মামনুল হক সরকারের জন্য চতুর্থ আশির্বাদ

হাসান আল বান্না

অরাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন হিসেবে পরিচয় দানকারী হেফাজতে ইসলাম কার্যত এই মূহুর্তে বাংলাদেশের আনঅফিশিয়াল বিরোধী দল। শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে হেফাজতের উত্থান হয়। সে সময় জাতীয় অনেক দৈনিক পত্রিকা আট কলাম হেডিং করে হেফাজতকে পরিচয় করিয়ে দেয় তৃতীয় শক্তি হিসেবে। সেই থেকে হেফাজত রাজনৈতিক অঙ্গনে সবসময়ই আলোচিত-সমালোচিত। বিরোধী রাজনৈতিক দলের শুন্যতায় হেফাজতের আজকের অবস্থান আকাশচুম্বী। হঠাৎ আঙ্গুল ফুলে রাজনৈতিক দল না হয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থান এবং খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই শক্তিমত্তা প্রদর্শন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরলতম ঘটনা। শুধু তাই নয় সারা পৃথিবীর সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনা বিরল।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কে বা কাদের মাধ্যমে অথবা কিভাবে হেফাজতের আজকের এই অবস্থান? হঠাৎ রাজনৈতিক বিস্ফোরণ হয় দুইটি কারণে। ১. সরকারের পরিকল্পনায় ২. জনসমর্থনে বা গণআন্দোলনে।

হেফাজতের ক্ষেত্রে কোনটা প্রযোজ্য সেটা আমার আলোচ্য বিষয় না। আমার আলোচ্য বিষয় হচ্ছে হেফাজত কতটা সরকারের জন্য সহায়ক? অথবা কিভাবে বা কেন সহায়ক।

শাপলা চত্বরের ঘটনার পর থেকে হেফাজত এবং সরকারের সখ্যতা পুরো জাতি দেখেছে। প্রধানমন্ত্রী ও আল্লামা শফির মোসাফা এবং কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতি সবমিলিয়ে এই সখ্যতা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতা প্রশংসনীয়। কিন্তু মি. নরেন্দ্র মোদীর ইস্যুতে এসে হঠাৎ ভিন্ন পরিস্থিতির উদ্ভব হলো। এখানে সরকার এবং হেফাজতের কোন কিছুই স্পষ্ট না। প্রথমে দেখলাম হেফাজত কর্মসূচী দিবে না মর্মে সংবাদ সম্মেলন কিন্তু নরেন্দ্র মোদির দেশে আসার দিন ঠিকই হেফাজত আন্দোলন করে। আবার সরকার সে সময় হেফাজতের কোন নেতাদের বিরুদ্ধে কোন এ্যাকশনে যায়নি। হঠাৎ করে মামনুল হকে ইস্যু সামনে আসে এবং এরপর থেকে একের পর এক হেফাজত নেতারা গ্রেফতার। তাহলে এমন ছক্বা পান্জা খেলার রহস্য কি? বিষয়টি ক্লিয়ার হবে মি.. মামনুল হকের ঘটনা পোস্টমোর্টেম করলে।

যেদিন মি. মামনুল হক রিসোর্টে গিয়েছিলেন মূলত ঘটনার সূত্রপাত সেদিন থেকে শুরু।

মি. মামনুল হক রিসোর্টে বউ নিয়ে গেছেন নাকি প্রেমিকা নিয়ে গেছেন সেটার ব্যাখা মামনুল হক এবং আলেম সমাজ বলবেন। তবে হ্যাঁ মি. মামনুল হক রিসোর্টে গিয়ে সাধারণ নৈতিকতা (Common Morality) লঙ্ঘন যদি নাও করেন তবে অবশ্যই নৈতিকতার বিশেষ স্বত্ব ( Origin of morality) তিনি লঙ্ঘন করেছেন। অর্থ্যাৎ অরিজিন অব মোরালিটি লঙ্ঘন হচ্ছে, যে কাজ যে ব্যক্তিত্বের জন্য সাজে না।

তবে মামনুল হক রিসোর্টে প্রেমিকা নাকি বউ নিয়ে গেছেন এটা তো নারায়ণগঞ্জের যুবলীগ জানার কথা ছিল না। সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, মামনুল হকের পিছনে যে অদৃশ্য শক্তি হোম ওয়ার্ক করেন তারাই সোনারগাঁও যুবলীগ সেখানে পাঠিয়েছেন। মামনুল হক যদি প্রেমিকাও নিয়ে রিসোর্টে যান তবে সেটা বেসরকারি কোন বাহিনী অভিযান পরিচালনা করতে পারে না, পারে কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় বাহিনী। এরপরের ঘটনা আমরা সবাই জানি। এখন একের পর এক হেফাজত নেতারা গ্রেফতার হচ্ছেন। প্রতিদিনই গ্রেফতার তালিকা দ্বীর্ঘ হচ্ছে। কিন্তু মোদী বিরোধী আন্দোলনের সময় মামনুল হক এবং হেফাজতের নেতারা গ্রেফতার হননি। বি. বাড়িয়া গিয়ে আইজিপি নিজে হেফাজত নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনা করলেন তারপর বিভিন্ন থানায় মামলাও হলো তাতেও হেফাজতের নেতারা গ্রেফতার হলেন না। মামলাতেও তাদের নাম অন্তর্ভুক্তি হয়নি। কিন্তু গ্রেফতার হলেন মামনুল কান্ডের পর। অর্থ্যাৎ সেইদিনের অপেক্ষা তারা করছিলেন যা হোম ওয়ার্ক ছিল আগে থেকেই। এরমধ্যে আবার হেফাজত নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতও করেছেন। সাক্ষাৎ পরবর্তীও গ্রেফতার থামছে না।

আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন কিছু অস্বাভাবিক আর্শিবাদ নিয়ে। ২০০৯ সালে বিএনপি – জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিয়ে সেনা শাসনের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা ছিল আওয়ামী লীগের প্রথম আশির্বাদ। এরপর ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি – জামায়াতের অংশগ্রহন না করা ছিল আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় আশির্বাদ। এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে ড. কামালের নেতৃত্বে বিএনপি – জামায়াতের অংশগ্রহণ ছিল আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসা তৃতীয় আশির্বাদ আর এখন মি. মামনুল হকের রিসোর্ট কান্ডে নৈতিক পরাজয়ে হচ্ছে সরকারের পরবর্তী ক্ষমতায় আসার জন্য ৪র্থ আশির্বাদ।

এই মূহুর্তে যখন হেফাজত নেতাদের অসহায় সমর্পন করা ছাড়া আর কোনই উপায় নেই আর এটাই ভিত্তি রচিত হবে, হোম ওয়ার্ক হবে আগামী নির্বাচনে নির্বিঘ্নে ক্ষমতায় আসার জন্য আওয়ামী লীগের নিয়ামক ক্ষেত্র।

তবে ঘটনা যাই হোক বিএনপির অন্তিমদশা কেউ ঠেকাতে পারছে না…..

লেখকঃ কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক 

আরও পড়ুন