ভারতের কৃষক বিদ্রোহ কৃষি বিল এবং বর্তমান পরিস্থিতি

মাহ্জেবিন সিদ্দিকা মম

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত গত কয়েকমাস ধরে বেশ আলোচনায় আছে। এই আলোচনায় থাকার কারণ হচ্ছে গত দুই মাস ধরে চলা কৃষক বিদ্রোহ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাশ হওয়া তিনটি কৃষি বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন পাঞ্জাব প্রদেশের কৃষকেরা।
প্রথমে নিজ রাজ্য পাঞ্জাবে আন্দোলন করলেও পরবর্তীতে তারা দিল্লীতে এসে অবস্থান নেয়। বর্তমানে পাঞ্জাবের পাশাপাশি হরিয়ানা, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র সহ প্রায় পঁচিশটি রাজ্যের কৃষক আন্দোলনে শামিল হয়েছেন।
ভারতের ৬০% মানুষ কৃষিকাজের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু বেশ কয়েক বছর যাবত সার, বীজ, খরা ইত্যাদির কারনে কৃষকরা হতাশায় ভূগছেন। এর আগে ২০১৮ সালেও বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা দিল্লি অভিমূখে যাত্রা করেছিলেন।
দ্যা ইকোনমিস্ট পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে প্রতি বছর গড়ে বারো হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেন। যারা ভারতীয় চ্যানেল দেখে থাকেন তাদের নিশ্চয় চোখে পড়ার কথা, ভারতে কৃষকদের আত্মহত্যায় নিরুৎসাহিত করে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন প্রচারের চিত্র। যেখানে কৃষকরা তাদের বর্তমান অবস্থা নিয়েই হতাশায় আক্রান্ত সেখানে নতুন করে পাশ হওয়া তিনটি কৃষি বিল ‘আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছে’।
নতুন তিনটি কৃষি বিল পাশ হওয়ার আগে কৃষকরা তাদের পণ্য বিক্রয় করতেন তিনটি উপায়ে।
প্রথমত, প্রান্তিক কৃষকেরা নিজ উদ্যোগে সরাসরি বাজারে গিয়ে পণ্য বিক্রয় করতেন।
দ্বিতীয়ত, তারা দালাল ধরে নিজেদের পণ্য বিক্রয় করতেন।
তৃতীয়ত, এপিএমসি অর্থাৎ এগ্রিকালচারাল প্রডিউজ মার্কেট কমিটি র মাধ্যমে সরকারি এজেন্টের মধ্যস্থতায় পণ্য বিক্রয় করতেন।
এই এপিএমসি কে স্থানীয় ভাবে মান্ডি বলা হয়। এ ব্যবস্থায় সরকার কর্তৃক মিনিয়াম সাপোর্ট প্রাইস যাকে সংক্ষেপে বলা হয় এমএসপি তা নির্ধারন করে দেয়া হতো। এর ফলে কৃষকেরা একটি নূন্যতম মূল্য পেতো। কিন্তু বর্তমান কৃষি বিলে সেই মান্ডি ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে।
নতুন কৃষি বিল এবং কৃষকের আপত্তিঃ
পাশ হওয়া প্রথম বিলটি হলো-
1. The Farmers Produce Trade and Commerce Promotion and Facilitation bill 2020. (কৃষি পণ্য লেনদেন ও বানিজ্য উন্নয়ন, প্রচার ও সুবিধাদি)
এই আইন অনুসারে কৃষকদের পণ্য মান্ডিতে বিক্রি করতে হবে না। তারা তাদের পণ্য বেসরকারি এজেন্সির কাছে বিক্রি করবে।

 কৃষক ও বিরোধীদের আপত্তির কারণঃ

এই বিল অনুসারে বেসরকারি এজেন্সির কাছে পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস থাকবে না। অর্থাৎ মান্ডি ব্যবস্থায় যে একটি নূন্যতম মূল্য কৃষকরা তাদের পণ্য বাবদ পেতো সেই ব্যবস্থাটি থাকবে না। এতে কৃষকদের ঠকার সম্ভাবনা প্রবল। তাছাড়া মান্ডি ব্যবস্থায় কৃষকেরা নগদ টাকা পেয়ে যেতেন। কিন্তু বেসরকারি এজেন্সির কাছে পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নগদ টাকা দেওয়ার কোন বিধান রাখা হয়নি।
দ্বিতীয় বিলটি হলো-
2. The Farmers Empowerment and Protection Agreement on Price Assurance and Farm Services Ordinance Bill 2020. (কৃষকদের ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষা, মূল্য আশ্বাস ও খামার পরিসেবা চুক্তি)
এই বিল অনুসারে কৃষক এক্সপোর্টার, হোলসেলার এজেন্সির সাথে পাঁচ বছরের চুক্তি করতে পারবেন। এই পাঁচ বছরে তারা চুক্তি মোাতবেক ফসল ফলাবেন।
কৃষক ও বিরোধীদের আপত্তির কারণঃ
এই চুক্তি অনুসারে কৃষকেরা মূলত এজেন্সিগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে যাবেন। তারা মনে করছেন এই চুক্তির ফলে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা লোপ পাবে। তাছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে নির্ধারিত পরিমান পণ্যের যোগান দিতে না পারলে ঐ এজেন্সি গুলো কৃষকদের বিরুদ্ধে মামলা করার মত পদক্ষেপ ও নিতে পারেন। এজেন্সিগুলো চুক্তির দোহাই দিয়ে কৃষকদের তাদের মনমত ফসল ফলাতে বাধ্য করতে পারেন।
তৃতীয় বিলটি হলোঃ
3. Essential Commodities Amendment Bill 2020. (অত্যবশ্যক পণ্য সংশোধনী)
এই বিল অনুসার চাল, ডাল, ভোজ্য তেলকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। এ সমস্ত পণ্য যত খুশি তত মজুদ করা যাবে। দ্রব্যমূল্য দ্বিগুণ না হলে সরকার হস্তক্ষেপ করবে না। এছাড়া প্রাকৃতিক দূর্যোগ, দুর্ভিক্ষ এবং যুদ্ধ লাগলেই কেবল সরকার হস্তক্ষেপ করবে।
কৃষক ও বিরোধীদের আপত্তির কারণঃ 
এ বিল পাশের ফলে ইচ্ছেমত পণ্য মজুদ করা যাবে। এর ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা পণ্য মজুদ করে বাজারে কৃত্তিম সংকট তৈরি করতে পারে। যার ফলে দাম বেড়ে যাবে বহুগুণ। এছাড়া কৃষকরা তাদের ন্যায্য দাম পাবেন না, লাভবান হবেন ব্যবসায়ীরা।
দিল্লি তে অবস্থানঃ
ভারতের পার্লামেন্টে বিতর্কিত কন্ঠভোটে পাশ হওয়া এই তিনটি বিল বাতিল করার জন্য পাঞ্জাবের কৃষকেরা নিজেদের রাজ্যে হরতাল, প্রতিবাদ করে কোন ফল না পেয়ে দিল্লিতে রওয়ানা হয়।হরিয়ানা রাজ্যে পৌঁছালে পুলিশ তাদের উপর তীব্র শীতের মাঝে জল কামান নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ করে। এতে করে কৃষকরা দমে না গিয়ে আরও ঐক্যবদ্ধ হয় এবং হরিয়ানার কৃষকরাও তাদের সাথে যোগ দেয়।
অবশেষে প্রায় তিন লাখ কৃষক দিল্লিতে অবস্থান নেয়। তারা নিজেদের আনা তাবু টাঙিয়ে, নিজেরাই নিজেদের খানার বানিয়ে অবস্থান কর্মসূচি চালায়। এর মাঝে কৃষকেরা গত বছরের ৮ ডিসেম্বর ভারত বন্ধ কর্মসূচির ডাক দেয়। দিল্লির ২ ডিগ্রি শীতের মাঝেও কৃষকেরা তাদের অবস্থান থেকে সরে যায়নি।
সরকারের অবস্থানঃ
নরেন্দ্র মোদী শুরু থেকেই বলে আসছেন পাশকৃত তিনটি বিল কৃষকদের জীবনে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসবে। এই বিলের ফলে তারা তদের পণ্য বিক্রির স্বাধীনতা পাবেন এবং অধিক মুনাফা লাভ করতে পারবেন। কৃষকদের আন্দোলন শুরু করার পর থেকে মোট ১১ দফা কৃষকদের প্রতিনিধিদের সাথে সরকারের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়েছে। কিন্তু বৈঠকের ফলাফল শূণ্য। সরকার কিছুতেই কৃষকদের দাবী মানার জন্য প্রস্তুত নয়।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সরকার এক্ষেত্রে ‘ডিলে ট্যাক্টিস’ অবলম্বন করছেন। অর্থাৎ এভাবে আন্দোলন করতে করতে এক সময় কৃষকেরা নিজেরাই বিরক্ত হয়ে যাবে এবং বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু সরকারের ‘ডিলে ট্যাক্টিস ‘ এই ধৈর্যশীল কৃষকদের উপর প্রয়োগ করা যে বোকামি হয়েছে তা আন্দোলনের বর্তমান অবস্থাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
এছাড়া সরকারের আরেক প্রতিনিধি অমিত শাহ কৃষকদের উপর ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ কৌশল অবলম্বনের চেষ্টাও করেছেন। তিনি আন্দোলনরত কৃষকদের বিভিন্ন নেতাদের মাঝে মত বিরোধ সৃষ্টির চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু সেই চেষ্টাও এই মেহনতি মানুষদের মনোবলের কাছে হার মেনেছে।
অবশেষে গত ১২ ই জানুয়ারি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পাশকৃত বিলগুলোর উপর স্থগিতাদেশ আরোপ করে। কৃষকরা এই স্থগিতাদেশকে সরকারের ‘ডিলে ট্যাক্টিসের’ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন এবং ২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবসে ট্রাক্টর র্যালীর ঘোষনা দেন। ২৬ জানুয়ারির কর্মসূচিকে তারা ‘কিষাণ গনতন্ত্র প্যারেড’ নামে আখ্যায়িত করেন।
মিডিয়ার অবস্থানঃ
এছাড়া ভারতীয় গনমাধ্যম কৃষক বিদ্রোহের প্রচারণা করছে না৷ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে কৃষকদের বিরুদ্ধে খালিস্তানি, পাকিস্তানি বলে কৃষকদের ট্যাগ দেয়া হচ্ছে।
অনেকেই কৃষক আন্দোলনকে সমর্থন করলেও মূল ধারার গণমাধ্যম কৃষকদের খাবার, পোশাক ইত্যাদি গৌণ বিষয় টেনে এনে তাদের সম্মানহানি ঘটাচ্ছেন। বলা যায় গণমাধ্যম কৃষকদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে।যার কারনে কৃষকেরা নিজেদের প্রচার মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক পেইজ এর আশ্রয় নিয়েছেন।
বর্তমান অবস্থাঃ
গত ২৬ শে জানুয়ারি কৃষকরা হাজার-হাজার ট্রাক্টর নিয়ে দিল্লির রাস্তায় ঢুকে পড়েন। সেখানে তারা পুলিশের বাঁধার মুখে পড়েন এবং দিল্লিতে অবস্থিত লাল কেল্লায় ঢুকে ভারতের পতাকা নামিয়ে শিখ পতাকা উড়িয়ে দেন। এ ঘটনায় সারা বিশ্বেই সাড়া পড়ে যায়।
বিভিন্ন গণমাধ্যম এই ঘটনা সরাসরি সম্প্রচার করে। এরপর থেকে গোটা ভারত জুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠে। জাতীয় পতাকার অবমাননা সহ নানা ইস্যু টেনে মূল বিষয় থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর প্রক্রিয়া চলছে।
এই ঘটনার পর কৃষকেরা তাদের পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে গণ অনশন এর ঘোষনা দেয়। কিন্তু সেই গণ অনশন কর্মসূচিতেও পুলিশ বাগড়া দেয়।
সম্প্রতি মার্কিন পপ তারকা রিহান্না এবং সুইডিশ পরিবেশ কর্মী গ্রেটা থানবার্গ কৃষকদের পক্ষ নিয়ে টুইটারে পোস্ট করেন৷ এই টুইটের ফলে ভারতের কৃষক বিদ্রোহের দিকে গোটা বিশ্বের নজর পড়ে।
কিন্তু ভারতের খ্যাতনামা তারকা এবং খেলোয়াড় গণ এই টুইটের বিরুদ্ধে টুইট করেন এবং বলেন এটা নিতান্তই ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়, এতে অন্যদের নাক না গলালেও চলবে।
চলমান কৃষক বিদ্রোহ প্রথম দিকে কৃষকদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো। কিন্তু সরকারের দাবী না মানা এবং কৃষকদের কোন প্রকার আশ্বাস না দেওয়ার ফলে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। নরেদ্র মোদীর গত ছয় বছরের শাসনকালে এমন বড় এবং শক্তিশালী আন্দোলন আর দেখা যায়নি।
তাছাড়া কৃষকদের দাবীকে সমর্থন করে মোদীর জোট এনডিএ থেকে বেরিয়ে গিয়েছে শিরোমনি আকালি দল এবং আরএসএস এর কৃষক শাখা। এছাড়া এই আন্দোলনের ফলে হরিয়ানা রাজ্যে বিজেপি বিরোধিতা বেড়ে গিয়েছে। বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে দেখা যাচ্ছে এই বিদ্রোহ অতিসত্বর সামাল না দিলে মোদী সরকারকে বড় ধরনের বিপাকে পড়তে হবে।
লেখকঃ শিক্ষার্থী ও কলাম লেখক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আরও পড়ুন