মিয়ানমারের একাল সেকালঃ নতুন করে সেনা শাসনের সূচনা

এম আর রাসেল

মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ। অনেক পূর্ব থেকেই দেশটি নিয়ে জনমানসে বিরূপ ধারণা আছে। এর ব্যতয় এই শতকে এসেও ঘুঁচে নাই।

শরৎচন্দ্রের বহুল আলোচিত উপন্যাস পথের দাবি। ১৯২৬ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ শাসন নিয়ে বিপ্লবী চিন্তাভাবনা ছিল এই উপন্যাসের মূল বিষয়।তদানিন্তন চিফ সেক্রেটারি বইটিকে ‘বিষময়’ বলে উল্লেখ করেছিলেন৷ এডভোকেট জেনারেল ব্রজেন্দ্রনাথ মত দিয়েছেলিন, বইটি দেশদ্রোহকর ও বাজেয়াপ্তযোগ্য। ১৯২৭ সালে বইটি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

এই উপন্যাসের প্রথম পরিচ্ছদ থেকে তৎকালীন বার্মা নিয়ে কিছু কথা তুলে ধরছি ৷ “কিন্তু বার্মা-মুল্লুকের নাম শুনে মায়ের মুখ মলিন হইয়া গেল, তিনি নিরুৎসুককণ্ঠে কহিলেন, তুই কি ক্ষেপেছিস অপু, সে-দেশে কি মানুষে যায়। যেখানে জাত, জন্ম, আচার-বিচার কিছু নেই শুনেছি, সেখানে তোকে দেব আমি পাঠিয়ে? এমন টাকায় আমার কাজ নেই”

এরপর আরো অনেক পরে পঞ্চাশের দশকেও বার্মার অনুরূপ চিত্রের কথায় শুনতে পাওয়া যায়। শেখ মুজিবুর রহমান এর লেখা আমার দেখা নয়া চীন বইতেও রেঙ্গুন নিয়ে কথা আছে৷ চীনে শান্তি সম্মেলনে যাওয়ার পথে শেখ মুজিব রেঙ্গুনে যাত্রাবিরতি দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, “যতদূর খবর নিয়ে জানলাম, ব্রক্ষদেশের অবস্থা খুবই খারাপ। বিপ্লবীরা বহুস্থান দখল করে আছে, আর মাঝে মাঝেই রেঙ্গুন শহরের পানি বন্ধ করে দেয়। আর একটা ভয়াবহ খবর পেলাম, ব্যান্ডিটরা দিনে দুপুরে ডাকাতি করে”।

এই বই এ সেই সময় মানে ১৯৫২ সালের সময়কার কিছু ঘটনারও উল্লেখ আছে। তখন ব্রক্ষদেশে কম্যুনিস্ট ও কারেন সম্প্রদায়ের সাথে সরকারের যুদ্ধ চলছিল। যুদ্ধে কোন পক্ষই খুব একটা সুবিধা করতে পারে নাই। শেখ মুজিব বিদ্রোহীদের ব্যর্থতার কারণ নিয়েও মত দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ” জনগণের সমর্থন ছাড়া বিপ্লব হয় না”।

মিয়ানমার নিয়ে আলাপের অনেক কিছুই আছে। একটি লেখা তৈরি করছি। সেখানে মায়ানমার চীন ও ভারতের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ? রোহিঙ্গা সমস্যার ভবিষ্যৎ কোন পথে- এই নিয়ে আলাপ থাকবে।

সংক্ষেপে বলে রাখি চীন বঙ্গোপসাগরের সীমানায় আরাকান রাজ্যের কিয়াকপিউ এ একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় চীন এমন একটি বন্দর করতে চেয়েছিল। ভারতের আপত্তিতে বাংলাদেশ সরকার এই প্রকল্পে রাজি হয়নি।

সড়কপথে এই বন্দরটি চীনের কুনমিং এর সাথে যুক্ত হবে। এই বন্দরটি চীনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা চীনের “ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড” কর্মসূচির অংশ।

কিয়াকপিউ দ্বীপে চীন বিশেষ অর্থনৈতিক জোন তৈরি করেছে। এই দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বের একটি গ্যাসক্ষেত্রে ৯.১ ট্রিলিয়ন কিউবিক গ্যাস সঞ্চিত রয়েছে। এ গ্যাসক্ষেত্র থেকে চীনের কুনমিং প্রদেশ হয়ে গোঞ্জেহ প্রদেশ পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন বসানো হয়েছে। এই পাইপ লাইন দিয়ে বছরে ২০ মিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস সঞ্চালিত হচ্ছে।

আবার মালাক্কা ডিলেমা নিয়ে যাদের জানা আছে তারা সহজেই বুঝতে পারছেন মিয়ানমার চীনের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে ভারত কালাদান প্রজেক্টের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। মিয়ানমারের সিটওয়ে বন্দরকে ঘিরে এই কাজ চলছে। এখানে ভারত মহাসড়ক উন্নয়নেও বিনিয়োগ করেছে। এসবের উদ্দেশ্য কলকাতা বন্দরের সাথে সাত বোন (Seven Sisters) রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত মিজোরাম রাজ্যের রাজধানী আইজলের সংযুক্তি। কলকাতা থেকে মিয়ানমারের সমুদ্রবন্দর সিটওয়ে দিয়ে চীন স্টেটের পালেটাওয়া নদীবন্দর হয়ে আইজল এর সাথে সংযোগ স্থাপন। ছবিতে সংযুক্ত মানচিত্র দেখলেই বিষয়টা স্পষ্ট বোঝা যাবে। এছাড়া ভারতের লুক ইস্ট পলিসির সফলতা নির্ভর করছে মিয়ানমারের উপর।

আর একটি বিষয় জানিয়ে রাখি, ইসরাইলের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে মিয়ানমারের। এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে মিয়ানমারই ১৯৪৯ সালের ৭ ডিসেম্বর ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৫৩ সালে। ১৯৫৫ সালে তৎকালীন বার্মা প্রধানমন্ত্রী উনু ইসরাইল সফর করেন৷ এক ঘরে ইসরাইলে এটাই ছিল প্রথম কোনো বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম সফর।এর পর ১৯৬১ সালে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর বার্মা সফর আলাদা দৃষ্টি পেয়েছিল। এর কারণ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ন প্রায় ১৫ দিন বার্মায় অবস্থান করেন। এত দীর্ঘ সময় অন্য কোনো রাষ্ট্রে ভিন্ন একটি দেশের রাষ্ট্র প্রধানের অবস্থানের ইতিহাস নেই বললেই চলে।গোল্ডা মায়ার থেকে শুরু করে মোশে দায়ান, শিমন পেরেজ সহ খ্যাতনামা অনেক ইসরাইলি রাজনৈতিক বার্মা সফর করেছেন। বলে রাখি, বার্মা মিয়ানমারের পূর্ব নাম। ১৯৮৯ সালে বার্মা নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার রাখা হয়।

বর্তমান সময়ের আলোচিত সেনা নায়ক মিং অং হ্লাই ২০১৫ সালে ইসরাইল সফর করেছেন। সফরকালে তিনি ইসরাইলের অস্ত্রখাতের দুই বড় ঠিকাদার Elbit Systems এবং Elta Systems এর সাথে বৈঠক করেছেন। Elbit Systems ১৯৯৭ সাল থেকেই বার্মায় অস্ত্র বিক্রি করছে এবং সামরিক ক্ষেত্রে উচ্চতর প্রযুক্তি সহায়তা দেয়। স্মরণ করিয়ে দেই, ১৯৫৪ সালে ইসরাইল বহির্বিশ্বে প্রথম অস্ত্র বিক্রি করে বার্মাতেই। শান, কাচিন, রাখাইন স্টেট সহ বিদ্রোহী অঞ্চলগুলোতে প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও মিয়ানমার ইসরাইলকে অনুসরণ করে। এর সাথে অন্য একটি কৌশলও তারা প্রয়োগ করে থাকে। সেই কৌশলের নাম Four Cuts. এর মূল থিম হল- Kill all, burn all, destroy all.

ইসরাইলের উগ্র জাতীয়তাবাদের মতো মিয়ানমারেও উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ প্রবল হয়ে উঠেছে। সেখানে বামারাইজেশন এর কথা জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে। জেনে রাখা ভাল, মিয়ানমারে বসবাসরত মোট জাতি গোষ্ঠীর ৬৮ ভাগ হলো বামার। বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে উজ্জীবিত করতে আসিন উইরাথুর নাম উল্লেখ করা যায়। ২০১৩ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাকে নিয়ে কাভার স্টোরি করেছিল।

বার্মায় উগ্র জাতীয়তাবাদ কত বেড়ে গেছে তার একটি তথ্য দেই। সেখানে প্রায় ২১ টি গ্রামকে মুসলমান মুক্ত ঘোষণা করে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ মিয়ানমারের জাতির পিতা অং সাঙের প্রধান সহযোগী হিসেবে কয়েকজন মুসলমানের নামও পাওয়া যায়।

মিয়ানমারে মুসলিম হিসেবে আমরা শুধু রোহিঙ্গাদের নিয়েই কথা বলি। এর বাইরেও কিছু মুসলিম জাতির কথা জানিয়েই আজকের লেখা শেষ করব।রোহিঙ্গা ছাড়াও মিয়ানমারে পানথে, পাথি, পাসু, ব্ল্যাক কারেন, কামিয়ান,জারবেদী নামে মুসলিম জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনে ১৩৫ টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে কামিয়ান ছাড়া আর কারও ঠাঁই হয় নাই।

আলতাফ পারভেজ লিখেছেন “একটি দেশ তার প্রতিবেশী পাল্টাতে পারে না।” প্রতিবশীদের নিয়ে বিস্তর জানাশোনা থাকা জরুরী৷ সেই জানার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। জানতে চাই, জানাতে চাই ।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, গবেষক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন