে বিয়ে দিয়ে হাত ঝেড়ে ফেলতে চান কেন? বিয়ের আগে যেমন মেয়েকে লালন-পালন করেছেন বিয়ের পরও আর পাঁচটা বছর মেয়ের দায়িত্ব নিতে পারবেন না? চল্লিশ বছর বয়সের একটি প্রতিষ্ঠিত ছেলের চেয়ে অনার্স পড়ুয়া একটি সুপাত্রের হাতে আপনার কলেজ পড়ুয়া কন্যাকে সমার্পন করুন। এতে আপনাদের সন্তানেরা শারীরিক ও মানসিকভাবে তৃপ্ত হবে।কয়েকটা বছর সময় দিন।দেখবেন পড়াশোনা শেষে ভালো কিছু করে ঐ ছেলেটি আপনার মেয়েকে রানীর মত রাখবে।

আপনাদের ছেলেদের নৈতিক অবক্ষয় রোধে এবং মেয়েদের ধর্ষিত হওয়া থেকে বাঁচাতে আপনাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। সমাধান খুঁজতে সমস্যার ভেতরে প্রবেশ করে মূল উৎপাটন করা উচিত।কেবল আইন আর শাস্তির আলগা প্রলেপ দিয়ে এই ঘা সারানো যাবে না।প্রাকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই তাদের জৈবিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

আদায় যোগ্য মোহরানা ধার্য করুন। বিয়েকে সহজ করে দিন।সমাজ থেকে নৈতিক অধঃপতন, বেলাল্লাপনা, ধর্ষণ, অবৈধ গর্ভপাত, মাদকাসক্তি কে ঝেঁটিয়ে বিদায় করুন। দোহাই লাগে, সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে এগিয়ে আসুন।

লেখকঃ কলাম লেখক 

আরও পড়ুন